শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:১৮ পূর্বাহ্ন

সংগ্রাম থেকে রাষ্ট্রনায়ক: তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রস্তুতির গল্প

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২২ বার

রাজনীতিতে নেতৃত্বকে অনেক সময় জনপ্রিয়তা বা ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে বিচার করা হয়। কিন্তু বাস্তবে কোনো রাষ্ট্র স্লোগান পরিচালিত হয় না। পরিচালিত হয় প্রস্তুতির মাধ্যমে। আজ বাংলাদেশের সামনে প্রকৃত প্রশ্নটি কেবল কে নির্বাচন জিততে পারে তা নয়; বরং কে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রস্তুত। একটি আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, নীতিগত বোধ, প্রাতিষ্ঠানিক উপলব্ধি, আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক স্থিতি। এই মানদণ্ডে বিচার করলে তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা তিন দশকের দীর্ঘ প্রস্তুতির একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিভাত হয়।

তারেক রহমান হঠাৎ করে রাজনীতিতে আসেননি। কার্যত তার রাজনৈতিক শিক্ষানবিশ শুরু হয় ১৯৯২ সালে, যখন বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে এবং তার মা সদ্য প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। অনেক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীর মতো তিনি আনুষ্ঠানিক ভূমিকায় সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। যেমন- মন্ত্রণালয় কীভাবে কাজ করে, বাজেট কীভাবে গঠিত হয়, প্রশাসন কীভাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। নব্বইয়ের দশকে তিনি দেশের বিভিন্ন জেলায় ভ্রমণ করেন, তৃণমূলের কর্মী, কৃষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষক এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেন। এগুলো ছিল শুধু রাজনৈতিক সফর নয়; ছিল শাসনব্যবস্থার মাঠপর্যায়ের শিক্ষা। তিনি খুব তাড়াতাড়ি বুঝেছিলেন, ঢাকায় লেখা নীতি প্রায়ই গ্রামীণ বাস্তবতায় ভিন্ন রূপ নেয়।

২০০১-২০০৬ সময়কালে বিএনপি সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদ তার শিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই সময় তিনি প্রশাসন, উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা এবং জোট রাজনীতির কার্যকারিতা আরও কাছ থেকে দেখেন। তখন বাংলাদেশ বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে দ্রুত সংযুক্ত হচ্ছিল। পোশাক রপ্তানি বাড়ছিল, প্রবাসী আয় বাড়ছিল, অবকাঠামোগত চাহিদা স্পষ্ট হচ্ছিল। এই পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করে তিনি অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন, বিকেন্দ্রীকরণ এবং সেবা প্রদানের দক্ষতা বিষয়ে আগ্রহী হন। সেই সময় তার সঙ্গে যারা কাজ করেছেন, তারা প্রায়ই তার সংগঠন সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার ওপর জোর দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ একটি দলকে পেশাদারভাবে পরিচালনা না করলে রাষ্ট্র পরিচালনাও পেশাদারভাবে সম্ভব নয়।

তবে তার রাজনৈতিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্ভবত ক্ষমতার সময় নয়, প্রতিকূলতার সময়। তিনি ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন। রাজনৈতিক নির্বাসন অনেকের ক্যারিয়ার শেষ করে দেয়, কিন্তু তারেক রহমানের ক্ষেত্রে তা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বিস্তৃত করেছে। একটি পরিণত সংসদীয় গণতন্ত্রে বসবাস করে তিনি দেখেছেন সরকার পরিবর্তিত হলেও প্রতিষ্ঠান স্থিতিশীল থাকে। সংসদীয় কমিটি কীভাবে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করে, স্থানীয় সরকার কীভাবে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে, জনসেবা কীভাবে কাঠামোগত জবাবদিহির মাধ্যমে প্রদান করা হয় এবং নাগরিক স্বাধীনতা কীভাবে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সমন্বয় করে, এসব বিষয় তার রাজনৈতিক চিন্তায় প্রভাব ফেলেছে। ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার আইনের শাসন, স্বাধীন সিভিল সার্ভিস, সংসদীয় তদারকি ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের ধারণা তার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে।

নির্বাসনকালীন সময় তার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও বাড়িয়েছে। প্রবাসী পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়নকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি বৈশ্বিক নীতিগত আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হন সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, কৃষি উৎপাদনশীলতা, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে। এখানেই একজন আধুনিক রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গে প্রচলিত রাজনীতিকের পার্থক্য স্পষ্ট হয় – নির্বাচনী বক্তব্য থেকে নীতিগত কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়া।

একই সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘর্ষ তার রাজনৈতিক মনোবলকে দৃঢ় করেছে। শাসকের নিষ্ঠুর আচরণ, আইনি লড়াই, রাজনৈতিক চাপ এবং দীর্ঘ সময় ধরে শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে বিরোধ তাকে এক ধরনের রাজনৈতিক সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছে। সমর্থকদের মতে, এটি তাঁর অধ্যবসায়ের প্রতীক। দেশের বাইরে থেকেও সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা কৌশলগত স্থিতির প্রমাণ।

তবে নেতৃত্বের প্রস্তুতি শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ নয়; তা নীতিগত প্রস্তুতির মধ্যেও প্রতিফলিত হতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে তারেক রহমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো রাজনৈতিক জনপ্রিয়তাকে নীতিগত প্রস্তুতিতে রূপান্তর করার চেষ্টা। গত কয়েক বছরে তিনি দেশি-বিদেশি পেশাজীবী – অর্থনীতিবিদ, চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, কৃষি বিশেষজ্ঞ, সামাজিক সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়ন পরিকল্পনাবিদদের নিয়ে একটি সমন্বিত উন্নয়ন কাঠামো প্রণয়নে কাজ করেছেন, যার নাম ‘দ্য প্ল্যান’।

এই উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রচলিত নির্বাচনী ইশতেহারের বাইরে গিয়ে নীতিকে প্রশাসনিক কর্মসূচিতে রূপ দিতে চেয়েছে। এতে বাংলাদেশের মৌলিক কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ রয়েছে। যেমন- প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সংস্কার, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কৃষি আধুনিকায়ন, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, ক্রীড়া উন্নয়নের মাধ্যমে যুবসমাজের বিকাশ, এবং খতিব, ইমাম সহ ধর্মীয় নেতাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিকল্পনাটি শুধু লক্ষ্য নির্ধারণে থেমে থাকেনি; অর্থায়ন, বাস্তবায়ন কাঠামো এবং সেবা প্রদানের পদ্ধতি নিয়েও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে প্রায়ই যে বিষয়টি অনুপস্থিত থাকে – ধারণা নয়, বাস্তবায়ন ব্যবস্থা – এই পরিকল্পনা সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে। প্রচলিত সমাবেশের পাশাপাশি তিনি যুব সংলাপ, পেশাজীবী বৈঠক, প্রবাসী আলোচনা ও খাতভিত্তিক নীতিনির্ধারণী বৈঠককে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এতে বোঝা যায়, বৈধতা কেবল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে নয়, নীতিগত প্রস্তুতি থেকেও অর্জন করতে তিনি সচেষ্ট।

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে। বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ব্যয়, জলবায়ু ঝুঁকি, কৃষির আধুনিকায়ন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান রক্ষা- এই জটিল চ্যালেঞ্জগুলো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রযন্ত্রের গভীর বোঝাপড়াসম্পন্ন নেতৃত্ব।এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা উত্তরাধিকার নয়, বরং বিবর্তনের গল্প – অভিজ্ঞতা, প্রতিকূলতা, আন্তর্জাতিক শিক্ষা এবং নীতিগত প্রস্তুতির সমন্বয়। তিন দশকের পর্যবেক্ষণ, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং কর্মসূচি প্রণয়ন তাঁকে আজ একটি প্রস্তুত নেতৃত্ব হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

একটি বিষয় স্পষ্ট। আধুনিক রাজনীতিতে প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ। আর প্রস্তুতি একদিনে তৈরি হয় না; সময়, শিক্ষা, অধ্যবসায় এবং ধারণাকে রাষ্ট্রপরিচালনায় রূপ দেওয়ার সক্ষমতার মধ্য দিয়েই তা গড়ে ওঠে।

লেখক: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ