১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসের একটি স্মৃতি আজও স্পষ্ট মনে আছে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলের আবাসিক ছাত্র। ব্যবস্থাপনা বিভাগে পড়ি। সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হলে ফিরে শুনলাম, সরকার ১০০ টাকার নোট অচল ঘোষণা করেছে। অর্থনীতির জটিল হিসাব তখন বুঝতাম না। কিন্তু নিজের পকেটের হিসাবটা ভালোই বুঝতাম। আমার কাছে ছিল মোট ১১৩ টাকা। তার মধ্যে একটিমাত্র ১০০ টাকার নোট। মুহূর্তের মধ্যে মনে হলো, ১০০ টাকার নোটটি আর টাকা নয়, স্রেফ এক টুকরো কাগজ। হাতে রইল মাত্র ১৩ টাকা। এই টাকায় আড়াই দিনের বেশি চলবে না। মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।
পরে অবশ্য আতঙ্ক কেটে যায়। নির্ধারিত নিয়মে ব্যাংকে নোট জমা দিয়ে আমি টাকাটি ফেরত পেয়েছিলাম। কিন্তু সেই ঘটনার অভিঘাত আজও মনে আছে। তখনই প্রথম উপলব্ধি করেছিলাম, একটি নোটের মূল্য শুধু তার কাগজে নয়; মানুষের বিশ্বাসে। রাষ্ট্রের ঘোষণা একটি কাগজকে মূল্যবান করে তোলে, আবার রাষ্ট্রের ঘোষণাই সেটিকে মূল্যহীন করে দিতে পারে।
সম্প্রতি আবারও বড় মূল্যমানের নোট অচল করার প্রস্তাব জনপরিসরে আলোচনায় এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট অচল ঘোষণার পক্ষে ও বিপক্ষে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কালোটাকা, জালনোট কিংবা অবৈধ অর্থের প্রবাহ রোধের উদ্দেশ্যে এমন প্রস্তাব অনেকের কাছে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি নোট অচল করা কি সত্যিই এত সহজ? একটি ঘোষণাই কি যথেষ্ট? নাকি এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ প্রস্তুতি, সুপরিকল্পিত বাস্তবায়ন এবং জনগণের আস্থা অক্ষুণ্ন রাখার কার্যকর ব্যবস্থা?
১৯৭৫ সালে ১০০ টাকার নোট অচল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এক বিশেষ অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, ঘাটতি অর্থায়ন এবং দ্রুত বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির চাপে সরকার মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদারের লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সে সময় ১০০ টাকাই ছিল দেশের সর্বোচ্চ মূল্যমানের নোট।
তবে এটিকে কোনো জাদুকরী সমাধান হিসেবে দেখা হয়নি। এটি ছিল বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কর্মসূচির একটি অংশ। একই সঙ্গে বৈধভাবে অর্জিত অর্থের মালিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়নি। নির্ধারিত নিয়মে ব্যাংকে নোট জমা দিলে তার পূর্ণ মূল্য ফেরত পাওয়া যেত। অর্থাৎ উদ্দেশ্য ছিল অর্থের প্রবাহকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা; জনগণের বৈধ সঞ্চয় বাজেয়াপ্ত করা নয়।
তখনকার বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট। ব্যাংক শাখা কম ছিল, লেনদেনের পরিমাণও ছিল আজকের তুলনায় নগণ্য। তাই পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করা তুলনামূলক সহজ ছিল। কিন্তু আজকের অর্থনীতির আকার, জটিলতা ও লেনদেনের ব্যাপ্তি সেই সময়ের সঙ্গে তুলনীয় নয়। স্বাধীনতার পর ছোট একটি অর্থনীতি এখন বহুগুণ বড় হয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। কোটি কোটি মানুষ এখনও নগদ টাকার ওপর নির্ভরশীল। যদিও মোবাইল আর্থিক সেবা ও ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার ঘটেছে, তবু গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং অসংগঠিত খাতের প্রধান ভরসা এখনও নগদ অর্থ। তাই ৫০০ বা ১০০০ টাকার নোট অচল করার প্রস্তাবকে আবেগ নয়, অর্থনীতির বাস্তবতা দিয়েই বিচার করতে হবে।
প্রথমত, বাজারে পর্যাপ্ত ছোট মূল্যমানের নোট থাকতে হবে। বড় নোট প্রত্যাহার করা হলে তার বিকল্প হিসেবে বিপুল পরিমাণ নতুন নোট সরবরাহ অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন ধরেই ছোট মূল্যমানের নতুন নোটের ঘাটতি রয়েছে। প্রচলিত অধিকাংশ ছোট নোটই জীর্ণ। এ অবস্থায় ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট একযোগে প্রত্যাহার করা হলে নগদ অর্থের সংকট আরও প্রকট হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং ব্যবস্থার সক্ষমতার প্রশ্ন রয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যে লাখ লাখ মানুষ ব্যাংকে ছুটে এলে শাখাগুলো কি সেই চাপ সামলাতে পারবে? এটিএমে কি পর্যাপ্ত নগদ থাকবে? গ্রামীণ এলাকার মানুষ কি সহজে ব্যাংকে পৌঁছাতে পারবেন? এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর ছাড়া নোট অচল করার সিদ্ধান্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এখানে আরেকটি বাস্তবতা মনে রাখতে হবে। নতুন নোট ছাপানোই যথেষ্ট নয়। সেগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট থেকে আঞ্চলিক কার্যালয়ে, সেখান থেকে হাজারো ব্যাংক শাখা ও এটিএমে নিরাপদে পৌঁছে দিতে হয়। নোট বাছাই, হিসাব মেলানো, পরিবহন, নিরাপত্তা ও এটিএম পুনর্বিন্যাস- সব মিলিয়ে এটি একটি বিশাল লজিস্টিক কার্যক্রম। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া এমন কর্মযজ্ঞ সফলভাবে সম্পন্ন করা অত্যন্ত কঠিন। তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষের আস্থা। অর্থনীতিতে বিশ্বাস একটি অদৃশ্য কিন্তু অমূল্য সম্পদ। মানুষ যদি মনে করে, আজ হাতে থাকা বৈধ নোট আগামীকাল হঠাৎ অচল হয়ে যেতে পারে, তাহলে নগদ অর্থের প্রতি তাদের আস্থা দুর্বল হতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম দায়িত্বই হলো এই আস্থা অটুট রাখা। বিশ্বের অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়।
২০১৬ সালে ভারত ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট অচল ঘোষণা করে। ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল কালোটাকা, জালনোট এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ। সিদ্ধান্তের পরপরই নগদ অর্থের সংকট, ব্যাংকের সামনে দীর্ঘ সারি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায় বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দেয়। পরে দেখা যায়, বাতিল হওয়া অধিকাংশ নোটই আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে এসেছে। ফলে কালোটাকা উদ্ধারে কতটা সাফল্য এসেছে, তা নিয়ে বিতর্ক আজও অব্যাহত। তবে ডিজিটাল লেনদেন ও কর ব্যবস্থার আওতা কিছুটা বেড়েছিল বলেও অনেকে মনে করেন। ভারতের অভিজ্ঞতা তাই দেখিয়েছে, নোট অচল করা কোনো অলৌকিক সমাধান নয়; এর সাফল্য নির্ভর করে প্রস্তুতি, বাস্তবায়ন এবং জনগণের সহযোগিতার ওপর।
নাইজেরিয়ার অভিজ্ঞতা একই ধরনের আরেকটি সতর্কবার্তা বহন করে। ২০২২ সালে দেশটি নতুন নোট চালু করে পুরনো নোট প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু নতুন নোট পর্যাপ্ত পরিমাণে বাজারে পৌঁছানোর আগেই পুরনো নোট প্রত্যাহার শুরু হওয়ায় তীব্র নগদ সংকট দেখা দেয়। ব্যাংক ও এটিএমের সামনে দীর্ঘ সারি পড়ে, ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হয় এবং শেষ পর্যন্ত সরকারকে নীতিতে পরিবর্তন আনতে হয়। উদ্দেশ্য ভালো হলেও প্রস্তুতির অভাব যে একটি ভালো উদ্যোগকেও ব্যর্থ করে দিতে পারে, নাইজেরিয়ার অভিজ্ঞতা তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
মিয়ানমারের অভিজ্ঞতা আরও বেদনাদায়ক। ১৯৮৭ সালে দেশটির সামরিক সরকার হঠাৎ বড় মূল্যমানের কয়েকটি নোট অচল ঘোষণা করে। পর্যাপ্ত বিনিময়ের সুযোগ না থাকায় বহু মানুষের সারা জীবনের সঞ্চয় মুহূর্তের মধ্যে মূল্যহীন হয়ে যায়। ব্যাপক জন-অসন্তোষ সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কখনও কখনও কীভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারে, এটি তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্য উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন নতুন নোট চালুর সময় সম্পূর্ণ ভিন্নপথ অনুসরণ করেছে। তারা পুরনো নোট একদিনে বাতিল না করে ধাপে ধাপে নতুন নোট চালু করেছে, জনগণকে পর্যাপ্ত সময় দিয়েছে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আগে থেকেই প্রস্তুত করেছে। ফলে লেনদেনে বড় ধরনের বিঘ্ন বা জনভোগান্তি সৃষ্টি হয়নি। শিক্ষা একটাই- প্রস্তুতি যত ভালো, ঝুঁকি তত কম।
এখানে আরেকটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে চাই। কয়েক বছর আগে কম্বোডিয়া সফরের সময় একটি বিষয় আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সেখানে মার্কিন ডলার এত ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় যে স্থানীয় মুদ্রার পাশাপাশি ডলারও কার্যত সমান্তরাল লেনদেনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এটি দেখায়, নিজস্ব মুদ্রার ওপর মানুষের আস্থা কমে গেলে বিদেশি মুদ্রা ধীরে ধীরে তার জায়গা দখল করে নিতে পারে।
বাংলাদেশে এখনও সে ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। এটিই আমাদের বড় শক্তি। দেশের মানুষ এখনও টাকার ওপর আস্থা রাখেন। কিন্তু সেই আস্থা অটুট রাখাও রাষ্ট্র ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম দায়িত্ব। যদি মানুষের মনে এই ধারণা জন্ম নেয় যে, বৈধভাবে অর্জিত অর্থও যে কোনো সময় হঠাৎ অচল হয়ে যেতে পারে, তাহলে অনেকে বিকল্প হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণ কিংবা অন্যান্য সম্পদে সঞ্চয় বাড়ানোর চেষ্টা করবেন। এর প্রভাব শুধু মুদ্রাব্যবস্থার ওপর নয়, পুরো অর্থনীতির ওপরই পড়তে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বহুবিধ বিষয় ভাবতে হবে এবং পূর্বপ্রস্তুতি রাখতে হবে।
আজ প্রায় অর্ধশতাব্দী পর আবার যখন বড় মূল্যমানের নোট অচল করার আলোচনা শুনি, তখন জহুরুল হক হলের সেই দিনের কথাই মনে পড়ে। তখন আমি ছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উদ্বিগ্ন ছাত্র। পরে কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা আমাকে উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে, একটি নোট অচল করা শুধু একটি প্রশাসনিক ঘোষণা নয়; এটি সমগ্র অর্থনীতিকে স্পর্শ করে এমন একটি গভীর নীতিগত সিদ্ধান্ত।
মুদ্রা কেবল কাগজ নয়; এটি জনগণের আস্থা, অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ এবং রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক। তাই নোট অচল করার মতো সিদ্ধান্ত আবেগের বশে বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নেওয়া উচিত নয়। এমন সিদ্ধান্তের আগে প্রয়োজন সুগভীর গবেষণা, সুচিন্তিত পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং সর্বোপরি মানুষের আস্থা অক্ষুণ্ন রাখার অঙ্গীকার। কারণ অর্থনীতিতে বিশ্বাস একবার নষ্ট হলে তা পুনর্গঠন করতে অনেক সময় লাগে; কিন্তু একটি ভুল সিদ্ধান্ত নিতে লাগে মাত্র কয়েক মুহূর্ত।
মাহফুজুর রহমান : সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক
মতামত লেখকের নিজস্ব