স্থানীয় সরকার নির্বাচন গণতন্ত্রের ভিত্তিকে শক্তিশালী করে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মানুষের সবচেয়ে কাছের প্রতিনধি নির্বাচিত হয়। এ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হলে রষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ে। স্থানীয় উন্নয়নও গতিশীল হয়। তাই নির্বাচনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের আইন সংশোধনের সুপারিশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বক্ষণিক কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করা এবং দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা। একই সঙ্গে ঋণখলাপি, বিলখেলাপি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্রভুক্ত ব্যক্তিদের অযোগ্য করার প্রস্তাবও এসেছে। এসব বিষয় নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করার প্রচেষ্টার অংশ।আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সশস্ত্র বাহিনীকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। অতীতে বিভিন্ন নির্বাচনে সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করেছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকার আইনি ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইনগত ভিত্তি স্পষ্ট হলে দায়িত্ব পলন আরও সুসংগঠিত হবে। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী সীমিত ও নিরপেক্ষ থাকতে হবে। তাদের উপস্থিতি ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ভোটারদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করবে না।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বাতিলের প্রস্তাবও গুরুত্বের দাবি রাখে। একজন শিক্ষক শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী নন। তিনি সমাজের নৈতিক পথপ্রদর্শক। তিনি রাষ্ট্রীয় সহায়তায় পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিলে দায়িত্ব পালনে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষ পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতি থাকা প্রয়োজন।
তবে শুধু আইন পরিবর্তন করলেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। আইনের কার্যকর প্রয়োগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে থাকতে হবে নিরপেক্ষ। নির্বাচনি আচরণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কালো টাকার ব্যবহার, পেশিশক্তির প্রভাব এবং ভোটার ভয়ভীতি বন্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রার্থীদের আয়, সম্পদ এবং ঋণের তথ্য যাচাই প্রয়োজন। মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব যেন কাজ না করে। নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। গণমাধ্যম যেন নির্ভয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও সংবাদ প্রকাশ করতে পারে, সেই পরিবেশও নিশ্চিত করা জরুরি।