বিশ্বকাপ থেকে ইরানের বিদায়ের পর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী মার্কওয়েন মুলিন। তার মন্তব্যকে ‘শত্রুতাপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ইরানের ফুটবল সংস্থা। সংস্থাটির দাবি, পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক ও অমানবিক আচরণ করা হয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। তবে শেষ পর্যন্ত দলটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় এবং গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচই ড্র করে শেষ বত্রিশে ওঠার খুব কাছাকাছি পৌঁছায়। কিন্তু শেষ ম্যাচে মিসরের বিপক্ষে অল্পের জন্য অফসাইডের সিদ্ধান্তে জয় হাতছাড়া হওয়ায় বিদায় নিতে হয় তাদের।
বিশ্বকাপ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের আচরণ নিয়ে একাধিকবার অভিযোগ তোলে ইরানের ফুটবল সংস্থা। প্রধান কোচ আমির ঘালেনোয়ি দাবি করেন, বিশ্বকাপে তার দলই ছিল ‘সবচেয়ে বেশি নিপীড়নের শিকার’।
মঙ্গলবার ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিশ্বকাপে তাদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা প্রতিযোগিতার ন্যায্যতার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বিশ্বকাপের নিরাপত্তাবিষয়ক এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কওয়েন মুলিন বলেন, ‘তারা বিদায় নিয়েছে, এ জন্য আমি খুবই খুশি। তারা আর ফিরবে না।’
‘তাদের ভিসা বাতিল করে যুক্তরাষ্ট্রের মাটি ছাড়তে বলার সুযোগ পেয়ে আমি খুব আনন্দিত হয়েছিলাম। আনন্দে হয়তো গানও গেয়েছি, এমনকি নেচেছিও।’
এর জবাবে ইরানের ফুটবল সংস্থা এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ওই কর্মকর্তার বক্তব্যে তারা বিস্মিত নয়। বরং এই মন্তব্য প্রমাণ করে, শুরু থেকেই বিশ্বকাপে ইরানকে স্বাগত জানানো হয়নি।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের দুর্ব্যবহার ও মিথ্যা বক্তব্যের সঙ্গে ইরানের মানুষ পরিচিত। তাই এই শত্রুতাপূর্ণ মন্তব্যে কেউ বিস্মিত নয়।’
তারা আরও জানায়, ‘এই বক্তব্য আবারও প্রমাণ করল, আন্তর্জাতিক আইন কিংবা একটি বৈশ্বিক ক্রীড়া আয়োজনের স্বাগতিক দেশের দায়িত্ব ও নীতির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রকৃত অঙ্গীকার নেই।
‘ইরানের বিদায় উদ্যাপন করার মাধ্যমে তিনি আমাদের দল সম্পর্কে নয়, বরং নিজের মানসিকতারই পরিচয় দিয়েছেন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরে একটি দলের উপস্থিতিও যারা সহ্য করতে পারেন না, তাদের সংকীর্ণ মানসিকতারই প্রতিফলন এটি।’
‘নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের পর আমাদের কোচ বলেছিলেন, অমানবিক ও অপেশাদার আচরণের কারণে যুক্তরাষ্ট্র চায়নি ইরান এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকুক। সাম্প্রতিক এই মন্তব্য সেই বিশ্বাসকেই আরও দৃঢ় করেছে।’
বিশ্বকাপের আগে ইরান তাদের অনুশীলন শিবির যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের পরিবর্তে মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী তিহুয়ানায় স্থানান্তর করে। যদিও তাদের তিনটি গ্রুপ ম্যাচই অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্রে—প্রথম দুটি লস অ্যাঞ্জেলেসে এবং শেষটি সিয়াটলে।
বিশ্বকাপ চলাকালে ইরানের অন্যতম অভিযোগ ছিল, প্রতিটি ম্যাচ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের স্টেডিয়াম এলাকা ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হতো।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মুলিন বলেন, ‘এটি ছিল পারস্পরিক সমঝোতার অংশ। ম্যাচ শেষ হলে তারা যেন দ্রুত নিজেদের শিবিরে ফিরে যায়—এমন সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছিল। সেখানে তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত। প্রতিযোগিতা শুরুর আগে ফিফার সঙ্গে আলোচনা করেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল।’
তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের খেলোয়াড় নন—এমন প্রতিনিধিদলের প্রায় অর্ধেক সদস্যের সঙ্গে দেশটির ইসলামি বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।
এ বিষয়ে ফিফার মতামত জানতে চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বিশ্বকাপ শেষে বিদায়ের আগে মেক্সিকোর মানুষের উদ্দেশে হাতে লেখা একটি বার্তা রেখে যায় ইরান দল। সেখানে তারা লিখেছে, ‘আপনারা আমাদের দেখিয়েছেন, বিশ্বকাপ আয়োজন শুধু স্টেডিয়াম আর টিকিটের বিষয় নয়।’
‘প্রকৃত আতিথেয়তা মানে সম্মান, মানবিকতা ও মর্যাদা। তিহুয়ানার মানুষের আন্তরিকতা আমরা কখনো ভুলব না। আজ থেকে মেক্সিকো আমাদের কাছে শুধু একটি স্বাগতিক দেশ নয়, এটি আমাদের দ্বিতীয় ঘর এবং দ্বিতীয় দল।’
‘আমরা গর্ব নিয়ে বিশ্বকাপ শেষ করছি। তবে একটি প্রশ্ন রয়ে গেল—সব দল কি সত্যিই সমান সুযোগ ও সমান পেশাদার পরিবেশে খেলতে পেরেছে?’
‘আমাদের অভিজ্ঞতায় এমন কিছু সিদ্ধান্ত, যাতায়াত-সংক্রান্ত ব্যবস্থা ও নানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা ন্যায্যতার অনুভূতিকে ক্ষুণ্ন করেছে। গ্রুপ পর্বের শেষ দিনের ঘটনাগুলো সেই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে।’