রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১২:১৮ অপরাহ্ন

ফ্রান্স-স্পেনে ভয়াবহ দাবানল : সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ৩ লাখের বেশি মানুষ

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬
  • ১ বার

ফ্রান্স ও স্পেনে ভয়াবহ দাবানল আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে। প্রবল বাতাস ও তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছেন দমকলকর্মীরা। দুই দেশে এখন পর্যন্ত তিন লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আগুন দ্রুত বোর্দো শহরের দিকে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা যায়।

ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিরন্দ ও লঁদ অঞ্চলে শনিবার রাতে আরও ৫৫ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে দেশটিতে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখে পৌঁছেছে।

দমকল বাহিনীর কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন নিকোলা ব্রাজ জানান, দাবানল এতটাই ভয়াবহ যে এটি নিজস্ব বাতাস ও ঘূর্ণি তৈরি করছে, ফলে আগুনের গতিপথ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘আগুন এখনো নিয়ন্ত্রণের অনেক বাইরে। সামনে আরও একটি কঠিন রাত অপেক্ষা করছে।’

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফ্রান্স সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। সেনাসদস্যরা ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে আগুন ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ফায়ারব্রেক তৈরি করছেন। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে বলেন, সরকার যতদিন প্রয়োজন ততদিন সহায়তা অব্যাহত রাখবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনর্গঠন করা হবে।

শনিবার প্রবল বাতাসে ধোঁয়া বোর্দো শহরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। শহরজুড়ে পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়।

বোর্দোর কাছে ছুটি কাটাতে যাওয়া ব্রিটিশ পর্যটক স্পেনসার র‍্যান্ডাল জানান, শনিবার ভোরে পরিবার নিয়ে প্রায় ১০০ মাইল দূরে সরে গেলেও সেখানে বসে পোড়া গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘প্রবল বাতাস আগুনকে আরও উসকে দিচ্ছে। পরিস্থিতি সত্যিই ভয়ঙ্কর।’

বোর্দোতে অবস্থানরত আরেক ব্রিটিশ দম্পতি জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাদের ভাড়া করা বাড়ির সুইমিংপুল ছাইয়ে ঢেকে গেছে এবং বাইরে হাঁটলে পায়ে কালো ছাই লেগে যাচ্ছে। তাদের ভাষ্য, শ্বাস নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ধোঁয়া ফুসফুসে তীব্র প্রভাব ফেলছে।

এদিকে বোর্দোর কাছের সাঁ-ওবাঁ-দ্য-মেদক এলাকার বাসিন্দারা পরিস্থিতিকে বিপর্যয়কর বলে বর্ণনা করেছেন।

দাবানলের কারণে রোববার অনুষ্ঠিতব্য বিখ্যাত সাইকেল প্রতিযোগিতা ট্যুর দ্য ফ্রান্সের শেষ ধাপের দূরত্ব ১৩৩ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ৮৯ কিলোমিটার করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দাবানলকবলিত এলাকায় মোতায়েনের সুবিধার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ জরুরি বৈঠক ডাকছেন। বর্তমানে ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ৩০টি বড় দাবানল জ্বলছে। দেশটির সরকার একে অভূতপূর্ব পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছে।

অন্যদিকে স্পেনেও দাবানল অব্যাহত রয়েছে। রাজধানী মাদ্রিদের আশপাশে পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মার্লাস্কা বলেন, আবহাওয়া পরিস্থিতি মোটেও সহায়ক নয় এবং প্রবল বাতাস আগুনকে আরও দক্ষিণে ছড়িয়ে দিতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘সামনের রাত আমাদের জন্য মোটেও সহজ হবে না।’

স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাদ্রিদ ও আভিলা অঞ্চল থেকে প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আরও ২৮ হাজার মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছেন। শনিবার রাতে তোলেদোর কাছে অন্তত আটটি পৌর এলাকার বাসিন্দাদেরও সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মাদ্রিদের আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট ইসাবেল দিয়াস আয়ুসো একে ‘ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল’ বলে উল্লেখ করেছেন।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জানান, চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে। গত এক দশকে দেশটির বার্ষিক গড় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল এক লাখ হেক্টর।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ জানান, ২০২৬ সালের শুরু থেকে দেশটিতে ৯৮ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা আগুনে পুড়ে গেছে।

এদিকে ইতালির সিসিলি দ্বীপেও ৩৫০টির বেশি দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১০টি বড় অগ্নিকাণ্ড। পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

স্কটল্যান্ডের কেয়ার্নগর্মস ন্যাশনাল পার্কেও টানা ১০ দিন ধরে দাবানল জ্বলছে। শুক্রবার সেখানে বড় ধরনের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংকট ব্যবস্থাপনা কমিশনার হাদজা লাহবিব সতর্ক করে বলেছেন, এ বছর ইউরোপে দাবানলের ক্ষয়ক্ষতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। তার ভাষ্য, গত বছর গ্রীষ্মে প্রায় ১০ লাখ হেক্টর এলাকা পুড়ে গিয়েছিল, তবে এ বছর দাবানলের মৌসুম আরও আগেই শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আবহাওয়াবিদরা নতুন করে তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস দিয়েছেন, ফলে সামনে আরও দাবানল ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ফ্রান্সের অনুরোধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিভিল প্রোটেকশন ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। এর আওতায় ক্রোয়েশিয়া থেকে তিনটি কানাডেয়ার অগ্নিনির্বাপণ বিমান, পর্তুগাল থেকে দুটি এয়ার ট্র্যাক্টর বিমান, চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়া থেকে ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার এবং রোমানিয়ার ৪০ সদস্যের বন অগ্নিনির্বাপণ দল ফ্রান্সে পাঠানো হচ্ছে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ