জনআকাঙ্ক্ষার সাথে যখন দূরদর্শী ও জনকল্যাণকামী নেতৃত্বের মেলবন্ধন ঘটে, তখন একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক রূপান্তরের পথ সুগম হয়। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা রাজনৈতিক অবরুদ্ধতা, অনিশ্চয়তা এবং জনআকাঙ্ক্ষার অবদমনের পর, এদেশের মানুষ অবশেষে তাদের কাঙ্ক্ষিত ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে জনগণের অভূতপূর্ব রায় একটি জনগণের সরকার গঠনের ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। সেই বিপুল জনরায়ের মূলে দাঁড়িয়ে, ১৭ ফেব্রুয়ারি জনম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার হাল ধরেন দেশনায়ক তারেক রহমান। ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এদেশের সাধারণ মানুষ ও তরুণ সমাজ যে ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন দেখেছিল, ২০২৬-এর এই ম্যান্ডেটে তারই এক সুসংহত এবং নিয়মতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশ আজ এক নতুন অগ্রযাত্রার মুখোমুখি।
দীর্ঘ প্রবাস জীবন ও নির্বাসিত জীবনের নানা প্রতিকূলতা এবং গভীর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা পাড়ি দিয়ে তিনি যখন প্রিয় মাতৃভূমির মাটিতে পা রাখলেন, তখন তাঁর আচরণে ছিল না কোনো প্রতিশোধের স্পৃহা, ছিল না ক্ষমতার চিরাচরিত দাপট। বরং তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল রাষ্ট্র সংস্কারের সুনির্দিষ্ট ও সুদৃঢ় প্রত্যয় “আই হ্যাভ আ প্ল্যান”। এই অমোঘ ঘোষণা মুহূর্তেই দেশবাসীর মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছিল।
ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবচেয়ে দৃঢ়তার সাথে প্রমাণ করেছেন রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত রূপান্তর। চিরাচরিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসাকে তিনি নির্বাসনে পাঠিয়েছেন। দীর্ঘদিনের বিভাজনের দেয়াল ভেঙে প্রবর্তন করেছেন ‘জাতীয় সমঝোতা’ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির এক নতুন ঘরানা। বিরোধী মতকে দমন করার পুরনো হাতিয়ারগুলোকে ছুড়ে ফেলে সংসদ ও সংসদের বাইরে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষাকে উৎসাহিত করছেন। স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়া হবে না; বরং আইনের শাসন ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা হবে।
প্রশাসনিক শুদ্ধাচার ও জনকল্যাণমুখী সুশাসনের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার যে অনন্য সব নজির স্থাপন করেছে, তা দেশের ইতিহাসে বিরল। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তোষামোদি এবং চাটুকারিতার সংস্কৃতি কঠোর হস্তে বন্ধ করা হয়েছে। সরকারি দপ্তরে প্রধানমন্ত্রীর ছবি প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা বা সভা-সমাবেশে ব্যক্তিপূজা নিষিদ্ধ করে তিনি মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র বা ‘মেরিটোক্রেসি’র ডাক দিয়েছেন। নিজের জীবনযাপনেও তিনি মিতব্যয়িতা আর সংযমের পরিচয় দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় বাসভবন ব্যবহার না করে নিজস্ব বাসভবনে থাকা, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার এবং নিজ খরচে জ্বালানি ব্যয়ের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তিনি জনগণের সেবক হতে চান। ভিভিআইপি প্রটোকল সীমিত করে সাধারণ মানুষের মতো ট্রাফিক সিগন্যালে অপেক্ষা করা, সরকারি কর্মকর্তাদের সকাল ৯টায় অফিসে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা এবং শনিবারও অফিস কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে প্রশাসনিক শৃঙ্খলায় নতুন গতি ফিরিয়ে এনেছেন।
সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বস্তি নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কঠোর হাতে বাজার সিন্ডিকেট দমন এবং টিসিবির কার্যক্রম ৪০ শতাংশ বৃদ্ধির মতো যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি। নিম্নআয়ের মানুষের সরাসরি সহায়তায় চালু করা হয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, যার মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৩৭ হাজারেরও বেশি পরিবারকে মাসে ২,৫০০ টাকা নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ প্রবর্তন করে সার, বীজ ও কৃষি যন্ত্রপাতির সরাসরি ভর্তুকি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং প্রায় ১২ লাখ প্রান্তিক কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। এছাড়া ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া ৯ম জাতীয় পে-স্কেল প্রায় ২৩ লাখ সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীর জীবনে এক বড় স্বস্তি বয়ে আনবে, যা ধাপে ধাপে তিন বছরে বাস্তবায়িত হবে। শিল্প খাতে গতি ফেরাতে সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।
তারেক রহমানের ‘নতুন বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে তরুণ প্রজন্ম ও প্রযুক্তি খাতকে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করতে তিনি এনটিআরসি এর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের স্বচ্ছ প্রক্রিয়া চালু করেছেন। তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ফ্রিল্যান্সিং ও স্টার্টআপ খাতে উৎসাহ দিতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইটি খাতের বৈশ্বিক বাজারে দেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পে-পালসহ অন্যান্য পেমেন্ট গেটওয়ে বাংলাদেশে আনার জোরালো প্রচেষ্টা চলছে। কর্মসংস্থানের এই নতুন ধারায় মেধাবী তরুণরা যাতে দেশে বসেই বিশ্বজয় করতে পারে, তার জন্য সরকার সব ধরনের প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করছে। তাঁর এই ভিশন দেশের হাজারো তরুণকে বেকারত্ব থেকে মুক্ত করে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখায়।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় বর্তমান সরকারের দূরদর্শী প্রকল্পগুলো দেশের দীর্ঘমেয়াদী সমৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মিড-ডে মিলের পরিকল্পনা এবং শিশুদের বিনামূল্যে ড্রেস, জুতো ও ব্যাগ বিতরণ কার্যক্রম গ্রামীণ জনপদে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছে। স্বাস্থ্যখাতে ‘ই-হেলথ কার্ড’ প্রবর্তন এবং ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মাধ্যমে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবাকে আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যেখানে ৮০ শতাংশ নিয়োগই পাবেন নারীরা। পরিবেশ রক্ষায় নদী-খাল খননের বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে, যার আওতার ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও জলাশয় খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ প্রকল্প জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিকে বিশ্ব দরবারে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
তারেক রহমানের সরকার এক সুদূরপ্রসারী ও আধুনিক প্রতিরক্ষা দর্শন গ্রহণ করেছে। শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে বর্তমান বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ ১ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে । বিদেশি অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার এক সাহসী উদ্যোগ হিসেবে তুরস্কের সাথে যৌথ উদ্যোগে বগুড়া বিমানবন্দরের পাশে অত্যাধুনিক ড্রোন তৈরির কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে । একই সাথে বগুড়া বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। উত্তরবঙ্গকে কেন্দ্র করে বিমানবাহিনীর প্রথম ঘাঁটি স্থাপনের অনুমোদন এবং অত্যাধুনিক জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া চলমান থাকা প্রমাণ করে বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীল ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হওয়ার পথে অগ্রসরমান ।
অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জনে দেশীয় খনিজ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের ওপর সরকার বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। বিগত দিনের আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে দেশের নিজস্ব সম্পদ দিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এক মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে । দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি এবং মধ্যপাড়া পাথর খনিসহ অন্যান্য দেশীয় খনিজ সম্পদ আহরণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, যাতে দেশের সম্পদ জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা যায় ।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি ঘটেছে। প্রথাগত বিপুল সফরসঙ্গীর পরিবর্তে মাত্র ২৮ জন সদস্য নিয়ে বিদেশ সফরের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মালয়েশিয়া সফর দুই দেশের সখ্যতা এবং দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার পথ সুগম করেছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক ও ‘আমার বন্ধু মহাজাদু জানে’ গানের সুরের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত আত্মিক বন্ধন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক অনন্য ঘটনা। অন্যদিকে, চীন সফরের মাধ্যমে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি হয়েছে। বহুল আলোচিত তিস্তা পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প এবং পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণে চীনের ইতিবাচক সাড়া এদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে মরুকরণ থেকে রক্ষা করার পথে এক বিশাল বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি দেশকে কোনো শক্তির কাছে মাথা নত না করে আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করেছে।
একটি রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা কখনোই সহজ কাজ নয়; এর পদে পদে লুকিয়ে থাকে নানা বাধা আর ষড়যন্ত্রের জাল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তরুণ, আধুনিক ও জনমুখী নেতৃত্ব প্রমাণ করেছে যে, দৃঢ় সংকল্প আর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকলে স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। রাষ্ট্রে যে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে, তা আজ সাধারণ মানুষের মনে গভীর আস্থার সঞ্চার করেছে। ব্যর্থ অতীতের জীর্ণতা ঝেড়ে ফেলে মেধা ও সততার ভিত্তিতে একটি সমৃদ্ধ সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার মতো উন্নত বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখছেন, তা আজ দৃশ্যমান বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ যে অগ্রযাত্রার রাজপথে পা রেখেছে, সেই আলোকময় পথ ধরেই দেশ পৌঁছাবে তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে একটি সুখী, সমৃদ্ধশালী ও আত্মমর্যাদাশীল স্বপ্নের বাংলাদেশে।