বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ০১:০৮ অপরাহ্ন

রেমিট্যান্সে হঠাৎ খরার কারণ কী

মোস্তফা কামাল
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬
  • ১ বার

আমদানি, রপ্তানি, ব্যাংকিং খাতসহ অর্থনীতির নানা সূচকে অব্যাহত ভাটার মধ্যে শির টান করে ধাবমান ছিল প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহ। গত অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ মে পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩২ হাজার ৭৫৬ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে প্রাপ্ত ২৭ হাজার ৫০৬ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১৯.০৯ শতাংশ বেশি। রেমিট্যান্স প্রবাহের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এবং সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অনবরত নানা মন্দ খবরের মাঝে এই খাতের এমন আশা-জাগানিয়া আগুয়ানের চলতি পথে অর্থবছরের শেষ মাস জুনে এসে হঠাৎ খরার টান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা জুনে দেশে পাঠিয়েছেন ২৮০ কোটি ৬০ লাখ ডলার। মানে প্রতিদিন গড়ে ৯ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। অঙ্কটি এর আগের আট মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম। গত বছরের জুনের চেয়ে দশমিক ৬০ শতাংশ কম।

গেল ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে এসেছিল ২৮২ কোটি ২৫ লাখ ডলার। মার্চে ছিল রোজার ঈদ। মে মাসে কোরবানির ঈদ। উৎসব সামনে রেখে প্রবাসীরা সাধারণত বেশি টাকা পাঠান। পরে একটু একটু কমতে থাকে। এবার দুই ঈদের পরও মে মাস পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহ অব্যাহতই ছিল। কিন্তু জুনে এসে হোঁচট। দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে এর আগের মাস মেতে, প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এতে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে হয় ৩৪ হাজার ৭৬৬ দশমিক ৯৯ মিলিয়ন বা ৩৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্সে প্রতি ডলারে এখন ১২৩ টাকা দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। সেই হিসাবে জুনে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩৪ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা। প্রতিদিন গড়ে ১ হজার ১৫০ কোটি টাকা। রেমিট্যান্স নিয়ে গর্ব ও আশার মাঝে এই ছন্দ হারানো অর্থনীতির জন্য বড় রকমের ধাক্কা। এর মাঝে রেমিট্যান্স পাঠানোর চ্যানেল ব্যাংকগুলোর হিসাবে কিছু ফের খেয়াল করার মতো। ব্যাংকভিত্তিক রেমিট্যান্স চিত্রে বেশ মিশ্র প্রবণতা। একদিকে ৩০টি ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স আসা কমেছে, অন্যদিকে ২২টি ব্যাংকের মাধ্যমে বেড়েছে। এ সময়ে ৮টি ব্যাংকের মাধ্যমে কোনো রেমিট্যান্সই না আসা উদ্বেগের বিষয়। ইসলামী ব্যাংকে তো রেমিট্যান্সে বড় পতন।

এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকটির রেমিট্যান্স কমে গেছে প্রায় ৪১ শতাংশ। একসময় রেমিট্যান্সের পাইপলাইন হিসেবে ইসলামী ব্যাংক ছিল সেরা। অভ্যন্তরীণ গোলমালের মাঝেও মে মাসে ব্যাংকটির মাধ্যমে ৫৯ কোটি ২০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। জুনে তা নেমে আসে ৩৪ কোটি ৯২ লাখ ডলারে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকটির রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ২৪ কোটি ২৮ লাখ ডলার বা প্রায় ৪১ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে জনতা ব্যাংক, যেখানে রেমিট্যান্স ১৯ কোটি ৬৭ লাখ ডলার থেকে কমে ৫ কোটি ৮৪ লাখ নেমেছে; কমেছে ১৩ কোটি ৮২ লাখ ডলার। ব্র্যাক ব্যাংকের রেমিট্যান্স ৪০ কোটি ৯৮ লাখ ডলার থেকে কমে ২৭ কোটি ৩১ লাখ হয়েছে; কমেছে ১৩ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। পূবালী ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ৪ কোটি ৫৪ লাখ ডলার, যা আগের মাসের তুলনায় ১২ কোটি ডলার কম। একইভাবে রেমিট্যান্স আসা কমেছে সিটি ব্যাংকে ৬ কোটি ২৪ লাখ ডলার, ঢাকা ব্যাংকে ৫ কোটি ৩৫ লাখ ডলার, ট্রাস্ট ব্যাংকে ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে ২ কোটি ৫৪ লাখ ডলার, সাউথইস্ট ব্যাংকে ১ কোটি ৭৩ লাখ ডলার এবং ডাচ-বাংলা ব্যাংকে ১ কোটি ১৪ লাখ ডলার।

শুধু এই ১০ ব্যাংকেই জুনে রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ৮৩ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। কমার তালিকায় থাকা অন্য ব্যাংকগুলো হলোÑ সোনালী ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, সিটিজেন্স ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, সিটি ব্যাংক এনএ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, এইচএসবিসি এবং উরি ব্যাংক লিমিটেড। জুনে ৮টি ব্যাংকের মাধ্যমে এক ডলার রেমিট্যান্সও আসেনি। ব্যাংকগুলো হলোÑ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি, রাকাব (রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক), আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক পিএলসি, ব্যাংক আল-ফালাহ, হাবিব ব্যাংক লিমিটেড, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া। একই মাসে ২২টি ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স আসা বেড়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), ৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার. ইস্টার্ন ব্যাংকে ২ কোটি ৪৯ লাখ ডলার, এনসিসি ব্যাংকে ২ কোটি ২৬ লাখ ডলার, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে ১ কোটি ৬৭ লাখ ডলার, প্রাইম ব্যাংকে ১ কোটি ৩৬ লাখ ডলার, মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ১ কোটি ২৪ লাখ ডলার এবং ব্যাংক এশিয়ায় ১ কোটি ১১ লাখ ডলার। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ব্যাংক, এসবিএসি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ও বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকেও একটু বেড়েছে। এই মিশ্র ধারার ফের কিছুটা রহস্যজনক।

বেশ কিছুদিন ধরে রেমিট্যান্স প্রবাহে গতিময়তার পেছনে কিছু কারণ ছিল। এর অন্যতম হচ্ছেÑ হুন্ডি প্রতিরোধে সরকারের কঠোর অবস্থান, বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে নগদ প্রণোদনা, ব্যাংকিং সেবার সহজলভ্যতা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে দ্রুত অর্থ পাঠানোর সুযোগ বাড়ানো। এতে প্রবাসীদের মধ্যে আগের তুলনায় বৈধ চ্যানেল বেশি ব্যবহারের ঝোঁক বাড়ে। তখনও প্রশ্ন ঘুরছে, রেমিট্যান্স প্রবাহ স্থিতিশীল ও ঠিক রাখা কি সম্ভব হবে? হুন্ডি বা অবৈধ মাধ্যম পরিহার করে ব্যাংকিং চ্যানেলে বা অনুমোদিত মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে প্রবাসীদের মাঝে সচেতনতা বাড়ানো যাবে? একদিকে রেমিট্যান্স যোদ্ধা নামে আদর করে, অন্যদিকে রেমিট্যান্স উত্তোলনের প্রক্রিয়া কঠিন করলে এ প্রবাহে উল্টো ধারা তৈরি হবে। মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশে অদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে দক্ষ কর্মী পাঠানোতে জোর দিতে হবে। প্রচলিত ভাষার এ আদমদের আদম করেই রাখলে জোরাজুরিতে কাজ হবে না। তাদের ঘামে-শ্রমে পাঠানো টাকা দেশে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের কথা ভাবাও জরুরি। জুনে রেমিট্যান্স কমার পেছনে মূলত দুটি প্রধান কারণ কাজ করেছে। মে মাসে ঈদুল আজহার কারণে প্রবাসীরা পরিবারের জন্য অগ্রিম বেশি অর্থ পাঠিয়েছিলেন, ফলে জুনে স্বাভাবিকভাবেই রেমিট্যান্স পাঠানোর পরিমাণ কমেছে। এ ছাড়াও নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকে আস্থার সংকট বা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা থাকায় বিদেশি মানি এক্সচেঞ্জগুলো প্রবাসী আয় পাঠাতে নিরুৎসাহিত করেছে।

ইসলামী ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংকে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক মানি এক্সচেঞ্জগুলো অর্থ পাঠাতে কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করে, যা সামগ্রিক রেমিট্যান্স সংগ্রহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফের বা কারণ যা-ই হোক, রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে লাখতে হবে। বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে ও গতি ধরে রাখতে হুন্ডি প্রতিরোধ, প্রণোদনা সহজলভ্য করা এবং প্রবাসী কর্মীদের জন্য উন্নত বিনিয়োগ প্রকল্পের মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যাংকিং বা বৈধ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে টাকা পাঠানো আরও সহজ ও ফি-মুক্ত করতে হবে। প্রবাসীরা যেন ঝামেলাহীনভাবে সরাসরি দেশে অর্থ পাঠাতে পারেন, তা বিচেনায় রাখতে হবে। দেশে ফেরার পর প্রবাসীরা যেন তাদের কষ্টার্জিত অর্থ নিরাপদে বিনিয়োগ করতে পারেন, সে জন্য বিশেষ সঞ্চয়পত্র ও লাভজনক বিনিয়োগ প্রকল্প ডিজাইন করা যায়। মনে রাখতে হবে, প্রবাসীদের পাঠানো এই রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতি সচল রাখার এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমৃদ্ধ করার মূল চালিকাশক্তি। খরা কাটিয়ে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে হলে বিনিয়োগবান্ধব নীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য রক্ষা জরুরি। আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের ভূমিকা অপরিসীম। তাই এই আয় যেন কখনও না কমে, বরং কীভাবে তা বাড়ানো যায় সেই ভাবনা নিতে হবে বিশেষভাবে।

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ