বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম, ভরি কত? শাহজালালে ৪৫ কোটি টাকার স্বর্ণের বার উদ্ধার মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে চায় সরকার: মাহদী আমিন মিলেমিশে থাকাই বাংলাদেশের মানুষের আবহমানকালের মূল্যবোধ: প্রধানমন্ত্রী অনলাইন জুয়া-বেটিং দমনে নতুন আইন বাগাতিপাড়া পল্লী বিদ্যুৎ অফিস, পল্লী বিদ্যুতের ‘দ্বিগুণ-অস্বাভাবিক’ বিল, বিপাকে গ্রাহকরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সফর সম্পূর্ণ সফল: চীনা রাষ্ট্রদূত সারাদেশে একযোগে ‘নজরুল বর্ষ’ কর্মসূচির উদ্বোধন জাতীয় ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম কমল ৩৫৭ টাকা নির্বাচন করতে চাইলে চাকরি ছেড়ে দিন, শিক্ষকদের শিক্ষামন্ত্রী

বিনিয়োগ : ভিয়েতনাম মডেল থেকে শিক্ষা নিতে পারে বাংলাদেশ

মাসুদ রুমী
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬
  • ০ বার
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে কয়েকটি দেশ নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের গল্প রূপকথার মতো লিখেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান শক্তি ভিয়েতনাম তাদের অন্যতম। ব্যবসাবান্ধব শুল্কনীতি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সমন্বয়ে দেশটি গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের নতুন পাওয়ারহাউসে পরিণত হয়েছে।

কয়েক দশকে তৈরি পোশাক ও জুতা শিল্পের গণ্ডি পেরিয়ে ভিয়েতনাম এখন বিশ্বমানের টেক জায়ান্টদেরও প্রথম পছন্দের গন্তব্য। চীনের বিকল্প খুঁজতে থাকা স্যামসাং, অ্যাপল ও ফক্সকনের মতো কম্পানিগুলোর জন্য ভিয়েতনাম লালগালিচা বিছিয়ে দিয়েছে।একের পর এক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং ট্যাক্স হলিডের মতো আকর্ষণীয় প্রণোদনার মাধ্যমে দেশটি শত শত কোটি ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ করেছে। এই বিনিয়োগের জোয়ারে স্থানীয় অবকাঠামো চাঙ্গা হয়েছে, লাখ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং একসময়ের যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম এশিয়ার সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির অন্যতম উদাহরণে পরিণত হয়েছে।

১৯৮৬ সালের ‘দোই মোই’ বা অর্থনৈতিক সংস্কার নীতির মাধ্যমে চরম দারিদ্র্যপীড়িত দেশটি এখন উচ্চ প্রযুক্তির ম্যানুফ্যাকচারিং ও চিপশিল্পের অন্যতম বৈশ্বিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগিয়ে ভিয়েতনাম বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের এফডিআই নিজেদের ঘরে তুলেছে, তা এককথায় বিস্ময়কর। এই সাফল্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও কৌশলগত দূরদর্শিতার ফসল।

বিনিয়োগ : ভিয়েতনাম মডেল থেকে শিক্ষা নিতে পারে বাংলাদেশঅন্যদিকে প্রায় সমসাময়িক সময়ে অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু করা এবং সস্তা শ্রমের বিশাল জনমিতিক লভ্যাংশ (পপুলেশন ডিভিডেন্ড) থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক উল্লম্ফন এবং বাংলাদেশের এই দীর্ঘস্থায়ী অনগ্রসরতা দুই দেশের নীতিমালার পার্থক্যকেই স্পষ্ট করে।ভিয়েতনামের কৌশল : ভিয়েতনামের এই অভাবনীয় বিনিয়োগ সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাদের অত্যন্ত বাস্তবমুখী ও চতুর ভূ-রাজনৈতিক অর্থনৈতিক কৌশল, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘চীন প্লাস ওয়ান’ মডেল নামে পরিচিত। কোনো কম্পানি তাদের পণ্য উৎপাদনের জন্য শুধু চীনের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প হিসেবে অন্য অন্তত একটি দেশে কারখানা স্থাপন বা বিনিয়োগ করাকে চীন প্লাস ওয়ান মডেল বলে। গত এক দশকে বিশ্বের বড় বড় বহুজাতিক জায়ান্ট চীনের ওপর তাদের উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের সম্পূর্ণ নির্ভরতা কমাতে বিকল্প গন্তব্য হয়ে ওঠে ভিয়েতনাম।

চীন ও ভিয়েতনামের মধ্যে ঐতিহাসিক বৈরিতা ও সীমান্ত বিতর্ক থাকলেও ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট নেতৃত্ব রাজনৈতিক আদর্শ দিয়ে কখনো তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রভাবিত হতে দেয়নি।

তারা অত্যন্ত সুকৌশলে বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করেছে, আবার একই সঙ্গে ওয়াশিংটন এবং ব্রাসেলসের সঙ্গেও নিজেদের বাণিজ্যের পরিধি বাড়িয়েছে। চীনের সরবরাহ শৃঙ্খল, কাঁচামাল বা যন্ত্রাংশ খুব সহজেই সড়ক ও রেলপথের মাধ্যমে ভিয়েতনামে চলে আসে। বাংলাদেশ এই সুবিধা নেওয়ার মতো বিশাল ভূ-রাজনৈতিক সুযোগ সামনে পেয়েও শুধু কৌশলগত দূরদর্শিতা এবং সময়োপযোগী অবকাঠামোগত প্রস্তুতির অভাবে তা কাজে লাগাতে পারেনি।ভিয়েতনামে চীনা পুঁজির মহীরুহ : ভিয়েতনামের মোট বিদেশি বিনিয়োগের দিকে তাকালে দেখা যাবে, সেখানে চীনা পুঁজির প্রভাব দিন দিন কতটা বাড়ছে। ২০২৫ সালে চীন ও হংকং থেকে ভিয়েতনামে বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮.১৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে চীন ছিল ভিয়েতনামে তৃতীয় বৃহত্তম বিনিয়োগকারী। আরো বিস্ময়কর হলো, ২০২৫ সালে ভিয়েতনামের মোট এফডিআইয়ের অর্ধেকেরও বেশি প্রায় ৫৬.৫ শতাংশ এসেছে প্রসেসিং ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে। ভিয়েতনামে চীনা বিনিয়োগের গুণগত মানেও এসেছে এক আমূল পরিবর্তন। সেখানে স্যামসাং, অ্যাপল ও ফক্সকনের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টরা ভিয়েতনামে তাদের বিশাল উৎপাদন লাইন গড়ে তুলেছে। অথচ স্যামসাং বাংলাদেশেও আসতে চেয়েছিল, কিন্তু জমিসংক্রান্ত জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক হয়রানির কারণে আমরা ধরে রাখতে পারিনি।

আমলাতান্ত্রিক ও আইনি সংস্কারের বিপ্লব : বিনিয়োগকারীরা শুধু একটি দেশের সস্তা শ্রমের দিকে তাকান না, তাঁরা দেখেন সেখানে ব্যবসা শুরু করার এবং তা টিকিয়ে রাখার প্রক্রিয়া কতটা সহজ ও গতিশীল। ভিয়েতনাম শুধু প্রাকৃতিক বা ভৌগোলিক সুবিধার ওপর ভরসা করে বসে থাকেনি। তারা বছরের পর বছর ধরে একের পর এক আমূল প্রশাসনিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি সংস্কার করেছে। বিশেষ করে তাদের নতুন অর্থনৈতিক ইশতেহার এবং বিশেষ রেজল্যুশনের মাধ্যমে তাদের বিনিয়োগনীতিকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে সবচেয়ে আধুনিক করে তোলা হয়েছে।

ভিয়েতনামে বিনিয়োগের লাইসেন্স পাওয়ার সময়সীমা অতীতে যেখানে ৩০ থেকে ৪৫ দিন ছিল, তা প্রাতিষ্ঠানিক ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে নামিয়ে আনা হয়েছে মাত্র সাত থেকে ১৫ দিনে। আরো বিস্ময়কর বিষয় হলো, উচ্চ প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের মতো কৌশলগত খাতের জন্য তারা চালু করেছে ‘সবুজ ঋণ’, যা দ্রুত পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয় দেশটি। এই ব্যবস্থার অধীনে কোনো বড় বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান আবেদন করলে মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কিছু প্রাথমিক লাইসেন্স ও অনুমোদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হয়ে যায়।

একই সঙ্গে ভিয়েতনাম সরকার সম্প্রতি মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ১১টি বিশেষ রেজল্যুশনের মাধ্যমে ৫৬টি শর্তযুক্ত ব্যাবসায়িক খাত সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করেছে এবং প্রায় এক হাজার ৭৫৪টি ব্যাবসায়িক শর্ত বা নিয়ম-কানুন শিথিল করেছে। এর ফলে বেসরকারি খাত এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আইনি নিয়ম মানার পেছনে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এক ধাক্কায় প্রায় ৫৪.৬ শতাংশ কমে গেছে।

উচ্চ প্রযুক্তির এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পের জন্য ভিয়েতনামের করকাঠামো অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তারা এ ধরনের শিল্পের ক্ষেত্রে চার বছর সম্পূর্ণ কর মওকুফ এবং পরবর্তী ৯ বছর অর্ধেক কর দেওয়ার নীতি অত্যন্ত কঠোরভাবে ও দীর্ঘ মেয়াদে বজায় রেখেছে। করের এই হার বা নীতি হুট করে কোনো বাজেটে পরিবর্তন করা হয় না, যা বিনিয়োগকারীদের ১০ বা ১৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি ব্যাবসায়িক পরিকল্পনা সাজাতে দারুণভাবে সাহায্য করে।

মানবসম্পদ খাতের রূপান্তর : ভিয়েতনামের রূপান্তরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো তাদের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন। তারা বুঝতে পেরেছে, সস্তা ও অদক্ষ শ্রমিকের ওপর ভরসা করে থাকলে তারা চিরকাল নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হয়েই থাকবে। তাই তারা তৈরি পোশাকের মতো কম মূল্য সংযোজনকারী খাত থেকে বেরিয়ে উচ্চ প্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের দিকে ধাবিত হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ হাজার থকে এক লাখ চিপ প্রকৌশলী তৈরির একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে দেশটির সরকার এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করেছে। বর্তমানে ভিয়েতনামের ৩৫টিরও বেশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরাসরি সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ ডিজাইন নিয়ে কাজ করছে।

লজিস্টিকস ও অবকাঠামোর মানদণ্ড : ভিয়েতনামে তিনটি সচল মেগাপোর্টসহ (হাই ফং, ক্যাট লাই, কাই মেপ) মোট ৩৪টি বন্দর ও ৩২০টি টার্মিনাল রয়েছে। এগুলো সরাসরি বিশ্বের বৃহত্তম কনটেইনার মাদার ভেসেল বা জাহাজ নোঙর করতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে গভীরতার (ড্রাফট) সীমাবদ্ধতার কারণে বড় মাদার ভেসেলগুলো সরাসরি ভিড়তে পারে না। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরটি চালু হলে এই সংকট অনেকটাই কেটে যাবে।

বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্সে (এলপিআই) ভিয়েতনামের অবস্থান বেশ ওপরের দিকে (র‌্যাংক ৪১)। তাদের সমন্বিত মাল্টিমোডাল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ অনেক কম। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১০০-এর কাছাকাছি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ধীরগতির কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের কারণে পণ্য খালাসে সময় বেশি লাগে।

বাংলাদেশ বনাম ভিয়েতনাম : একটি দেশের অর্থনৈতিক গভীরতা বোঝা যায় তার বাণিজ্য ও বিনিয়োগের চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বার্ষিক মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ যেখানে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ভিয়েতনাম ও চীনের মধ্যে বার্ষিক মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৫৬.৪ বিলিয়ন ডলার। আমদানির ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশ চীন থেকে প্রতিবছর প্রায় ২২.৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে, যার মধ্যে রয়েছে তুলা, সুতা, সিনথেটিক ফ্যাব্রিকস এবং ভারী যন্ত্রপাতি। কিন্তু চীনে রপ্তানি করতে পারে মাত্র ১.১৬ বিলিয়ন ডলার। ফলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বার্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি প্রকট, যার পরিমাণ ২১.৬৪ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে ভিয়েতনাম চীন থেকে বিশাল অঙ্কের পণ্য আমদানি করলেও চীনে বার্ষিক প্রায় ৯৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। ভিয়েতনাম চীন থেকে পার্টস আমদানি করে নিজেদের কারখানায় হাই-টেক পণ্য তৈরি করে সেগুলো আবার বিশ্ববাজারে বিক্রি করছে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরো বেশি বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের নিট এফডিআই ছিল মাত্র ১.৭৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে তা দাঁড়িয়েছে মাত্র এক বিলিয়ন ডলারে। অথচ ২০২৫ সালে ভিয়েতনামে মোট নিবন্ধিত এফডিআই ছিল ৩৮.৪২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই ১৮.২৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ভিয়েতনামের এফডিআই স্টক ২০২৪ সালে ছিল ২৪৯.১৪ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের চেয়ে ১৩ গুণের বেশি। বাংলাদেশের মাথাপিছু এফডিআই মাত্র ৯ ডলার, যেখানে ভিয়েতনামে তা ১৭৫ ডলার।

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশে যে সামান্য এফডিআই আসে, তার গুণগত মান অত্যন্ত দুর্বল। বাংলাদেশে মূলত তৈরি পোশাক বা টেলিকম খাতে আগে থেকে ব্যবসা করা বিদ্যমান বিদেশি কম্পানিগুলোর অর্জিত মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ করাকেই মোট এফডিআই হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

আমাদের গলদ যেখানে : বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং সস্তা শ্রমের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কেন আমরা এফডিআই আকর্ষণে ব্যর্থ, তার আসল সমস্যাগুলো কাঠামোগত।

প্রথমত, অবকাঠামো ও জ্বালানি। ভিয়েতনাম যেখানে বিনিয়োগকারীদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করেছে, সেখানে বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র হলো গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকট। এতে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে।

দ্বিতীয়ত, আমলাতন্ত্র। ভিয়েতনামে মাত্র সাত থেকে ১৫ দিনে লাইসেন্স দেওয়া হয়, অথচ বাংলাদেশে একটি লাইসেন্স পেতে মাসের পর মাস সময় লেগে যায়।

তৃতীয়ত, নীতিমালার ধারাবাহিকতার অভাব। ভিয়েতনামে ১০ থেকে ১৫ বছরের জন্য করনীতি অপরিবর্তিত থাকে, কিন্তু বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছর বাজেটে করের হার হুট করে বদলে যায়।

চতুর্থত, ডলার সংকট। বাংলাদেশে ডলার সংকটের সময় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্জিত মুনাফা সহজে নিজেদের দেশে নিতে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।

পঞ্চমত, দক্ষ মানবসম্পদের অভাব। আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা তাত্ত্বিক বিদ্যায় আটকে আছেন, অথচ ভিয়েতনামের শ্রম উৎপাদনশীলতা বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের এই বিনিয়োগ খরা দূর করার ক্ষেত্রে আশার আলো সঞ্চার করেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর। গত ২৬ জুনে বেইজিংয়ে এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে চীনের ১২টি শীর্ষস্থানীয় মেগাকম্পানি বাংলাদেশে রেকর্ড ৯.২১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বিনিয়োগের প্রস্তাব পেশ করেছে। চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং মোংলা ও চট্টগ্রামে চীনা বিনিয়োগের জন্য বিশেষ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এখন প্রয়োজন এই বিপুল বিনিয়োগের প্রস্তাবকে আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ম্যমুক্ত রেখে দ্রুত বাস্তবে রূপদান করা। ভিয়েতনামের সাফল্য থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ যদি তার নীতিগত ধারাবাহিকতা, অবকাঠামোগত নিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক গতিশীলতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে, তবেই শুধু এই বিপুল সম্ভাবনাকে সার্থক করা সম্ভব হবে। অন্যথায় রূপকথার গল্পগুলো শুধু ভিয়েতনামেরই থাকবে, আমরা শুধু দূর থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলব।

লেখক : সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

কালের কণ্ঠের উপসম্পাদক

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ