বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ১২:২৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
জাইমা রহমানের ছবি ব্যবহার করে প্রতারণার মামলায় আইনজবী রিমান্ডে ধানমন্ডিতে সাংবাদিককে মারধর করলেন জামায়াতকর্মীরা মন্তব্য মাহদী আমিনের, বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মর্যাদা, সম্মান ও দৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত করছেন প্রধানমন্ত্রী অবসরের ঘোষণা দেওয়া মেসি যেভাবে উঠলেন শিখরে একযোগে জামায়াতপন্থী ১৭ ডেপুটি ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ ইরানের আকাশে ‘ভিনগ্রহের কাণ্ডকারখানা’, মার্কিন পাইলটের ভয়ংকর বর্ণনা হাসিনাসহ ১০ জনের নামে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারি করতে দুদকের আবেদন ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬, কেইনকে কালো জাদু করতে ‘ওঝা’ আনল ঘানা! ‘আমার বন্ধু মহা জাদু জানে’ গান দিয়ে তারেক রহমানের সফরের ভিডিও প্রকাশ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর ঘিরে বড় প্রত্যাশা চীনের

যানজট ও জনজটে নাকাল রাজধানীবাসী

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬
  • ৬ বার

চারদিকে নদী রেখে ৪০০ বছর আগে যে রাজধানী গড়ে উঠেছিল, উন্নয়নের ছোবলে, অপরিকল্পিত নগরায়ণে তার অবস্থান এখন আইসিইউতে।

রাজধানীর যানজট নিরসনে সম্প্রতি সরকার একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ঢাকার প্রধান চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল শহর থেকে সরিয়ে শহরের বাইরে স্থাপন করা হবে। বলা বাহুল্য, এই পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে শহরের যানজট অনেকটা কমে যাবে। কিছুদিন আগে ফুটপাত হকারদের দখলমুক্ত করা হয়েছিল। এতে করে রাস্তায় কিছুটা স্বস্তি এলেও এই নিয়ম বলবৎ রাখা সম্ভব হয়নি। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর থেকে ঢাকায় যানজট লক্ষণীয় মাত্রায় বেড়ে যেতে দেখা যায়। এর পেছনে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা যেমন দায়ী, তেমনি রাজনৈতিক কারণে এলাকা ছেড়ে চলে আসা এক জনগোষ্ঠীও দায়ী বলে মনে করা হয়। প্রায় দুই বছর ধরে যানজটের সব রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে বলে ঢাকায় বসবাসকারী নাগরিকদের ধারণা।

যানজটের কারণে ঢাকায় বসবাসকারী মানুষের যে ভোগান্তি তা তাদের কর্মক্ষমতা, আয়ু ও জীবন থেকে মানসিক স্বস্তি সব কেড়ে নিচ্ছে। রাজধানীর সড়কে পরিচালিত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীতে যানজটের কারণে প্রতিদিন নষ্ট হয় এক কোটি ৯০ লাখ কর্মঘণ্টা। যানজটে নষ্ট হওয়া অতিরিক্ত সময়ের মূল্য গড়ে ঘণ্টায় ৭০ টাকা ধরে হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতিদিন ক্ষতির পরিমাণ ১৩৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শহরের আয়তনের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ সড়ক থাকতে হয়। তবে ঢাকায় সড়ক রয়েছে সাত-আট শতাংশ। যদিও গাড়ি চলাচলের মতো রয়েছে তিন-চার শতাংশ সড়ক। ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সড়কের কম করে হলেও ৩০ ভাগ বা তারও বেশি দখল করেছে অবৈধ পার্কিং এবং এর সঙ্গে রয়েছে নানা ধরনের দখলদারিত্ব। অন্যদিকে স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানের (এসটিপি) হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকায় কমবেশি ১৫ ভাগ যাত্রী প্রাইভেট গাড়িতে যাতায়াত করেন। এই প্রাইভেট কারের দখলে থাকে ৭০ ভাগেরও বেশি রাস্তা। বাকি ৮৫ ভাগ যাত্রী অন্য কোনো ধরনের গণপরিবহন ব্যবহার করেন। অর্থাৎ তারা গণপরিবহন সড়কের মাত্র ৩০ ভাগ এলাকা ব্যবহারের সুযোগ পান। তা ছাড়াও অফিস ও এবং ব্যবসা-বাণিজ্য চলাকালীন ৮০ ভাগ গাড়ি রাস্তায় যততত্র পার্কিং করার ফলে যানজট দ্বিগুণ মাত্রায় বেড়ে যায়।

শহরের মধ্য দিয়ে লেভেলক্রসিংয়ের ফলে গুরুত্বপূর্ণ ১৭টিরও বেশি পয়েন্টে দিনে কমপক্ষে ১০ বার যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়। শহরের একই রাস্তায় বাস, মিনিবাস, রিকশা, ভ্যান ইত্যাদি চলাচলের ফলে দ্রুতগামী যানবাহনের গতি হ্রাস পায়। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে যানবাহন ও পথচারী কেউই আইন মানে না। সুযোগ পেলেই ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে। রংসাইড দিয়ে যানবাহন, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা, ফুটপাত দিয়ে যানবাহন চালানো ঢাকার একটি পরিচিত চিত্র। সড়কের মাঝেই যানবাহনের যুদ্ধ লেগে যায় কার আগে কে যাবে এই নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমে যায় বাসচালকরা। তাদের লক্ষ্য যেভাবেই হোক আগে যেতে হবে। শহরে যথেষ্ট ফুটওভার ব্রিজ থাকা সত্ত্বেও পথচারীরা ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে সড়কের মাঝ দিয়ে রাস্তা পারাপার হয়ে যানবাহনের গতি কমিয়ে দেয়।

রাস্তা মেরামত, গ্যাসলাইন এবং ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ির কারণে রাস্তা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়। তার ওপর রয়েছে অপ্রতুল ট্রাফিক পুলিশ এবং কখনও কখনও তাদের দায়িত্বে অবহেলা। এই যখন রাজধানীর সড়কের চিত্র, তখন ঘরেও যে স্বস্তি আছে তা নয়।

সম্প্রতি এক রিপোর্টে দেখা গেছে, গত এক বছরে বিশ্বের প্রধান শহরগুলোর বসবাসযোগ্যতা নিয়ে যে কটি জরিপ হয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগেই ঢাকার অবস্থান ছিল তলানিতে। কয়েক বছর ধরে ঢাকার অবস্থান ক্রমাগত নিচে নেমেছে। সীমাহীন যানজট ছাড়াও কম বসবাসের যোগ্যতা ও বায়ুদূষণে দ্বিতীয়। জনসংখ্যা ও কম নিরাপত্তায় ষষ্ঠ। ৩০ বছরে সবুজ এলাকা ১৭ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নেমেছে।

বায়ুদূষণে বাংলাদেশের অবস্থান সবার ওপরে। বিশ্বের বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ এখন অন্যতম সমস্যা। কয়েক বছর ধরে ঢাকা সবচেয়ে দূষিত বাতাসের পাঁচটি শহরের মধ্যে রয়েছে। আর শহরের তালিকায় দিল্লির পরেই রয়েছে ঢাকার নাম। এর আগের বছরও ঢাকা এই অবস্থানে ছিল।

তবে ঢাকায় আগে বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটাগুলো বিশেষভাবে দায়ী থাকলেও বর্তমানে তা যানবাহনের ধোঁয়ার কারণে বেড়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। অর্থাৎ কংক্রিটের নির্মাণকাজ ও অতিরিক্ত মানুষের চাপ বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখছে বলাই বাহুল্য। এছাড়া অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিবেশ দূষণের অন্যতম অনুষঙ্গ।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশির ভাগ বৈশ্বিক সূচকে ঢাকার অবস্থানের অবনতি হয়েছে কয়েকটি কারণে। প্রথমত, এই শহরের জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু যারা এই শহরে নতুন করে আসছেন, তাদের বেশির ভাগই দরিদ্র। ফলে তারা আর্থিক কারণে শহরে নিজেরা নাগরিক সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন না। আবার নগরের সামগ্রিক পরিবেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারছেন না। এই শহরকে সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় আনার জন্য একের পর এক পরিকল্পনা হয়েছে। কিন্তু তার বেশির ভাগের কোনো বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে শহরের সামগ্রিক পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশের অবনতি ঘটে চলেছে।

ঢাকা শহর নিয়ে করা কয়েকটি গবেষণায় বসবাসের জায়গা হিসেবে ঢাকার এই অবনতি ধরা পড়েছে। এসব গবেষণায় ঢাকায় দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি নগর ব্যবস্থাপনায় নানা সমস্যা ধরা দিয়েছে। একটি সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর নগরের জন্য আয়তন অনুযায়ী জনসংখ্যা সীমিত রাখা, গাছপালা ও জলাভূমি রক্ষা করা আর বায়ু-মাটিদূষণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সবচেয়ে বেশি জরুরি। অথচ এসব ক্ষেত্রে ঢাকার অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছে।

জাতিসংঘের হিসাবে বিশ্বের একটি স্বাস্থ্যকর শহরের প্রতি একর এলাকায় ৭০ থেকে ৮০ জন নাগরিকের বসবাস করা উচিত। এটা সর্বোচ্চ ১২০ জন পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু ঢাকার এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় তা ৭০০ থেকে ৮০০ জন।

আর সামগ্রিকভাবে তা ৩০০ জন। জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শহর জাপানের টোকিওতে মোট ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ বাস করে। কিন্তু সেখানে প্রতি একরে ৯০ জনের কম মানুষ বাস করে। সিঙ্গাপুরের মতো বহুতল ভবনসমৃদ্ধ শহরে তা ৮০ জন, সিডনিতে ৫৮ জন ও নিউইয়র্কে ১১২ জন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৯ সালেও ঢাকা শহরের ১৭ শতাংশ এলাকা ছিল সবুজ গাছপালায় ঘেরা। বিশ্বের স্বাস্থ্যকর ও সুন্দর পরিবেশের শহরগুলোতে এই বৈশিষ্ট্য থাকে। কিন্তু ২০২০ সালে অর্থাৎ মাত্র ৩০ বছরে তা মাত্র ২ শতাংশে নেমে এসেছে। মূলত ২০০৯ সাল থেকে ঢাকার সবুজ ও জলাভূমি এলাকা সবচেয়ে দ্রুত হারে কমেছে। শহরের নতুন আবাসিক এলাকাগুলোতে কিছু কিছু গাছপালা বাড়লেও তা সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় খুবই কম। রাজধানী ছাড়াও নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হওয়ায় ঢাকায় কয়েকগুণ বেশি মানুষের বসবাস, যার চাপ পড়ে সর্বত্র। জনসংখ্যার ব্যাপক চাপ ও শহর ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনা ও সঠিক বাস্তবায়নের অভাবে এই শহরের সামগ্রিক পরিবেশের দ্রুত অবনতি হচ্ছে। এক্ষেত্রে নগর সম্প্রসারণ খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। আর শুধু সম্প্রসারণই যথেষ্ট নয়, তা হতে হবে পরিকল্পিত। বৃক্ষরোপণের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা রেখে নগরায়ণ করতে হবে। বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে এই সমস্যাগুলোর ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। তাই তাদের প্রতি জনগণের প্রত্যাশাও বেশি।

তবে শুধু রাজধানীর নগর সম্প্রসারণ এর সমাধান নয়। বরং দেশের বড় বড় জেলা এবং বিভাগীয় শহরগুলোকে এক-একটা ইকোনমিক জোন হিসেবে গড়ে তুলে; রাজধানীর দিকে কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক যে ধাবমান গণবিস্ফোরণ এবং এর প্রেক্ষিতে যে যানজট ও পরিবেশদূষণ তা অনেকটা প্রশমিত করার উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

গাজী তানজিয়া : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

মতামত লেখকের নিজস্ব

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ