শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৬ অপরাহ্ন

ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্পের জন্য ভিয়েতনাম ফাঁদ

ডেভিড হার্স্ট
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬
  • ২ বার

ধীরগতির এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার মতো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী হামলা ধীরে ধীরে তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে। ইরানের হরমুজ প্রণালির ওপর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে এবং ইসরায়েলকে লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য করে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন, তার পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ধীরে ধীরে সেই দুই অঙ্গীকার থেকেই সরে গেছেন। এখন আবার পূর্ণমাত্রার এবং ক্রমেই আরও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়েছে।

ট্রাম্প এবং তাকে এই যুদ্ধে ঠেলে দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, দুজনই নিজ নিজ দেশে যুদ্ধবিরতি চুক্তির কারণে সমালোচনার মুখে পড়েন। ট্রাম্পের সমালোচনা হয়, কারণ তিনি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। আর নেতানিয়াহুর সমালোচনা হয়, কারণ পুরো প্রক্রিয়া থেকে তাকে কার্যত বাইরে রাখা হয়েছিল। অনেকের ধারণা ছিল, ইসরায়েলের প্রধান মিত্র ও অস্ত্র সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্রই সময়ের আগেই শান্তিচুক্তি চাপিয়ে দিয়েছে।

দুজনের পক্ষেই এমন একটি চুক্তির পক্ষে যুক্তি দেওয়া কঠিন ছিল, যেটিকে অনেকেই বড় ধরনের আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখেছেন। সামনে দুজনেরই নির্বাচন। তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানকে তারা নিজেদের রাজনৈতিক টিকে থাকার প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন। তারা এখন নিজেদের তৈরি করা এক দুষ্টচক্রে আটকে গেছেন। ইরানকে ‘গুঁড়িয়ে দেওয়া’, ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস করা’ কিংবা ‘চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়া’ নিয়ে তাদের বারবার করা দাবি যখন বাস্তবতার সঙ্গে মেলেনি, তখন তাদের সামনে একমাত্র পথ ছিল আবার যুদ্ধ শুরু করা।

পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তিকে ইরান কখনোই স্থায়ী শান্তির উদ্যোগ হিসেবে দেখেনি। তাদের ধারণা ছিল, এটি যুক্তরাষ্ট্রকে পুনরায় অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম জোগাড় করার সময় দেওয়ার একটি সুযোগ মাত্র। ইরান স্পষ্ট করেই বলেছিল, আবার হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের মূল্য দিতে হবে। এরপর তারা সেটিই করেছে। গত দুই সপ্তাহে প্রায় ১০০ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। ইরাক ও জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটিতে একাধিক ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ২০টি ঘাঁটিতে মোতায়েন ৫০ হাজার মার্কিন সেনাকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পেন্টাগন সক্ষম নয়।

চাপ সৃষ্টির নতুন কৌশল: ট্রাম্প যে কৌশল ব্যবহার করে ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের ত্যাগ করতে বাধ্য করতে চেয়েছিলেন, এখন ইরান সেই একই কৌশল ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। জাহাজ চলাচলে হামলা এবং উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর আঘাত, এমনকি মধ্যস্থতাকারী কাতারের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নিয়ে ইরান আলোচনার টেবিলে ট্রাম্পকে দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দিতে চাইছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে বোমা হামলা এবং আলোচনার কৌশল ব্যবহার করেছেন। ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধের পরিসর জর্ডান, সৌদি আরব এবং ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের প্রথম মাসে এই দেশগুলো তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতির মুখে পড়েছিল। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, নতুন করে হামলা হলে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হবে। ইয়েমেনে তাদের মিত্র হুথিরা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বন্ধ করার প্রস্তুতি নিয়ে রয়েছে। একটির পর একটি চাপ সৃষ্টি করে ইরান ট্রাম্পের যুদ্ধের বৈশ্বিক মূল্য বাড়িয়ে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম আবার প্রতি গ্যালন ৪ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে। বর্তমান সংঘাত চলতে থাকলে শিগগির লোহিত সাগরের পথও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

বদলে যাওয়া জনমত: হরমুজ প্রণালি বোমা মেরে খুলে দেওয়া সম্ভব নয়, এমন প্রশ্নে ভ্যান্স বলেছেন, “জো, তুমি যদি এক লাখ ডলার নিয়ে কালোবাজার থেকে কিছু ড্রোন কিনে হরমুজ প্রণালির কোনো দ্বীপে গিয়ে অবস্থান নাও, তাহলে সেখান থেকে জাহাজের দিকে ড্রোন পাঠাতে পারবে। এর অর্থ কী?’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা বলে, ইরানের সঙ্গে আলোচনা করা যায় না, তারা মূল বিষয়টি বুঝতে পারছে না। যতদিন এমন কেউ থাকবে, যে কয়েকটি সস্তা ড্রোন ছুড়ে দিতে পারে, ততদিন অনেক জাহাজের অধিনায়কই বলবেন, ‘না, আমরা এই পথে যেতে চাই না।”

রগান হয়তো ওয়াল্টার ক্রনকাইট নন। কিন্তু আজকের মধ্য আমেরিকার জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক তিনি। ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদরা যদি এমন কোনো মুহূর্ত খুঁজতে চান, যখন মধ্য আমেরিকার জনগণ এই যুদ্ধ এবং ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন হারাতে শুরু করেছিল, তাহলে ভ্যান্সের সঙ্গে রগানের এই সাক্ষাৎকারটি সেই মুহূর্তের অন্যতম শক্তিশালী প্রার্থী হতে পারে।

হারেৎজের তথ্য অনুযায়ী, গাজা ও ইরানে যুদ্ধ নিয়ে নিজেদের ভাবমূর্তি উন্নত করতে এবং আন্তর্জাতিক জনমত প্রভাবিত করতে ইসরায়েল বিদেশে প্রায় ১০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। সেই অর্থের একটি অংশ ভ্যান্সকে দুর্বল করার কাজেও ব্যবহার করা হয়েছে। ট্রাম্পের সাবেক প্রচারাভিযান ব্যবস্থাপক ব্র্যাড পার্সকেলকে ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারের একটি লবিং চুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

বাড়ছে বিরূপ মনোভাব: ইসরায়েলের জন্য এই ১০ কোটি ডলার ব্যয় খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। এর ফল হয়েছে উল্টো। দেশটির প্রতি বিরূপ মনোভাব ক্রমাগত বেড়েছে। পিউ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। ২০২২ সালে এই হার ছিল ৪২ শতাংশ। তরুণ ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এই হার একই সময়ে ৬২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৪ শতাংশে পৌঁছেছে। আর তরুণ রিপাবলিকানদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৭ শতাংশ। শুধু তরুণরাই নন, ডেমোক্রেটিক পার্টির বড় অংশও অবস্থান বদলাচ্ছে। গত সপ্তাহে প্রতিনিধি পরিষদের প্রায় অর্ধেক ডেমোক্র্যাট সদস্য ইসরায়েলের জন্য সহায়তা বন্ধ করার পক্ষে ভোট দেন। পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্যয় বিল থেকে ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার সহায়তা বাদ দেওয়ার প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত ৩১৪ বনাম ১০৪ ভোটে পরাজিত হয়। তবে পলিটিকো এই ভোটাভুটিকে ‘ভূমিকম্পের মতো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন’ বলে বর্ণনা করেছে। এমনকি ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রবীণ নেতা এবং প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসিও ইসরায়েলের সহায়তা কমানোর পক্ষে ভোট দেন।

বিভাজন আপাতত স্থগিত: তবে এ মুহূর্তে পরিস্থিতির গতিপথ স্পষ্ট। সেটি ইসরায়েলের অনুকূলে নয়। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু প্রথম ইরানে হামলা চালানোর পর শুধু জনমতই বদলায়নি। ইরানও বদলে গেছে। এখন পরিষ্কার যে, এই হামলার উদ্দেশ্য যা ছিল, বাস্তবে তার ঠিক উল্টো প্রভাব পড়েছে। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণের যে বিরোধিতা ছিল, হামলার পর তা দুর্বল হওয়ার বদলে অনেকটাই স্তিমিত হয়েছে। এ হামলা ইরানিদের জাতীয় পতাকার নিচে একত্রিত করেছে। এমনকি জানুয়ারিতে রক্তাক্তভাবে দমন করা সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেক মানুষও সেই ঐক্যের অংশ হয়েছেন। সেই বিভাজনগুলো হারিয়ে যায়নি। জাতীয় সংকটের এ সময়ে সেগুলো শুধু আপাতত স্থগিত হয়েছে।

বিশিষ্ট মার্কিন ইরানবিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ এবং সাবেক কূটনীতিক ভ্যালি নাসর আমাকে বলেছেন, ‘পুরো বিষয়টি হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। এটি কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা সমঝোতা স্মারকের কয়েকটি বাক্য নিয়ে বিরোধ নয়। যুক্তরাষ্ট্র এই সমঝোতা স্মারকের সময়টিকে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তারা নিজেদের পুনর্গঠিত করতে চায়। লেবাননে ইরানের প্রভাব দুর্বল করতে চায়। হরমুজ প্রণালির প্রশ্নেও ইরানকে চাপে রাখতে চায়। একই সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে ইরানকে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেটিও পুরোপুরি দিতে চায় না।’

ভিয়েতনাম যুদ্ধে যে যুক্তরাষ্ট্র জিততে পারবে না এটা বুঝতে তাদের সময় লেগে ছিল সাত বছর। এটা বোঝার পরই তারা শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে। আশা করা যায়, ইরান যুদ্ধের ফলাফল উপলব্ধি করতে ট্রাম্পের এতটা সময় লাগবে। এর আগেই ট্রাম্প বুঝতে পারবেন যে, ইরানে তিনি জয়ী হতে পারবেন না।

লেখক: মিডল ইস্ট আইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক। মিডল ইস্ট আইয়ে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ