হাঁটু স্থিতিশীল ও সচল রাখতে এর ভেতর ও বাইরে দুটি করে মোট চারটি লিগামেন্ট এবং দুটি মিনিস্কাস থাকে। একজন খেলোয়াড় মাঠে খেলতে গিয়ে কিংবা যেকোনো সাধারণ মানুষ দুর্ঘটনায় পড়লে হাঁটুতে বাইরের আঘাত থেকে শুরু করে ভেতরের লিগামেন্ট পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই আঘাত মৃদু, মাঝারি কিংবা তীব্র- যেকোনো পর্যায়ের হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সাধারণত বাইরে তীব্র আঘাত লাগলে ভেতরের লিগামেন্টেও জটিলতা তৈরি হয়, এমনকি অনেক সময় লিগামেন্ট পুরোপুরি ছিঁড়েও যেতে পারে। হাঁটুতে আঘাত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে অবশ্যই বরফ দিতে হবে এবং আক্রান্ত পা সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে। এরপর এক্স-রে এবং এমআরআই পরীক্ষার মাধ্যমে আঘাতের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। চিকিৎসকরা সাধারণত ৮০ -৯০ শতাংশ ইনজুরি রোগীর উপসর্গ দেখেই শনাক্ত করতে পারেন এবং বাকি ১০-১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে এমআরআই-এর সাহায্য নেন। লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ার প্রধান লক্ষণগুলো হলো হাঁটতে গেলে হাঁটু বেঁকে বা মচকে যাওয়া, হাঁটুতে পর্যাপ্ত শক্তি না পাওয়া এবং দীর্ঘদিন অবহেলার ফলে আক্রান্ত পায়ের মাংসপেশি শুকিয়ে যাওয়া।
বাইরের লিগামেন্টের আঘাত যদি কম হয়, তবে কয়েক দিনের বিশ্রাম ও নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়ামের মাধ্যমেই তা নিরাময় সম্ভব। কিন্তু ভেতরের লিগামেন্ট যদি পুরোপুরি ছিঁড়ে যায়, তবে তা নিজে থেকে জোড়া লাগার কোনো সুযোগ থাকে না। এ ক্ষেত্রে রোগীকে সুস্থ করতে আর্থ্রোস্কোপিক সার্জারির মাধ্যমে নতুন লিগামেন্ট প্রতিস্থাপন করতে হয়। এই আধুনিক পদ্ধতিতে রোগীর হাঁটু বা গোড়ালির পাশ থেকে লিগামেন্ট নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে নিখুঁতভাবে লাগিয়ে দেওয়া হয়। আর্থ্রোস্কোপিক সার্জারির একটি বড় সুবিধা হলো, এটি অত্যন্ত নিরাপদ এবং এতে রক্তক্ষরণ বা কাটাছেঁড়া হয় একেবারেই সামান্য। হাঁটুতে মাত্র দুই-তিনটি ছোট ছিদ্র করে যন্ত্রের সাহায্যে এই অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়। ফলে রোগী সকালে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে দুপুরে অপারেশন করালে রাতেই সুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফিরে যেতে পারেন। এই পদ্ধতিতে ইনফেকশন বা সংক্রমণের ঝুঁকি মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ। একজন সাধারণ মানুষ অপারেশনের কয়েক সপ্তাহ পরই স্বাভাবিক কাজকর্ম শুরু করতে পারেন, যদিও শুরুর দিকে কিছুদিন ক্রাচে ভর দিয়ে চলতে হয়। তবে খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে মাঠে ফেরার জন্য অপারেশনের পর সঠিক রিহ্যাবিলিটেশন বা পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া বাধ্যতামূলক। রিহ্যাবিলিটেশন ঠিকমতো না হলে হাঁটু জমে বা জ্যাম হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ সময় অভিজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টদের সাহায্যে চিকিৎসকের নির্দেশিত নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত ব্যায়াম করতে হয়। অপারেশনের তিন মাসের মধ্যে খেলোয়াড়েরা স্বাভাবিক চলাফেরা ও হালকা ওয়ার্মআপ শুরু করতে পারেন। প্রতিস্থাপিত নতুন লিগামেন্টটি হাড়ের সঙ্গে পুরোপুরি মিশে মজবুত হতে সাধারণত ছয় থেকে নয় মাস সময় লাগে। এর পরই একজন খেলোয়াড় পুরোদমে স্বাভাবিক খেলাধুলায় অংশ নিতে পারেন। যেকোনো ধরনের ইনজুরি এড়াতে শারীরিক ফিটনেসের পাশাপাশি মানসিক ফিটনেসেরও প্রয়োজন, বিশেষ করে যাদের লিগামেন্ট জন্মগতভাবেই কিছুটা ঢিলেঢালা, তাদের জয়েন্টের ভারসাম্য ও পেশির সমন্বয় কম থাকায় ইনজুরির ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই এ সমস্যা প্রতিরোধে সঠিক কৌশলগুলো জানা অত্যন্ত জরুরি।
লেখক : অধ্যাপক; হাড় ও জোড়া বিশেষজ্ঞ এবং আর্থ্রোস্কোপিক সার্জন
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর), ঢাকা