রাজধানীর যানজট নিরসন এবং সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে মেট্রোরেলের পাশাপাশি মনোরেল চালুর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। প্রস্তাবিত পাঁচটি করিডোরে প্রায় ৭৯.৪ কিলোমিটার দীর্ঘ মনোরেল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে আগামী তিন বছরের মধ্যে নগরবাসীকে সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। এরই মধ্যে প্রকল্পটির প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষার (প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি) প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ডিটিসিএর পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রাথমিকভাবে বিমানবন্দর-জলসিঁড়ি, বিমানবন্দর-সাভার, মোহাম্মদপুর-পাগলা, মধ্য বাড্ডা-তুলতা এবং রামপুরা-ডেমরা—এই পাঁচটি করিডোরে মনোরেল নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। এসব রুটের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৯.৪ কিলোমিটার। ডিটিসিএ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) সঙ্গে প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সমীক্ষার মাধ্যমে সম্ভাব্য রুট, যাত্রী চাহিদা, কারিগরি সক্ষমতা, ব্যয় এবং বিদ্যমান ম্যাস ট্রানজিট নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়গুলো যাচাই করা হবে।
প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডির জন্য সরকার থেকে প্রায় ৮ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এ কাজ বুয়েটের মাধ্যমে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে দেশে মনোরেল বিষয়ে বিশেষজ্ঞের অভাব থাকায় ফ্রান্স ও মালয়েশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সম্ভাব্যতা যাচাই ও কারিগরি পরিকল্পনায় সহায়তা করবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষ হওয়ার পর প্রকল্প কমিটি গঠন, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ, বিস্তারিত নকশা ও ব্যয় নির্ধারণ এবং পরবর্তী সময়ে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক (সচিব) মোহাম্মদ মসিউর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘মনোরেল প্রকল্পটি এখন প্রাথমিক পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ-জাপান যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মে উপস্থাপনের জন্য প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডির প্রস্তাব প্রস্তুত করা হচ্ছে। সমীক্ষার মাধ্যমে সম্ভাব্য রুট, বিদ্যমান মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বয় এবং কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। আমরা আশা করছি, পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে পারলে ২০২৯ সালের মধ্যেই ঢাকাবাসীকে এ সেবার আওতায় নিয়ে আসতে পারব।’
তিনি বলেন, সরকার আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনায় শুধু মেট্রোরেল নয়, ইলেকট্রিক গণপরিবহন ও মনোরেলকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, তিন মাসের মধ্যে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দুটি রুট চূড়ান্ত করার পাশাপাশি প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ, সম্ভাব্য অর্থায়ন পদ্ধতি এবং বাস্তবায়ন মডেল সম্পর্কে সুপারিশ দেওয়া হবে। সরকারি অর্থায়ন, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কিংবা টার্নকি—কোন মডেলে প্রকল্প বাস্তবায়ন সবচেয়ে কার্যকর হবে, সেটিও মূল্যায়ন করা হবে। তিনি যোগ করেন, মনোরেলকে কখনোই মেট্রোরেলের বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং এটি মেট্রোরেলের সঙ্গে সমন্বিত একটি ফিডার সার্ভিস হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে এমআরটি লাইন-৬সহ (উত্তরা টু মতিঝিল) অন্যান্য মেট্রোরেল লাইনের সঙ্গে সংযোগ নিশ্চিত করে একটি বহুমুখী গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলাই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।
সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে—এমন এলাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পুরান ঢাকার প্রসঙ্গে টেনে বলেন, সংকীর্ণ সড়ক ও ঘনবসতির কারণে ওই এলাকায় আধুনিক গণপরিবহন চালু করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক একটি মনোরেল করিডোরকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর মাধ্যমে পুরান ঢাকাকে মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।