বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ১২:৫০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
হাসনাত ও মোশাররফ করিমের পাশে আছি: তাসনিম জারা দুই হত্যা মামলায় দীপু মনির জামিন নামঞ্জুর সংসদে এমপি নুরুল আমীন, ঈদুল আজহা গেল, এখনও মে মাসের বেতন পাননি মাদ্রাসার শিক্ষকরা হত্যার অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, বিক্ষুব্ধ জনতার হামলায় এসপি-ওসি আহত, ডিসির গাড়ি ভাঙচুর রেল যোগাযোগের আওতায় আসছে আরও ১০ জেলা: রেলমন্ত্রী আগামীতে গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হবে : কৃষিমন্ত্রী আওয়ামী লীগ ও গণতন্ত্র কখনো একসঙ্গে যায়নি : মির্জা ফখরুল সংসদ হুটহাট কথা বলার জায়গা নয়, নিয়ম মেনে চলতে হবে : স্পিকার যুদ্ধ শেষে আরও শক্তিশালী ইরান, প্রশ্নের মুখে মার্কিন আধিপত্য: বিবিসির বিশ্লেষণ চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে সবুজ অবকাঠামো নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

রংপুর সিটি করপোরেশনে ‘ডিজিটাল’ ডাকাতি

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬
  • ৪ বার

জাইকার অর্থায়নে কেনা আধুনিক সফটওয়্যারকে ‘ডিজিটাল হাতিয়ার’ বানিয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনে কয়েকশ কোটি টাকা রাজস্ব লুটের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৯ সালে কোনো কারিগরি অনুমোদন ছাড়াই সার্ভারের মূল কোড বদলে মেয়র ও প্রধান নির্বাহীসহ গুরুত্বপূর্ণ ৫টি অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করেন কর আদায় শাখার কম্পিউটার অপারেটর আরিফুল ইসলাম। জাতীয় ছাত্র সমাজের তৎকালীন জেলা কমিটির এ আহ্বায়কের লুটপাটের নেপথ্যে ছিল রসিকের সাবেক মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ও তার দলীয় সিন্ডিকেটের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ছত্রছায়াপ্রাপ্ত এক শক্তিশালী লুটেরা চক্র। এ মহালুটপাটের বিভিন্ন অকাট্য প্রমাণ মিললেও, মেয়রের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে এ অপরাধী সিন্ডিকেট।

কালবেলার অনুসন্ধানে এ চক্রের কর ফাঁকি ও শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অন্তত ১১ ধরনের রোমহর্ষক জালিয়াতি উন্মোচিত হয়েছে। অস্তিত্বহীন ‘ভূতুড়ে’ হোল্ডিং অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা বকেয়া দেখানো, ১০ তলা ভবনকে কাগজে-কলমে দোতলা বানিয়ে লাখ লাখ টাকার কর ফাঁকি, ব্যাংকের সিল জাল করে গ্রাহকের টাকা সরাসরি পকেটে ভরা এবং একই হোল্ডিংয়ে একাধিক ভুয়া আইডি তৈরি ছিল এ চক্রের নিত্যদিনের কাজ। এমনকি পাপের দাগ ঢাকতে প্রতিনিয়ত সার্ভার থেকে অবৈধ কার্যক্রমের ডিজিটাল লগ বা ট্র্যাকিং হিস্টোরি পর্যন্ত মুছে দেওয়া হয়, যা পুরো পৌর প্রশাসনকে এক চরম রাজস্ব বিপর্যয়ের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

কালবেলার দীর্ঘ অনুসন্ধান বলছে, রংপুর সিটি করপোরেশন চালু হওয়ার পর থেকেই রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা ঘটে। বিষয়টি সমাধান করতেই ২০১৫ সালে জাইকার অর্থায়নে চালু করা হয় পর্যাপ্ত নিরাপত্তাসংবলিত ভিন্নধর্মী সফটওয়্যার। নিয়ম অনুযায়ী সফটওয়্যারটি একক কোনো ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা ছিল না। মেয়র, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও রাজস্ব কর্মকর্তাদের পৃথক পাসওয়ার্ড ও অনুমোদন ব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো কর প্রক্রিয়া পরিচালিত হওয়ার নিয়ম ছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা কারিগরি অনুমোদন ছাড়াই সার্ভারের মূল কোড পরিবর্তন করে এ নিরাপত্তা দেয়াল ভেঙে ফেলে চক্রটি। ফলে তৎকালীন মেয়র ও প্রধান নির্বাহীর অ্যাকাউন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ ৫টি আইডির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় কর আদায় শাখার কম্পিউটার অপারেটর এবং জাতীয় ছাত্র সমাজের জেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক আরিফুল ইসলামের হাতে। পরবর্তী সময়ে নথিপত্র জালিয়াতি করে মেয়রের নামে ‘mayor1’ এবং প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার নামে ‘cro2’ এবং taxbill2’ নামে আরও একটি আইডি তৈরি করা হয়। এসব আইডির মধ্যে দুটি আইডির ‘ডেসক্রিপশন’ অংশে আরিফুল ইসলামের নাম উল্লেখ রয়েছে।

ফলে এক ব্যক্তির হাতে তথ্য সংযোজন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষমতা চলে যাওয়ায় কর নির্ধারণ, বকেয়া মওকুফ ও বিল সংশোধনের নামে শুরু হয় একচ্ছত্র লুটপাট। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, নিজেদের অবৈধ কর্মকাণ্ডের ডিজিটাল প্রমাণ আড়াল করতে পরবর্তী সময়ে সার্ভারের ‘কি-লগ’ এবং বিল পরিবর্তনের পুরো ট্র্যাকিং হিস্টোরি মুছে দিয়েছে এ আইটি সিন্ডিকেট।

বিষয়টি আমলে আসে মূলত করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিব হাসানের স্বাক্ষরিত একটা চিঠির সূত্র ধরে। চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ে অসামঞ্জস্যতা ও ত্রুটির বিষয় জানিয়ে একটি চিঠি দেন তিনি। এরপর ২৪ মার্চ অনুরূপ আরেকটি চিঠি দেন মন্ত্রণালয়ে। ওই চিঠির একটি কপি কালবেলার হাতে আসে। চিঠির সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নেমে পাওয়া যায় এমন অবিশ্বাস্য ডিজিটাল ডাকাতির গল্প।

‘ভূতুড়ে’ হোল্ডিংয়ের আড়ালে কোটি কোটি টাকার লুকোচুরি

হোল্ডিং ট্যাক্স আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলায় বেরিয়ে এসেছে এই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে অভিনব ও ভয়ংকর জালিয়াতির ছক ‘ভূতুড়ে হোল্ডিং’। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকৃত করদাতাদের কাছ থেকে নগদ টাকা আদায় করে তা সরাসরি পকেটে পুরত এই চক্র। আর সরকারি তহবিলের বিশাল ঘাটতি গোপন করতে সফটওয়্যারের সার্ভার থেকে কম করের কিছু পুরোনো আসল অ্যাকাউন্ট চিরতরে মুছে দেওয়া হতো। পরে সেই খালি স্থানে নামে-বেনামে নতুন ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে আত্মসাৎ করা সমপরিমাণ অর্থকে ‘বকেয়া কর’ হিসেবে দেখিয়ে খাতা-কলমে হিসাব মেলানো হতো।

এ জালিয়াতির গভীরতা বুঝতে কালবেলার পক্ষ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মোট ৫৯ হাজার ৬৭০টি হোল্ডিংয়ের মধ্যে প্রথম এক হাজার অ্যাকাউন্ট নিখুঁতভাবে যাচাই করা হয়। আর তাতেই মেলে পিলে চমকানো তথ্য। প্রথম এক হাজার অ্যাকাউন্টের মধ্যেই অন্তত ১৭টি সন্দেহজনক ও অলীক অ্যাকাউন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার বিপরীতে মোট বকেয়া দেখানো হয় ১ কোটি ৭১ লাখ ৬৫ লাখ ২৯১ টাকা। তবে নথিপত্র ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে এসব অ্যাকাউন্টের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বাস্তবতা যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, তালিকার ৮২২ নম্বর সিরিয়ালে থাকা ‘২৮-১৪০-০৯৮০-০০’ নম্বর হোল্ডিং অ্যাকাউন্টটি ‘আকরাম’ নামে নিবন্ধিত, যার বিপরীতে বকেয়া দেখানো হয়েছে ৫৬ লাখ ৫৭ হাজার ২৯২ টাকা। একইভাবে ৮৩৬ নম্বর সিরিয়ালে কোনো নাম ছাড়াই শুধু ইংরেজি অক্ষর ‘m’ এবং পিতার নাম ‘r’ লিখে আলমনগর ঠিকানার বিপরীতে বকেয়া ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ৪৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া ৭২৪ নম্বর সিরিয়ালে ‘২৭-১২২-০১৯৯-০১’ নম্বর হোল্ডিংয়ে ‘গ্রামীণ টাওয়ার’ নাম দিয়ে বকেয়া দেখানো হয়েছে ৩৭ লাখ ২০ হাজার ৭৫০ টাকা। সরেজমিন সংশ্লিষ্ট এলাকায় দিনভর অনুসন্ধান চালিয়ে এবং রংপুর সিটি করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগের সংরক্ষিত মূল লেজার বই ও পুরোনো নথিপত্র ঘেঁটেও এই আকরাম, গ্রামীণ টাওয়ার কিংবা ‘m’ নামের কোনো হোল্ডিং বা স্থাপনার অস্তিত্ব মেলেনি।

এক ক্লিকেই গায়েব হতো লাখ লাখ টাকার বকেয়া

রংপুর সিটি করপোরেশনের কর আদায় শাখার সার্ভার থেকে শুধু একটি ক্লিকের মাধ্যমেই উধাও করে দেওয়া হতো লাখ লাখ টাকার বকেয়া বিল। কোনো ধরনের কর পরিশোধ ছাড়াই নথিপত্র ও সফটওয়্যার থেকে বকেয়া মুছে দেওয়ার এমন একাধিক প্রমাণ এসেছে কালবেলার হাতে। রাজস্ব শাখার একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, বকেয়া বিলের তথ্য ‘ডিলিট’ করে দেওয়ার এই ডিজিটাল জাদুটোনার মাধ্যমে হাজার হাজার হোল্ডিংয়ের বিপরীতে কোটি কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে।

এ জালিয়াতির অভিনব প্রমাণ মেলে নগরীর জিএল রায় রোডে। সেখানে ‘এসোড’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থার কার্যালয়ের হোল্ডিং ট্যাক্স বকেয়া ছিল ২০০৭-২০০৮ অর্থবছর থেকে। পরবর্তী সময়ে স্থাপনাটি ‘ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট’ নামের আরেকটি এনজিওর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হলে তাদের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাত্র ৭৮ হাজার ৮১২ টাকার একটি কর বিল দেওয়া হয়। জালিয়াতি লুকাতে বিলে বকেয়ার সময়কাল কমিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছর দেখানো হয় এবং বার্ষিক মূল্যমানও রহস্যজনকভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়। তবে বিপত্তি ঘটে মালিকানা পরিবর্তনের পর হোল্ডিং খারিজ (নামজারি) করতে এসে। জালিয়াতি ধরা পড়ায় পরে সিটি করপোরেশন বাধ্য হয়ে ৬ লাখ ৯৭ হাজার ৬৫০ টাকার প্রকৃত বকেয়াসহ নতুন বিল দিলে এনজিও কর্তৃপক্ষ তা পরিশোধ করে।

একইভাবে তহসিন উদ্দিন রোডের সারওয়ার হোসেন ও গোলাম নাসিরের নামে থাকা একটি হোল্ডিংয়ের (আইডি: ২০-০৪৯-০০১২-০০) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কর বিলে কোনো বকেয়া না দেখিয়ে মাত্র ৬ হাজার ৩৮৬ টাকা পরিশোধে চূড়ান্ত রসিদ দেওয়া হয়। অথচ সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরীণ কর নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ওই হোল্ডিংটিতে প্রকৃতপক্ষে প্রায় ২৮ হাজার ১৭৩ টাকা বকেয়া ছিল। জালিয়াতির বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর বাড়ির মালিক গোলাম নাসির নিজেই জাল বিল তৈরির কথা স্বীকার করে জানান, সহকারী কর আদায়কারী মো. আয়েজউদ্দিনের মাধ্যমে এ রফাদফা ও বিল প্রস্তুত করা হয়েছিল। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে আয়েজউদ্দিনকে পরবর্তী সময়ে সাময়িক বরখাস্ত করে কর্তৃপক্ষ।

বকেয়া গায়েব হওয়ার আরেকটি বড় নজির মিলেছে নগরীর গুড়াতিপাড়া রোডের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলামের দুটি হোল্ডিংয়ের কর নথিতে। সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, তার প্রথম হোল্ডিংয়ের (আইডি: ২০-০৪৫-০২১৯-০০) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কর বিল ৫ হাজার ২৪৯ টাকা পরিশোধ দেখানো হয়েছে এবং কোনো বকেয়া রাখা হয়নি। অথচ ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে সেখানে বকেয়া জমে ছিল প্রায় ১৭ হাজার টাকা। একই ব্যক্তির দ্বিতীয় হোল্ডিংয়ের (আইডি: ২০-০৪৫-০২১৯-০১) ক্ষেত্রেও ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে জমে থাকা প্রায় ৫৫ হাজার টাকার বকেয়া বর্তমান হিসাব থেকে পুরোপুরি গায়েব করা হয়েছে। অর্থাৎ, দুই হোল্ডিংয়ে মোট প্রায় ৭২ হাজার টাকার বকেয়া করের কোনো হদিস নেই সরকারি দপ্তরে। তবে এই বিপুল অঙ্কের বকেয়া কর জাদুমন্ত্রে উধাও হওয়ার বিষয়ে সিরাজুল ইসলাম কালবেলার কাছে নিজের অজ্ঞতা দাবি করে বলেন, ‘আমি প্রতি বছর নিয়মিত ট্যাক্স দিয়েছি। বকেয়া ছিল কি না বা এখন কেন দেখানো হচ্ছে না, তা সিটি করপোরেশনকেই জিজ্ঞেস করেন।’

ব্যাংকে নেই টাকা, সফটওয়্যারে ‘পেইড’

রংপুর সিটি করপোরেশনের কর আদায়ে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ জালিয়াতিটি হয় সরাসরি নগদ অর্থ পকেটে পুরে নেওয়ার মাধ্যমে। হোল্ডিং ট্যাক্সের টাকা ব্যাংক কিংবা নির্দিষ্ট মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধের নিয়ম থাকলেও, সিন্ডিকেটের সদস্যরা গ্রাহকের কাছ থেকে সরাসরি আদায় করত ক্যাশ টাকা। এরপর কোনো ব্যাংক চালান বা বিকাশ ভাউচার ছাড়াই মূল সফটওয়্যার এবং অফলাইনের ডিমান্ড রেজিস্টারে বিল ‘পরিশোধ’ বা পোস্টিং দেখিয়ে দেওয়া হতো। এর ফলে গ্রাহকের করের দায় কাগজে-কলমে চুকে গেলেও, আদায়কৃত অর্থের এক আনাও সিটি করপোরেশনের রাজস্ব খাতে জমা হতো না; পুরো টাকাই চলে যেত লুটেরা চক্রের পকেটে।

এই অবিশ্বাস্য পুকুরচুরির প্রমাণ মিলেছে নগরীর ধাপ আউটপোস্ট রোডের বাসিন্দা আকতারুজ্জামান মোল্লার হোল্ডিং নথিতে (আইডি: ১৬-০০৭-০০৪-০১)। সফটওয়্যারের ডাটাবেজ অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ৮ বার বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে তার কর জমা পড়েছে। কিন্তু কালবেলার চুলচেরা বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই আট অর্থবছরের মধ্যে কেবল সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের টাকা জমার ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা প্রমাণ রয়েছে। বাকি সাত অর্থবছরে বিভিন্ন ব্যাংকের নাম ব্যবহার করে বিল পরিশোধ দেখানো হলেও মূল হিসাবে কোনো টাকা জমার রেকর্ডই নেই। এভাবে ওই একটি হোল্ডিংয়ের বিপরীতে পাওনা ১ লাখ ৩৩ হাজার ১৮৩ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়েই সফটওয়্যারে ‘পরিশোধ’ দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

একই ওয়ার্ডের সিএস রোডের বাসিন্দা কামরুজ্জামান মিলনের হোল্ডিংয়ের ক্ষেত্রেও (আইডি: ১৬-০০৯-০০৮৩-০১) মিলেছে আরেক ভয়াবহ অসংগতি। সফটওয়্যার বলছে, তার ২০১৯-২০, ২০২২-২৩ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের কর বিল সম্পূর্ণ পরিশোধ করা হয়েছে। অথচ বাস্তব নথিপত্র যাচাই করে দেখা যায়, করদাতা ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪৭ হাজার ৭১৫ টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ টাকা আংশিক বিল হিসেবে পরিশোধ করেছিলেন। কিন্তু রহস্যজনকভাবে সফটওয়্যারে এই আংশিক পরিশোধের কোনো তথ্যই ইনপুট দেওয়া হয়নি। এর চেয়েও বড় জালিয়াতি হলো, বিল দুটির টাকা ‘শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক’-এ জমা দেওয়া হয়েছে বলে সফটওয়্যারে উল্লেখ থাকলেও, ব্যাংকের কোনো ভাউচার, রসিদ বা চালানের ন্যূনতম কপি সিটি করপোরেশনের দপ্তরে নেই।

১০ তলা ভবন কাগজে-কলমে দোতলা!

রংপুর সিটি করপোরেশনের এই রাজস্ব লুটপাটের সুবিধা নিয়েছে নামি-দামি এনজিও এবং বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানও। কর্মকর্তা-কর্মচারী সিন্ডিকেটের সঙ্গে আঁতাত করে বিশাল বাণিজ্যিক ভবনের প্রকৃত আয়তন ও তলা গোপন রেখে প্রতি বছর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে লাখ লাখ টাকার ট্যাক্স।

ট্যাক্স ফাঁকির এমন এক ভয়ংকর নজির মিলেছে রংপুর নগরীর মর্ডান মোড় এলাকার দর্শনা রোডের খ্যাতনামা এনজিও ‘ব্যুরো বাংলাদেশ’-এর ১০ তলাবিশিষ্ট ‘সেন্টার ফর হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট’ ভবনে। সিটি করপোরেশনের নথি বলছে, ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর উদ্বোধন হওয়া এ ভবনের প্রতিটি ফ্লোরের আয়তন ৭ হাজার ১৬ দশমিক ৯ বর্গফুট। সেই হিসাবে ১০ তলা ভবনের মোট বার্ষিক মূল্যমান দাঁড়ায় প্রায় ২১ লাখ ৬ হাজার টাকা এবং প্রতি বছর হোল্ডিং ট্যাক্স হওয়ার কথা প্রায় ৪ লাখ ২১ হাজার টাকা। কিন্তু জালিয়াতি চক্রের কল্যাণে পুরো ১০ তলা ভবনটিকে কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে মাত্র দোতলা! ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তাদের নামে দোতলার হিসাব ধরে মাত্র ৭২ হাজার ৪৮০ টাকার বিল ইস্যু করা হয়। পরে সেই বিলও ‘রিভিউ’ নামক জাদুর মাধ্যমে কমিয়ে নির্ধারণ হয় মাত্র ৪৮ হাজার ৯১৭ টাকা। যার মাধ্যমে প্রতি অর্থবছরে রংপুর সিটি করপোরেশনকে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকার নিশ্চিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

যদিও কর ফাঁকির গুরুতর এ অভিযোগ অস্বীকার করে ব্যুরো বাংলাদেশের রংপুর আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মো. মোতাহারুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘ভবন উদ্বোধনের পর তৃতীয় তলা পর্যন্ত ব্যবহার করেছি, বাকি অংশ নির্মাণাধীন ছিল। বর্তমানে ছয় তলা পর্যন্ত ব্যবহার করা হচ্ছে।’ তবে কালবেলার সরেজমিন অনুসন্ধান ও ব্যুরো বাংলাদেশের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ২০২৩ সালের উদ্বোধনী ভিডিওর ড্রোন ফুটেজ বলছে ভিন্ন কথা। ড্রোনের নিখুঁত চিত্রে পুরো ১০ তলা ভবনটিকেই সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় দেখা গেছে। এমনকি ভবনে কর্মরত এক কর্মচারী নিশ্চিত করেছেন, পুরো ভবনটিই ব্যবহার উপযোগী এবং ভেতরে কোনো নির্মাণকাজ বাকি নেই।

একই জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে নগরীর ধাপ রোড এলাকার ‘আলমি বাড়ি’ নামে পরিচিত একটি পাঁচ তলা ভবনের ক্ষেত্রেও। সম্প্রতি ভবনটি কিনেছে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেড। সিটি করপোরেশনের নথিতে ভবনটি এখনো আগের মালিক বাদশা আলমের নামে রেখে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাত্র ২৫ হাজার ২০৮ টাকা কর পরিশোধ এবং কোনো বকেয়া নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বিপত্তি ঘটে ভবনটি ক্রয়ের পর মালিকানা হস্তান্তরের জন্য পপুলার কর্তৃপক্ষ হোল্ডিং খারিজের আবেদন করলে। নথিপত্র পুনঃযাচাই করতেই বেরিয়ে আসে, ৯ লাখ ৫৫ হাজার ৮৮০ টাকা! সেই হিসাবে প্রতি অর্থবছরে হোল্ডিং ট্যাক্স হওয়ার কথা ১ লাখ ৭১ হাজার ১৯৬ টাকা। শুধু তাই নয়, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ভবনটির প্রকৃত বকেয়া করের পরিমাণ বর্তমানে ৮ লাখ ৪৭ হাজার ৭৩৬ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এই বিশাল বকেয়া গোপন রেখে ভুয়া কর পরিশোধ দেখানোর তথ্য ফাঁস হওয়ায় বর্তমানে খারিজ কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। এই জালিয়াতির বিষয়ে জানতে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রংপুর শাখার ব্যবস্থাপক আব্দুল আহাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জালিয়াতি ঢাকতে ‘মহাজালিয়াতি’: একই হোল্ডিংয়ে ৩ রকম বিল!

রংপুর সিটি করপোরেশনের এ সিন্ডিকেটের চুরির হাত এতটাই লম্বা ছিল যে, পুরোনো জালিয়াতি ও কর ফাঁকির তথ্য ধামাচাপা দিতে তারা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে। কোনো একটি হোল্ডিংয়ের অনিয়ম প্রকাশ্যে আসার পর তা আড়াল করতে সফটওয়্যার থেকে একই সময়ে ভিন্ন তথ্যসংবলিত একাধিক ভুয়া বিল তৈরি করার মতো দুর্ধর্ষ ঘটনাও ঘটিয়েছে।

এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে নগরীর প্রাণকেন্দ্র জাহাজ কোম্পানি মোড়ে অবস্থিত ‘এবি বুট হাউস’-এর হোল্ডিং নথিপত্রে। সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ভবনটি টিনশেড থাকায় এর বার্ষিক মূল্যমান ধরা হয়েছিল মাত্র ২ হাজার ৭১০ টাকা। পরে তিন দফা পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে ২০১৫ সালে তা ৫৮ হাজার ৪৪৫ টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ লাখ ৮০ হাজার ৭৮৭ টাকা এবং সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ২১৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু কর আদায় শাখায় সংরক্ষিত মূল দাবি ও আদায় বহি (লেজার বই) খুলতেই চোখ চড়কগাছ হওয়ার দশা। বহিতে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বার্ষিক মূল্যমান ২ হাজার ৭১০ টাকা উল্লেখ থাকলেও ২০২০-২১ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ঘরগুলো রহস্যজনকভাবে সম্পূর্ণ ফাঁকা রাখা হয়েছে! অথচ এ সময়ের মধ্যেই (২০২১-২২ অর্থবছরে) সরকারি পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে বার্ষিক মূল্যমান ২ লাখ ৮০ হাজার ৭৮৭ টাকা নির্ধারিত ছিল। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দাবি ও আদায় বহিতে বার্ষিক মূল্যমান দেখানো হয়েছে মাত্র ১ লাখ ১১ হাজার ৩৬০ টাকা, যেখানে একই অর্থবছরের প্রকৃত পুনর্মূল্যায়ন নথিতে মূল্যমান থাকার কথা ৩ লাখ ৮৯ হাজার ২১৮ টাকা।

এ জালিয়াতি যখন প্রকাশের উপক্রম হয়, তখন তা ঢাকতে সফটওয়্যারকে ব্যবহার করে শুরু হয় ‘মহাজালিয়াতি’। কালবেলার হাতে আসা এবি বুট হাউসের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারের (তিন মাসের) ৩টি বিলের কপি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, একই হোল্ডিংয়ের জন্য একই সময়ে তিনটি বিলে তিন ধরনের বার্ষিক মূল্যমান ব্যবহার করে জগাখিচুড়ি পাকানো হয়েছে।

প্রথম বিলে বার্ষিক মূল্যমান ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা, যেখানে কর নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৮ হাজার ৫০৪ টাকা। আবার দ্বিতীয় বিলে বার্ষিক মূল্যমান মাত্র ৮৪ হাজার টাকা দেখানো হলেও অলৌকিকভাবে সেখানেও করের পরিমাণ একই অর্থাৎ ৩৮ হাজার ৫০৪ টাকাই রাখা হয়েছে! এই দুটি বিলের কোনোটিতেই বকেয়া কর দেখানো হয়নি। অন্যদিকে, চক্রের তৈরি করা তৃতীয় বিলটিতে বার্ষিক মূল্যমান দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৬৪০ টাকা এবং সেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে ৭০ হাজার ৫৬ টাকা বকেয়া ঝুলিয়ে মোট বিল করা হয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার ৬১৯ টাকা।

ব্যাংক ও সিটির সিল জাল: নগদ টাকা পকেটে পুরে ভুয়া রসিদ

রংপুর সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের এ হরিলুটে শুধু ডিজিটাল কারসাজিই নয়, রীতিমতো অ্যানালগ জালিয়াতি ও জাজ্বল্যমান ফৌজদারি অপরাধের আশ্রয় নিয়েছে চক্রটি। করদাতাদের বিশ্বাস অর্জন এবং নিজেদের চুরি আড়াল করতে সিটি করপোরেশন ও ব্যাংকের ভুয়া সিল (Stamp) তৈরি করে সিন্ডিকেট সদস্যরা। গ্রাহকদের কাছ থেকে সরাসরি লাখ লাখ টাকা নগদ (ক্যাশ) নিয়ে বিলের কপিতে সেই জাল সিল মেরে দেওয়া হতো, অথচ সেই অর্থ কোনোদিনই সরকারি ব্যাংক হিসাবে জমা পড়ত না।

সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওয়া বিলের কপি পর্যালোচনা করে এ চাঞ্চল্যকর প্রতারণার প্রমাণ মিলেছে। অনেক ক্ষেত্রে নিরীহ করদাতারা কর পরিশোধের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে সিটি করপোরেশনের ‘গৃহীত’ বা ‘পেইড’ সিলসংবলিত বিলের কপি হাতে পেয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন। কিন্তু ব্যাংকের মূল স্টেটমেন্ট পরীক্ষা করতেই বেরিয়ে এসেছে আসল সত্যি—কোষাগারে জমা হয়নি একটি টাকাও।

নগরীর কেল্লাবন্দ এলাকার বাসিন্দা ফিরোজুল ইসলাম এমন জালিয়াতির শিকার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পূর্ববর্তী বছরের বকেয়াসহ মোট ১৭ হাজার ৮৯ টাকা হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করেছিলেন তিনি। তার বিল ভাউচারে সিটি করপোরেশনের ‘পেইড’ সিল থাকলেও সংশ্লিষ্ট অর্থ সরকারি হিসাবে জমা হওয়ার রেকর্ড মেলেনি। একইভাবে দেওয়ানবাড়ী রোড এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর (হোল্ডিং আইডি: ২০-০৫১-০১২২-০০) ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১২ হাজার ২১৯ টাকা আংশিক কর পরিশোধ করেন, যার সংরক্ষিত বিলেও সিল দিয়েছে এ চক্র।

ডিজিটাল চুরির পাশাপাশি ব্যাংকের সিল জালের মতো ভয়ংকর অপরাধের প্রমাণ মিলেছে পানাতিতারী রোডের গ্রাহক শহিদার রহমানের হোল্ডিংয়ে (আইডি: ২১-০৬২-০০৩৫-০০)। তার ২০২২-২৩ অর্থবছরের বকেয়াসহ ৭ হাজার ১৭৩ টাকার বিলে ব্যাংকের সিল দেওয়া রয়েছে। একই চিত্র কলেজ রোড লালবাগ এলাকার আরেকটি হোল্ডিংয়ের (আইডি: ২৮-১৪৩-০০১৯-০০) ক্ষেত্রেও; যেখানে বকেয়াসহ ১৩ হাজার ২০৯ টাকা কর পরিশোধের কপিতে ব্যাংকের সিলমারা রসিদ দেওয়া হয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরীণ তদন্তে ব্যাংক থেকে সরবরাহ করা অফিসিয়াল হিসাব বিবরণী (স্টেটমেন্ট) যাচাই করা হলে দেখা যায়, এই সিলগুলো সম্পূর্ণ ভুয়া এবং ব্যাংকে এ টাকার কোনো অস্তিত্বই নেই।

সরাসরি নগদ টাকা নিয়ে সিল মারার এ অবৈধ বাণিজ্য প্রসঙ্গে সিটি করপোরেশনের বর্তমান কর আদায় শাখার প্রধান হুমায়ুন কবির সরকার কালবেলার কাছে সিন্ডিকেট চক্রের লুটপাটের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘গ্রাহক হোল্ডিং ট্যাক্স বিল মোবাইল ব্যাংকিং অথবা নির্ধারিত ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করেন। সিটি করপোরেশনের কার্যালয়ে সরাসরি নগদ অর্থ নিয়ে বিল পরিশোধের সিল দেওয়ার কোনো নিয়ম বা সুযোগ নেই।’ অর্থাৎ, নিয়মের তোয়াক্কা না করে এক অভিনব সমান্তরাল কর আদায় ব্যবস্থা চালু করে কোটি কোটি টাকা অনায়াসে গিলে খেয়েছে এই লুটেরা চক্র।

বিধি ভেঙে ইচ্ছেমতো ডিসকাউন্ট: কর মওকুফের নথিতে শুধু হাতের লেখা!

রংপুর সিটি করপোরেশনের কর নির্ধারণ ও আদায়ের সরকারি আইনকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সিন্ডিকেটটি মেতেছিল কর মওকুফের আরেক মহোৎসবে। কোনো আবেদন, বিধিমালা বা প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই প্রভাবশালীদের কোটি কোটি টাকার হোল্ডিং ট্যাক্স আইনবহির্ভূতভাবে মওকুফ বা ‘ডিসকাউন্ট’ করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি জালিয়াতির প্রমাণ লুকাতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নথির ধার না ধেরে, সরাসরি প্রিন্ট করা কর বিলের ওপর হাতে লিখে লাখ লাখ টাকা ছাড় দেওয়ার মতো ধৃষ্টতাও দেখিয়েছে চক্রটি।

সিটি করপোরেশনের বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো স্থাপনার বার্ষিক মূল্যমানের ২০ শতাংশ হারে হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়। কর নির্ধারণের পর মালিকপক্ষের কোনো আপত্তি থাকলে তারা ‘পি-ফরম’ (P-Form)-এর মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়নের আইনগত আবেদন করতে পারেন। আইন অনুযায়ী, এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মেয়র বা প্রশাসক সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কর কমানোর এখতিয়ার রাখেন। পরে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল করলে তিনি আরও সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কর কমাতে পারেন। অর্থাৎ, আইন ও বিধির সব ধাপ পেরিয়ে একজন করদাতা সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কর হ্রাসের সুযোগ পেতে পারেন।

কিন্তু কালবেলার অনুসন্ধানে এমন অসংখ্য হোল্ডিংয়ের তথ্য মিলেছে, যেখানে রিভিউ ও ডিসকাউন্টের নামে পানির দরে কর কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ এই বিপুল ছাড়ের বিপরীতে প্রয়োজনীয় কোনো ‘পি-ফরম’, আপিল আবেদন কিংবা কর কমানোর ন্যূনতম প্রশাসনিক অনুমোদনের কোনো অস্তিত্ব নেই দপ্তরে।

এ আইনবহির্ভূত কর মওকুফের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী রংপুর ডক্টরস কমিউনিটি হাসপাতাল। প্রতিষ্ঠানটির তিনটি হোল্ডিংয়ের নথি পর্যালোচনা করে এই আকাশছোঁয়া অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। ডক্টরস কমিউনিটি হাসপাতালের মূল হোল্ডিংয়ের (আইডি: ১৯-০৩৫-০২৫২-০০) ২০২১-২২ অর্থবছরের কর বিলে আংশিক পরিশোধ হিসেবে ৫ লাখ টাকা জমা দেওয়া হলে, সেখানে কোনো আবেদন ছাড়াই ২০ শতাংশ হারে সরাসরি ১ লাখ টাকা ‘ডিসকাউন্ট’ দেখানো হয়। ফলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৪ লাখ টাকা পরিশোধ করেই খালাস পেয়ে যায়।

একই প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় হোল্ডিংয়ের (আইডি: ১৯-০৩৫-০২৫২-০১) ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট বিল ছিল ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৭৩৬ টাকা। নথিপত্র অনুযায়ী, আংশিক পরিশোধের ক্ষেত্রে তাদের ২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা জমা দেওয়ার কথা থাকলেও, সিন্ডিকেটের কল্যাণে কোনো রসিদ ছাড়াই অতিরিক্ত আরও ৩৭ হাজার ৬০০ টাকা এক নিমেষেই কমিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া ডক্টরস কমিউনিটি হাসপাতালের ‘হেলথ সিটি বিল্ডিং’ নামের তৃতীয় হোল্ডিংয়ের (আইডি: ১৯-০৩৫-০২৫২-০২) ২০২১-২২ অর্থবছরের ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৭৭ টাকার কর বিলে সরাসরি হাতে লিখে ২০ শতাংশ ডিসকাউন্ট বসিয়ে ৩০ হাজার ১৩৫ টাকা হাওয়া করে দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও পেয়েছেন একই খাতির। ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের ধাপ জেল রোড এলাকার বাসিন্দা গুলশান আরার হোল্ডিংয়ের (আইডি: ১৬-০১০-০১০১-০১) ক্ষেত্রে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রথম দফায় রিভিউয়ের মাধ্যমে কর কমিয়ে ৯৮ হাজার ১৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে জালিয়াতির শেষ এখানেই নয়; এই অফিসিয়াল রিভিউয়ের পরও প্রিন্ট করা বিলের কপির ওপর কলম দিয়ে লিখে আরও ১৫ শতাংশ অতিরিক্ত ডিসকাউন্ট বসিয়ে ১৪ হাজার ৭২২ টাকা গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।

কোটি কোটি টাকার এসব রাজকীয় ডিসকাউন্ট ও রিভিউয়ের অফিসিয়াল অনুমোদন-সংক্রান্ত নথি দেখতে চাইলে বর্তমান কর আদায় শাখার প্রধান হুমায়ুন কবির সরকার তা দেখাতে ব্যর্থ হন। উল্টো দায় এড়িয়ে তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট সময়ে এ শাখার দায়িত্বে ছিলেন মোহাম্মদ আলী। যিনি বর্তমানে পদোন্নতি বা বদলি হয়ে স্বাস্থ্য শাখার প্রধান হিসেবে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। বিধিবহির্ভূত মওকুফের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোহাম্মদ আলীর কার্যালয়ে সরাসরি গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি এবং পরে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

একই ভবনে একাধিক ভুয়া আইডি: ১০ তলা আলিশান প্রাসাদের ট্যাক্স মাত্র ৪৭৬ টাকা!

রংপুর সিটি করপোরেশনের রাজস্ব লোপাট ও বকেয়া কর আড়াল করার উদ্দেশ্যে এ সিন্ডিকেট আশ্রয় নেয় আরেক ভয়ংকর জালিয়াতির—একই স্থাপনার বিপরীতে একাধিক ভুয়া হোল্ডিং আইডি খোলার মাধ্যমে। নিয়ম অনুযায়ী, একটি সুনির্দিষ্ট স্থাপনার একটিই হোল্ডিং আইডি থাকার কথা। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কোনো বড় ভবনের মোটা অঙ্কের বকেয়া কর ধামাচাপা দিতে সেই পুরোনো আইডি সচল রেখেই একই নাম ও ঠিকানায় সম্পূর্ণ নতুন আইডি খোলা হতো। এরপর নতুন আইডিতে নামমাত্র চলতি কর দেখিয়ে তা ‘পরিশোধ’ করা হতো, যাতে করে পেছনের লাখ লাখ টাকার বকেয়া কর সরকারি খাতা থেকে চিরতরে আড়ালে চলে যায়।

এই চরম ধূর্ততার প্রমাণ মিলেছে নগরীর কটকীপাড়া এলাকায়। সেখানে ‘নাহিদা আক্তার 6-B’ নামের একটি হোল্ডিংয়ের (আইডি: ১৭-০২০-০২৬৫-৫০) বার্ষিক মূল্যমান সরকারিভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৮ হাজার ৫০০ টাকা। সেই হিসাবে প্রতি বছর কর আসে ৫ হাজার ৭০০ টাকা। নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই হোল্ডিংটির নামে পূর্বের জমাকৃত বকেয়াসহ মোট ১২ হাজার ৪৫ টাকার বিল ইস্যু করা হয়েছিল।

কিন্তু সিন্ডিকেটের কারসাজিতে ঠিক একই নাম ও একই ঠিকানায় ‘১৭-০২০-০২৬৫-০৭’ নম্বরে আরও একটি সমান্তরাল হোল্ডিং আইডি খুলে দেওয়া হয়। নতুন এই আইডিতে ভবনটির বার্ষিক মূল্যমান মাত্র ২ হাজার ৫০০ টাকা ধরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর নির্ধারণ করা হয় অবিশ্বাস্য রকমের কম—মাত্র ৪৭৬ টাকা! সরকারি সফটওয়্যারে দেখা গেছে, সেই ৪৭৬ টাকার বিলটি পরিশোধও দেখানো হয়েছে।

বাস্তবে সেখানে কী আছে জানতে কালবেলার পক্ষ থেকে কটকীপাড়া এলাকায় সরেজমিন চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। নির্দিষ্ট ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট হোল্ডিংটি মূলত ‘প্রশান্তি’ নামে ১০ তলাবিশিষ্ট বিলাসবহুল আবাসিক ভবন! একটি ১০ তলা আলিশান ভবনের আকার, অবস্থান ও রাজকীয় ব্যবহার বিবেচনা করে তার বিপরীতে বছরে মাত্র ৪৭৬ টাকা হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ কত বড় স্তরের জালিয়াতি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এই অবিশ্বাস্য কর ফাঁকির বিষয়ে ভবন মালিক নাহিদা আক্তারের মুখোমুখি হলে তিনি প্রথমে আমতা আমতা করে জানান, হোল্ডিং ট্যাক্সের বিল পরিশোধ করার পরও পরে আবার বিল আসছিল। তখন সিটি করপোরেশন বা ব্যাংকের কারও মাধ্যমে আংশিক বিল পরিশোধের ব্যবস্থা করেন তার প্রবাসী স্বামী।

তবে একই ভবনের নামে দুটি আলাদা হোল্ডিং আইডি খুলে কোটি টাকার ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার প্রশ্ন করতেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। ফাঁকিবাজির কথা অকপটে স্বীকার করে নাহিদা আক্তার বলেন, ‘আমি যে পথটা ধরেছি, সে পথটা অবৈধ—এটা আমি বুঝতে পেরেছি।’ তবে কোনো অসাধু কর্মকর্তার মাধ্যমে এই ‘অবৈধ সুবিধা নেওয়া হয়েছিল, তার নাম প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছিলেন তিনি। তিনি দাবি করেন, ‘না, না- কারও মাধ্যমেই না। আমার স্বামী বাইরে আছেন। তিনি বাসায় এলে আপনার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেব।’

নামজারিতেও হরিলুট: হোল্ডিং খারিজের ফি কর্মকর্তাদের পকেটে

রংপুর সিটি করপোরেশনের রাজস্ব লোপাটের জাল শুধু হোল্ডিং ট্যাক্সেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়েছে হোল্ডিং খারিজ বা নামজারি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপেও। কোনো স্থাপনার মালিকানা পরিবর্তনের পর তা নতুন মালিকের নামে নিবন্ধন বা খারিজ করতে সরকার নির্ধারিত মোটা অঙ্কের ফি আদায়ের বিধান থাকলেও, সেই টাকার কোনো হদিস মেলেনি সিটি করপোরেশনের কোষাগারে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অসংখ্য হোল্ডিং গোপনে খারিজ করে দেওয়া হলেও সেই সংক্রান্ত সরকারি ফির কোনো হিসাব বা ব্যাংক জমার প্রমাণ রাজস্ব বিভাগে নেই।

সিটি করপোরেশনের বিধি অনুযায়ী, উত্তরাধিকার সূত্রে বা হেবা দলিলের মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নামজারি ফি ৩ হাজার টাকা। আর স্থাপনাটি বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে হাতবদল হলে নামজারি ফি হিসেবে ১০ হাজার টাকা জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রভাবশালী ও সুবিধাভোগীদের স্থাপনাগুলো নতুন মালিকের নামে ঠিকই নামজারি হয়েছে, কিন্তু নির্ধারিত ফি’র এক টাকাও জমা পড়েনি সরকারি হিসাবে।

প্রমাণের খোঁজে নগরীর ধাপ জেল রোড এলাকায় অনুসন্ধানে দেখা যায়, একটি দুইতলা ভবনের মালিক আনোয়ারুল উদ্দিন আহমেদ ভবনটি শাহরিয়ার আহমেদের কাছে বিক্রি করেন। নথিপত্রে দেখা গেছে, পরবর্তীতে হোল্ডিংটি খারিজ করে নতুন মালিকের নামে চূড়ান্তভাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে বিক্রয় দলিল অনুযায়ী ১০ হাজার টাকা ফি আদায়ের কোনো তথ্য বা রসিদ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নেই।

একই ধরনের জালিয়াতির চিত্র পাওয়া গেছে আরও এক প্রভাবশালী মালিকের ক্ষেত্রে। নুরুজ্জামান মধু নামের এক ব্যক্তি তার মালিকানাধীন তিনতলা ভবনটি ফিরোজুল আহসান নামের এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেন। এ স্থাপনার ক্ষেত্রেও নিয়ম ভেঙে হোল্ডিং খারিজ সম্পন্ন করা হলেও সরকার নির্ধারিত ফি আদায়ের রেকর্ড বা নথিপত্র গায়েব করা হয়।

১৬ হাজার টাকার ট্যাক্স মাত্র ১০৪ টাকা!

রংপুর সিটি করপোরেশনের কর নির্ধারণী নথিতে জালিয়াতির মাধ্যমে বিল কমানোর এক অবিশ্বাস্য চিত্র ধরা পড়েছে কালবেলার অনুসন্ধানে। নথিপত্র ও মাঠপর্যায়ের তথ্যের মধ্যে নজিরবিহীন গরমিল তৈরি করে প্রভাবশালী ও সুবিধাভোগীদের নামমাত্র ট্যাক্স দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে এ চক্র। ১৬ হাজার টাকারও বেশি বাৎসরিক কর যেখানে হওয়ার কথা, সেখানে মাত্র ১০০ টাকার কিছু বেশি কর নির্ধারণ করে দেওয়ার মতো দুঃসাহস দেখিয়েছে সিন্ডিকেটটি।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের সিএস রোডের বাসিন্দা মোছা. শিরিন বানুর একটি হোল্ডিংয়ের সরকারি মূল্যায়ন নথিতে বার্ষিক মূল্যমান নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮৪ হাজার ১১০ টাকা। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত ২০ শতাংশ করের নিয়ম অনুযায়ী, ওই স্থাপনাটির বাৎসরিক হোল্ডিং ট্যাক্স আসার কথা ১৬ হাজার ৮৩৩ টাকা।

কিন্তু কর আদায় শাখার মূল ‘দাবি ও আদায় বহি’ পর্যালোচনা করতেই বেরিয়ে আসে শুভঙ্করের ফাঁকি। নথিপত্রে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওই বিশাল ভবনের বার্ষিক মূল্যমান ৮৪ হাজার টাকার পরিবর্তে রহস্যজনকভাবে দেখানো হয়েছে মাত্র ৫২০ টাকা! ফলে ১৬ হাজার ৮৩৩ টাকার সেই করের পরিমাণ অবিশ্বাস্যভাবে নেমে এসেছে মাত্র ১০৪ টাকায়। অর্থাৎ মূল্যায়ন নথির প্রকৃত হিসাবকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে খাতা-কলমেই প্রায় শতভাগ কর গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।

পাপের দাগ মুছতে নথি গায়েব: জালিয়াতি ঢাকতে ‘ভাউচার’ চুরি

রংপুর সিটি করপোরেশনের এই মেগা কেলেঙ্কারির তদন্ত ও অনুসন্ধান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে চক্রটি শেষ অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে সরকারি নথিপত্র ধ্বংস ও গায়েব করার পথ। কালবেলার অনুসন্ধান ও রাজস্ব শাখার ভেতরের গোপন তথ্য বলছে, ব্যাংকে বিল জমা দেওয়ার মূল ভাউচার, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, কর রিভিউ ফরম এবং ডিসকাউন্ট সংক্রান্ত নথিপত্র পরিকল্পিতভাবে দপ্তর থেকে সরানো কিংবা পুড়িয়ে নষ্ট করা হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই—ডিজিটাল অপরাধের পর যাতে কোনো কাগজে-কলমে প্রমাণ বা ‘পেপার ট্রেইল’ অবশিষ্ট না থাকে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সিটি করপোরেশনের বিপুলসংখ্যক হোল্ডিংয়ের কর রহস্যজনকভাবে মওকুফ ও ডিসকাউন্ট দেওয়া হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার পক্ষে কোনো অফিসিয়াল নথিপত্র দপ্তরে নেই। ফলে আইনি প্রক্রিয়ায় আদৌ এসব হোল্ডিংয়ের ট্যাক্স কমানো হয়েছিল, নাকি স্রেফ মৌখিক চুক্তিতে টাকা পকেটে পুরে ছাড় দেওয়া হয়েছে- তা যাচাই করার কোনো সুযোগই রাখা হয়নি।

জালিয়াতির প্রমাণ ঢাকতে গিয়ে এই সিন্ডিকেট নথিপত্রে যে জগাখিচুড়ি পাকিয়েছে, তার অবিশ্বাস্য চিত্র মিলেছে ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের ব্যাংক ভাউচার পর্যালোচনায়। রাজস্ব শাখার রেকর্ড অনুযায়ী, কর আদায় শাখা থেকে সরবরাহ করা ২০২২-২৩ অর্থবছরের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের ব্যাংক ভাউচারের ১৭টি পেটি (Box) নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হয়। সেখানে মোট ১ হাজার ২৭৩টি কর পরিশোধের ভাউচার পাওয়া গেলেও বড় ধরনের ঘাপলা ধরা পড়ে মাসের হিসাবে। সরকারি খাতার তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ সালের নভেম্বর এবং ২০২৩ সালের মে মাসে ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের একজন করদাতাও ব্যাংকের মাধ্যমে কোনো হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করেননি! এ ছাড়া ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে মাত্র ৬ জন এবং এপ্রিলে মাত্র ১৩ জন কর পরিশোধ করেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে, যা একটি সিটি করপোরেশনের সাধারণ কর আদায়ের স্বাভাবিক চিত্রের সঙ্গেই কোনোভাবেই মেলে না। মূলত নগদ টাকা পকেটে পুরে ব্যাংকের ভিউয়ার ভাউচারগুলো গায়েব করে দেওয়ায় এই অবাস্তব শূন্যতা তৈরি হয়েছে।

একই ওয়ার্ডের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের নথিপত্র ও ব্যাংক ভাউচার পর্যালোচনায়ও মিলেছে অবিকল একই ধরনের রোমহর্ষক অসংগতি। এই সময়ের ১১টি পেটিতে মাত্র ১ হাজার ৬৮টি ব্যাংক ভাউচার পাওয়া যায়। এসব নথিতে দেখা যায়, ডিসেম্বর মাসে ব্যাংকের মাধ্যমে কোনো করদাতাই হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করেননি! শুধু ফাইল গায়েব করাই নয়, ভাউচার সংরক্ষণের মূল হিসাব খাতায় (Register Book) কলম দিয়ে অসংখ্য কাটাকাটি, ঘষামাজা ও ফ্লুইড দিয়ে সংশোধনের চিহ্নও পাওয়া গেছে। নথিপত্রের এই নজিরবিহীন কাটা-ছেঁড়া ও কাল্পনিক হিসাবই প্রমাণ করে, নিজেদের অবৈধ কোটি কোটি টাকার জালিয়াতি ও চুরির দাগ মুছতে রাজস্ব দপ্তরের ফাইলপত্রকে মূলত আবর্জনায় পরিণত করেছে এই অসাধু সিন্ডিকেট।

তদন্তে জালিয়াতি প্রমাণিত, অ্যাকশনে নীরবতা: রংপুর সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ে এই নজিরবিহীন অনিয়ম ও ব্যাংকের সিল জালিয়াতির ঘটনা গোপন বিষয় ছিল না। খোদ সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরীণ তদন্তেই এই মহালুটপাটের তথ্য-প্রমাণ উঠে এসেছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে জড়িত রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ঢাল ব্যবহার করে অভিযুক্তদের প্রায় সবাই বহালতবিয়তে নিজেদের অপরাধের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রেখেছেন।

নথিপত্র অনুযায়ী, এক করদাতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ৪ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জয়শ্রী রানী রায় এবং সদস্য ছিলেন নগর পরিকল্পনাবিদ মো. নজরুল ইসলাম, সহকারী হিসাবরক্ষক নিশীথ রঞ্জন দাস ও আইটি শাখার সহকারী প্রোগ্রামার মো. বেলাল হোসেন। প্রায় ১০ মাস চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে ওই বছরের ১১ নভেম্বর তৎকালীন মেয়রের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় কমিটি।

তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়—কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন ওয়ার্ডের হোল্ডিং কর কোটি কোটি টাকা কমিয়ে দেওয়া এবং বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা করদাতাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, কর আদায় শাখায় ব্যাংকের ভুয়া সিল ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণও উঠে আসে তদন্তে। প্রতিবেদনে এই সুসংগঠিত দুর্নীতির সঙ্গে কর আদায় ও কর নির্ধারণ শাখার তৎকালীন প্রধান, কর আদায়কারী ও কম্পিউটার অপারেটররা সম্মিলিতভাবে জড়িত বলে অভিযুক্ত করা হয়।

তদন্ত কমিটির সদস্য ও নগর পরিকল্পনাবিদ মো. নজরুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা তদন্তে একজন গ্রাহকের দুটি হোল্ডিংয়ের কর আদায়ের রসিদে ব্যাংকের সিল দেখলেও অফিসিয়াল ব্যাংক স্টেটমেন্ট মিলিয়ে নিশ্চিত হয়েছি যে, ওই টাকা ব্যাংকে জমা পড়েনি। সব নিশ্চিত হয়েই আমরা প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।’

যদিও এই প্রতিবেদন গায়েব করে দেওয়ার এক অদ্ভুত চেষ্টা চালিয়েছেন তৎকালীন সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। তিনি কালবেলার কাছে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করে দাবি করেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলে সেটি ডকেটে রিসিভ হয়ে আমার কাছে উপস্থাপন হওয়ার কথা। এ ধরনের কোনো প্রতিবেদন আমার কাছে আসেনি। যদি আসত তাহলে আমার মন্তব্য বা শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের নোট থাকত। আমার কাছে প্রতিবেদনটি আসেনি মেইবি (হয়তো)।

দুই চুনোপুঁটি বরখাস্ত হলেও অধরা নেপথ্যের নায়করা: দীর্ঘদিন ধরে চলা এই পুকুরচুরির ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চললেও সম্প্রতি জাল বিল প্রস্তুতের অভিযোগে দুই কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গত ২৭ এপ্রিল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডন এই আদেশ জারি করেন। বরখাস্ত হওয়া ব্যক্তিরা হলেন- সহকারী কর আদায়কারী মো. আয়েজউদ্দীন এবং বাজার সহকারী মো. আনোয়ারুল হক। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অভিযুক্তরা গ্রাহকদের ভুয়া বিল বানিয়ে ব্যাংকে জমা দেওয়ার ফাঁদ পেতেছিলেন এবং ভুক্তভোগী বাড়ির মালিকরাও তদন্ত কমিটির কাছে এ দুজনের নাম উল্লেখ করেছেন।

লুটপাটের নেতৃত্বে যারা

২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ের নথিপত্র এবং পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালে করা সর্বশেষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে এ চক্রের এক প্রতিচ্ছায়া বেরিয়ে আসে। তদন্ত বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকারী সহকারী কর নির্ধারক, সহকারী কর আদায়কারী এবং কর নির্ধারণ ও কর আদায় শাখার প্রধানরা এ চক্রের প্রত্যক্ষ অংশীদার।

তবে পুরো সময়ে তলা বদলানো, বকেয়া ডিলিট করা কিংবা ভুয়া আইডি তৈরির মূল কারিগর বা ‘আইটি মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন দুই কম্পিউটার অপারেটর—আরিফুল ইসলাম (জাতীয় ছাত্র সমাজের জেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক) এবং মাসুদ রানা। তদন্তে দেখা গেছে, অবৈধ কার্যক্রম চালাতে সফটওয়্যারে অননুমোদিত ইউজার আইডি (যেমন ‘mayor1’, ‘cro2’) তৈরি করা হয়েছিল এবং বিভিন্ন বাইরের আইপি (IP) ঠিকানা থেকে সার্ভারে লগইন করা হতো। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, জালিয়াতি শেষে সার্ভার থেকে তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ডের ডিজিটাল লগ, ‘কি-লগ’ এবং বিল সংশোধনের পুরো হিস্টোরিই সফটওয়্যার থেকে ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে।

এ চরম ডিজিটাল অপরাধের কোনো টেকনিক্যাল সমাধানও এখন আর সহজ নয়। কারণ, জাইকার তৈরি এ কর ব্যবস্থাপনার মূল সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘কানেক্ট বিডি লিমিটেড’ অনেক আগেই তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি সফটওয়্যারটির প্রধান ডেভেলপার রুশোও মারা গেছেন। ফলে সার্ভারের ব্যাকএন্ডে ঢুকে এ জালিয়াতির পুরো জট খোলার কারিগরি পথও এখন চরম অন্ধকারের মুখে।

এ ছাড়া এই চক্রের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কারিগর হলেন—সাবেক সহকারী কর নির্ধারক এবং বর্তমানে শিক্ষা শাখায় উচ্চমান সহকারী হিসেবে কর্মরত রবিউল ইসলাম, সাবেক সহকারী কর নির্ধারক এবং বর্তমানে সহকারী লাইসেন্স পরিদর্শক রাজন মিয়া, সহকারী কর আদায়কারী শফিকুল ইসলাম, সাবেক কর আদায় শাখার প্রধান এবং বর্তমানে স্বাস্থ্য শাখার প্রধান মোহাম্মদ আলী।

শাস্তি চাইলেন সাবেক মেয়র, কাঠগড়ায় রাজস্ব কর্মকর্তারা

সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চলা এ দীর্ঘমেয়াদি হরিলুটের বিষয়ে জানতে চাইলে তৎকালীন মেয়র ও জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি নিজের দায় এড়াতে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তি দাবি করে কালবেলাকে বলেন, ‘হোল্ডিং ট্যাক্সের বিলে আমার নামে কোনো ইউজার আইডি বা পাসওয়ার্ড আছে—সেটা আমি কখনো শুনিনি, ব্যবহারও করিনি। তদন্তে যদি আমার নিজের কোনো দায়ও পাওয়া যায়, তাহলে আমিও শাস্তি মাথা পেতে নেব।’

সাবেক মেয়র নিজের কোর্ট থেকে বল ঠেলে দিয়ে সে সময় দায়িত্ব পালনকারী সরকারের পদস্থ কর্মকর্তাদের দিকে আঙুল তুলে বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন বিভাগের প্রধান হিসেবে সিনিয়র পদমর্যাদার কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করেন। হোল্ডিং ট্যাক্সের অর্থে এত বড় ধরনের অনিয়ম বা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে থাকলে সে সময় দায়িত্বে থাকা রাজস্ব কর্মকর্তাদের বিষয়টি নজরে না আসার কোনো কারণ দেখি না। দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজস্ব কর্মকর্তারা কেন নিয়মিত এটি যাচাই করেননি, সেটিও তদন্ত হওয়া উচিত। সময়মতো উনারা ধরতে পারলে তখনই দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হতো।’

করপোরেশনের তৎকালীন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জয়শ্রী রানী রায় কালবেলাকে বলেন, ‘আমার কিছু মনে নেই, আপনাকে কিছু বলতে পারছি না এখন। অফিসে গিয়ে খোঁজ নিতে পারেন।’

জানতে চাইলে করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিব হাসান কালবেলাকে বলেন, ‘আমি ডিসেম্বর ২০২৫-এর শেষে রংপুর সিটি করপোরেশনে যোগদান করি। জানুয়ারির প্রথম দিকে অফিস থেকে বিষয়টি আমাকে জানানো হয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে ২০ জানুয়ারি হোল্ডিং ট্যাক্স শাখার কর আদায়ের অব্যবস্থাপনা ও দুবৃত্তায়ন সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জানানো ও অনুসন্ধানের অনুরোধ করা হয়। ফেব্রুয়ারি মাসেই হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের কাজে ব্যবহৃত সফটওয়্যারের সব ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ করা হয়। পরে ২৩ মার্চ বিষয়টি প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা সম্পন্ন টিম দিয়ে তদন্ত করার জন্যে ফের মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সার্বিক বিষয়ে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী এ বিষয়ে কালবেলাকে বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত হই। এরপর মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতনদের বিষয়টি জানাই। এখন তারা এ বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত দেবেন, আমরা সে আলোকে ব্যবস্থা নেব।’

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ