সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০০ অপরাহ্ন

গ্রামবাংলার বায়োস্কোপ কোথায় হারাল

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১১ বার

বায়োস্কোপ শব্দটি শুনলেই বর্তমান প্রজন্মের চোখে ভেসে ওঠে আধুনিক ভিডিও স্ট্রিমিং অ্যাপ, ইউটিউব কিংবা মোবাইলের ছোট স্ক্রিনে ভেসে ওঠা চলমান ছবি। কিন্তু একসময় এই ‘বায়োস্কোপ’ ছিল না কোনো ডিজিটাল প্রযুক্তি, বরং ছিল বাংলার গ্রামীণ জীবনের এক অনন্য, সৃজনশীল এবং হৃদয়ছোঁয়া বিনোদন মাধ্যম। সময়ের পরিবর্তনে সেই বায়োস্কোপ আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে- শুধু স্মৃতির পাতায়, গল্পের বইয়ে আর কিছু গবেষকের লেখায় তার অস্তিত্ব টিকে আছে।

গ্রামবাংলার মেলা, হাট বা উৎসব মানেই একসময় ছিল বায়োস্কোপের প্রাণবন্ত উপস্থিতি। দূর-দূরান্ত থেকে রঙিন কাপড় পরে, হাতে ঝুনঝুনি বাজিয়ে বায়োস্কোপওয়ালা গ্রামে প্রবেশ করত। কখনও সে দাঁড়াত স্কুলের সামনে, কখনও হাটের মোড়ে, আবার কখনও গ্রামের সরু মেঠোপথে। তার চারপাশে ভিড় জমে যেত শিশু-কিশোরদের। তাদের চোখে থাকত বিস্ময়, কৌতূহল আর এক অদ্ভুত উত্তেজনা। ঠিক যেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো সে সবাইকে টেনে নিত এক অদ্ভুত জগতে।

বায়োস্কোপ ছিল মূলত একটি কাঠের তৈরি ছোট বাক্স, যার ভেতরে ছবি বা স্লাইড রাখা থাকত। সেই ছবি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো হতো, আর সঙ্গে চলত বায়োস্কোপওয়ালার ছন্দময় গান ও গল্প বলা। বিদ্যুৎবিহীন গ্রামবাংলায়, যখন সিনেমা হল ছিল কল্পনারও বাইরে, তখন এই বায়োস্কোপই ছিল মানুষের কাছে চলমান ছবির প্রথম অভিজ্ঞতা।

?বায়োস্কোপ শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল এক ধরনের সামাজিক সংযোগের ক্ষেত্র। একসঙ্গে গ্রামের মানুষ জড়ো হয়ে গল্প শুনত, ছবি দেখত, হাসত, কখনও আবেগাপ্লুত হতো। এই অভিজ্ঞতা ছিল সামষ্টিক, যেখানে ব্যক্তিগত ফোন বা একাকী স্ক্রিন দেখার সংস্কৃতি ছিল না। বায়োস্কোপওয়ালার কণ্ঠে থাকত এক বিশেষ ছন্দ ও মায়া ‘তোমার বাড়ির রঙের মেলায় দেখেছিলাম বায়োস্কোপ, বায়োস্কোপের নেশা আমায় ছাড়ে না।’

একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিগত বিপ্লব এই পতনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, ইউটিউব, ফেসবুক এবং অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের কারণে এখন মানুষ ঘরে বসেই হাজারো সিনেমা ও ভিডিও দেখতে পারে। ফলে একসময় যে বিনোদনের জন্য মানুষ রাস্তায় বের হতো, আজ তা আঙুলের ডগাতেই সীমাবদ্ধ।

?শুধু প্রযুক্তি নয়, অর্থনৈতিক কারণও এই শিল্পের পতনের বড় একটি কারণ। আগে যেখানে সামান্য খরচে বায়োস্কোপ প্রদর্শন চালানো যেত, এখন সেই আয় দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা প্রায় অসম্ভব। গবেষণা অনুযায়ী, গত দুই দশকে বাংলাদেশে বায়োস্কোপ প্রদর্শনের হার প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে। বর্তমানে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজনেই সীমাবদ্ধ। একসময় যে বায়োস্কোপওয়ালা গ্রাম ঘুরে বেড়াত, আজ সেই অনেকেই অন্য পেশায় চলে গেছে- কেউ দিনমজুর, কেউ দোকানদার, কেউ আবার শহরে গিয়ে ছোটখাটো কাজ করছে। কারণ ঐতিহ্য ধরে রাখার মতো আর্থিক সহায়তা বা সামাজিক স্বীকৃতি তারা পায় না। বায়োস্কোপ শুধু একটি বিনোদন মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল গ্রামীণ সমাজের এক ধরনের সাংস্কৃতিক আচার। এটি মানুষকে একত্র করত, গল্প বলার ঐতিহ্য গড়ে তুলত এবং কল্পনার জগৎকে প্রসারিত করত। এর বিলুপ্তি মানে শুধু একটি পেশার অবসান নয়, বরং একটি সামাজিক বন্ধনের ক্ষয়। আজকের ডিজিটাল যুগে মানুষ যত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হয়েছে, তত বেশি একাকিত্বও বেড়েছে। আগে যেখানে সবাই একসঙ্গে বসে গল্প করত, আজ সেখানে প্রত্যেকে আলাদা আলাদা স্ক্রিনে বন্দি। এই পরিবর্তন আমাদের সামাজিক সম্পর্ককেও অনেকটা ভেঙে দিয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে যদি লোকশিল্প সংরক্ষণের প্রকল্প নেওয়া হয়, তবে বায়োস্কোপের মতো হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যগুলো নতুন জীবন পেতে পারে। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মকে এর ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন করাও জরুরি।

খাইরুন নাহার ইপশি : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও

সাংবাদিক বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ