বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:২২ অপরাহ্ন

জ্বালানি সংকটে শিক্ষায় হাইব্রিড মডেল

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪ বার

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব ধীরে ধীরে দেশের প্রতিটি খাতে ছড়িয়ে পড়ছে। শিক্ষাও এর বাইরে নয়। এ অবস্থায় শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখতে নতুন পথ খুঁজছে সরকার। সেই প্রেক্ষাপটে সামনে এসেছে অনলাইন ও সশরীর পাঠদানের সমন্বয়ে ‘হাইব্রিড’ বা ‘ব্লেন্ডেড’ শিক্ষা মডেল। মহানগর এলাকার স্কুল-কলেজে (বিশ্ববিদ্যালয় বাদে) এই পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। সংকট সামাল দিতে এটি একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও, কোভিড-১৯ সময়ের অভিজ্ঞতা ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠছেÑ এই মডেল কি শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে, নাকি শিখন ঘাটতি ও বৈষম্য আরও বাড়াবে?

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস রেখে এর মধ্যে তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন সশরীরে পাঠদান করার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। একদিন অনলাইন ক্লাস হলে পরের দিন সশরীর ক্লাসÑ এভাবে জোড়-বিজোড় দিনের ভিত্তিতে সূচি নির্ধারণের ভাবনাও রয়েছে। শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠানেই উপস্থিত থেকে অনলাইন ক্লাস নেবেন, আর ব্যবহারিক (প্র্যাকটিক্যাল) ক্লাসগুলো কেবল সশরীরেই অনুষ্ঠিত হবে। তবে এ প্রস্তাব এখনও চূড়ান্ত হয়নি; প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ ও মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত আসবে।

নীতিনির্ধারকদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট কতদিন স্থায়ী হবে, তা অনিশ্চিত। তাই দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখতে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে হাইব্রিড পদ্ধতির কথা ভাবা হচ্ছে।

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, জরিপে ৫৫ শতাংশ অংশীজন অনলাইন ক্লাসের পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে পুরোপুরি অনলাইন নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের সামাজিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

কোভিড-১৯ অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে সামনে এসেছে। ২০২০ সালের মার্চে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পর প্রায় দেড় বছর অনলাইন ও টেলিভিশনভিত্তিক শিক্ষার ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই পদ্ধতির কার্যকারিতা সীমিত ছিল।

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, অনলাইন ক্লাস সহায়ক হলেও এটি কখনোই শ্রেণিকক্ষের পূর্ণ বিকল্প নয়। কোভিডের সময় এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে।

ডিজিটাল বৈষম্যও বড় একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসে। শহরের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে যুক্ত থাকলেও গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকার অনেক শিক্ষার্থী নেটওয়ার্ক ও ডিভাইস সংকটে পিছিয়ে পড়ে। কোভিডকালীন শিক্ষার্থী সাদিয়া ইসলাম জানান, অনেক সহপাঠী অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারেননি, ফলে তারা পড়াশোনায় পিছিয়ে গেছেন।

অভিভাবকদের মধ্যেও অনলাইন ক্লাস নিয়ে দ্বৈত মনোভাব রয়েছে। রাজধানীর বনশ্রীর ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের অভিভাবক রাশেদা বেগম বলেন, বাসায় বসে ক্লাস করলে নিরাপত্তা থাকে, কিন্তু শেখার মান ঠিক থাকে না। সরাসরি ক্লাসের বিকল্প নেই।

অন্যদিকে, শিক্ষকদের জন্যও এই দ্বৈত ব্যবস্থা পরিচালনা সহজ নয়। শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, একই বিষয় অনলাইন ও অফলাইনে আলাদা করে নিতে হয়, এতে সময় বেশি লাগে এবং শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি সমান রাখা কঠিন।

স্বাস্থ্য ও মানসিক দিক থেকেও উদ্বেগ রয়েছে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে থাকার ফলে শিশুদের শারীরিক সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি ও মানসিক চাপ বাড়তে পারে। মনোবিজ্ঞানী ড. নাসরিন সুলতানা বলেন, ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুদের আচরণ ও ঘুমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেÑ এ বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।

এ ছাড়া কোভিড-১৯’ এর সময়ে স্কুল বন্ধ থাকলেও কোচিং কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে চালু ছিল, কিছু মাদ্রাসায় নিয়মিত পাঠদানও চলত। এতে শিক্ষার্থীদের স্থানান্তরও বাড়ত।

শিক্ষাবিশ্লেষক অধ্যাপক মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, মূল শিক্ষাব্যবস্থায় ঘাটতি তৈরি হলে বিকল্প ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভারসাম্য নষ্ট করে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মুখে পড়ে। অনেক অভিভাবক অনলাইন ক্লাসে সন্তুষ্ট না হয়ে ফি দিতে অনীহা দেখান। একটি বেসরকারি স্কুলের পরিচালক শামীম আহমেদ বলেন, অনলাইন ক্লাসকে অনেকে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা মনে করেন না, এতে প্রতিষ্ঠান চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইব্রিড মডেল সফল করতে হলে গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেট ও ডিভাইস সহায়তা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মানসম্মত ডিজিটাল কনটেন্ট, প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস সশরীরে নিশ্চিত করা, স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে, শিক্ষাবিদদের মত, হাইব্রিড ক্লাস সময়োপযোগী উদ্যোগ হলেও পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ঘাটতি থাকলে এটি নতুন বৈষম্য ও শিখন সংকট তৈরি করতে পারে। তাই এই মডেল চালুর আগে বাস্তবতা যাচাই ও সমতা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ