বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৩ অপরাহ্ন

কেন স্বপ্নের শহর বেইজিং ছেড়ে যাচ্ছেন চীনের তরুণরা?

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
  • ০ বার

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চীনের রাজধানী বেইজিংকে উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। সাম্রাজ্যিক রাজধানী থেকে আধুনিক চীনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র- বেইজিং বরাবরই এমন একটি শহর, যেখানে এসে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখেছেন লাখো মানুষ।

মধ্যযুগে সাম্রাজ্যিক প্রশাসনে যোগ দেওয়ার লক্ষ্যে শিক্ষার্থীরা যেমন বেইজিংয়ে এসে পরীক্ষায় অংশ নিতেন, তেমনি সাম্প্রতিক কয়েক দশকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা তরুণ, উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন প্রদেশের শ্রমিকরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ কাজে লাগাতে রাজধানীতে ভিড় জমিয়েছেন।

কিন্তু সেই চিত্র এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় যে শহরে স্থায়ী ঠিকানা পাওয়াই ছিল সাফল্যের প্রতীক, আজ সেই বেইজিং ছেড়ে অন্য শহরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বহু তরুণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘Escaping Beijing’ (বেইজিং থেকে পালিয়ে যাওয়া) হ্যাশট্যাগের জনপ্রিয়তা এই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।

স্বপ্ন নিয়ে রাজধানীতে, বাস্তবতায় হতাশা
২৯ বছর বয়সী ওয়াং লেইও ছিলেন এমনই একজন স্বপ্নবাজ তরুণ। প্রতিবেশী হেবেই প্রদেশে জন্ম নেওয়া ওয়াং ছোটবেলায় প্রথমবার বেইজিংয়ে এসে বিশাল অট্টালিকা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন।

স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “বেইজিং রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে আমি আর আমার বন্ধু প্রথমবার আকাশচুম্বী ভবন দেখেছিলাম। তখনই তাকে বলেছিলাম, বড় হয়ে আমি একদিন ওই ভবনের চূড়ায় দাঁড়াব।”

২০২০ সালে তিনি রাজধানীতে চলে আসেন এবং চীনের একসময়ের অত্যন্ত লাভজনক রিয়েল এস্টেট খাতে চাকরি শুরু করেন। তার বিশ্বাস ছিল, কঠোর পরিশ্রম করলে একদিন সফল হওয়া সম্ভব হবে।

কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই স্বপ্ন ভেঙে পড়ে। বর্তমানে তিনি মনে করেন, তার ভবিষ্যৎ আর বেইজিংয়ে নয়।

অর্থনৈতিক মন্দা বদলে দিয়েছে চিত্র
চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের পেছনে ছিল ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ অভ্যন্তরীণ জনস্থানান্তর। কোটি কোটি মানুষ গ্রাম ও ছোট শহর ছেড়ে বেইজিং, সাংহাইসহ বড় নগরগুলোতে পাড়ি জমিয়েছিলেন।

১৯৯০ সালে বেইজিংয়ের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর বাসিন্দা হওয়াই ছিল সামাজিক মর্যাদা ও সাফল্যের পরিচয়।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। দীর্ঘদিনের দুই অঙ্কের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রিয়েল এস্টেট খাতের সংকট এবং করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কা।

যেসব পরিবার তাদের অধিকাংশ সঞ্চয় বাড়ি কেনায় বিনিয়োগ করেছিল, তারা বাড়ির দাম কমে যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে কোভিড-১৯ মহামারি মানুষকে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ফলে ভোগব্যয় কমেছে, ব্যবসা সম্প্রসারণ থেমে গেছে এবং কর্মসংস্থানের বাজারও সংকুচিত হয়েছে।

চাকরি ছেড়ে ফ্রিল্যান্সিং, তবুও স্বস্তি নেই
ওয়াং লেই বলেন, রিয়েল এস্টেট খাতের সংকটের কারণে তার ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ তৈরি হয়েছিল।

তার ভাষায়, “রিয়েল এস্টেট বাজার খুবই খারাপ অবস্থায় ছিল। চাপ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।”

বর্তমানে তিনি ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করছেন এবং কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে যৌথভাবে একটি ছোট বার পরিচালনা করছেন। কাজের স্বাধীনতা বাড়লেও আর্থিক সংকট কাটেনি।

তিনি বলেন, “আমার আশপাশের অনেক মানুষ- সহকর্মী ও বন্ধুরাও- একই ধরনের চাপে আছেন। তাদের বেতন জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে যদি সম্পর্ক, বাড়িভাড়া কিংবা মাঝেমধ্যে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার খরচ যোগ হয়, তাহলে অর্থ একেবারেই যথেষ্ট থাকে না।”

‘বেইজিং ছেড়ে যাওয়া’ এখন আর লজ্জার নয়
চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন অনেক তরুণ রাজধানী ছেড়ে অন্য শহরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন। অধিকাংশের অভিযোগ একই- অস্বাভাবিক ব্যয়বহুল বাসস্থান, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং অনিশ্চিত কর্মজীবন।

ওয়াংয়ের মতে, একই পরিমাণ অর্থ অন্য কোনও শহরে ব্যয় করলে তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো জীবনযাপন সম্ভব।

অবশ্য বেইজিং ছেড়ে যাওয়ার সঙ্গে এখনও সামাজিক একটি নেতিবাচক ধারণা জড়িয়ে আছে। অনেকেই এটিকে ব্যর্থতা কিংবা ‘সম্মান হারানো’ হিসেবে দেখেন। তবে ওয়াং মনে করেন, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই মানসিকতা দ্রুত বদলাচ্ছে।

‘৯৯৬’ সংস্কৃতি থেকে ‘ট্যাং পিং’
দীর্ঘদিন ধরে চীনে ‘৯৯৬’ কর্মসংস্কৃতি- অর্থাৎ সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত, সপ্তাহে ছয় দিন কাজ- সফলতার জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হতো। প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের অনেকেই এই সংস্কৃতির প্রশংসা করেছেন।

একই সঙ্গে পুরোনো প্রজন্মের মধ্যে ‘চি কু’, অর্থাৎ কষ্ট সহ্য করে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা ব্যাপকভাবে প্রচলিত।

কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করেছে। এরই ফল হিসেবে ২০২১ সালে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘ট্যাং পিং’ কিংবা ‘লাইং ফ্ল্যাট’ ধারণা।

এই ধারণায় বিশ্বাসীরা অতি প্রতিযোগিতামূলক জীবন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং শুধুমাত্র উচ্চ আয়ের পেছনে ছুটে চলার পরিবর্তে সহজ, ভারসাম্যপূর্ণ ও মানসিকভাবে শান্ত জীবনকে বেশি গুরুত্ব দেন।

বদলাচ্ছে সাফল্যের সংজ্ঞাও
ওয়াং লেই জানান, তার অনেক বন্ধু ইতোমধ্যেই রাজধানী ছেড়ে অন্য শহরে চলে গেছেন।

তিনি বলেন, “আমি বুঝতে পেরেছি, যারা বেইজিং ছেড়ে অন্য শহরে গেছে তারা আমার চেয়ে অনেক বেশি সুখে আছে। তাদের জীবনে চাপ ও উদ্বেগ অনেক কম।”

তবে তিনি মনে করেন না যে রাজধানী ছেড়ে যাওয়া মানেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করা।

তার ভাষায়, “হয়তো কিছু তরুণ কঠোর পরিশ্রম করতে চায় না, কিন্তু অনেকেই এখনও চায়। শুধু আজকের বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে হবে।”

শৈশবে ওয়াং বিশ্বাস করতেন, চীনের সবচেয়ে বড় শহরে প্রতিষ্ঠিত হওয়াই জীবনের সাফল্য। কিন্তু এখন তার কাছে সাফল্যের অর্থ বদলে গেছে।

তিনি বলেন, এখন সাফল্য মানে এমন একটি শহর খুঁজে পাওয়া, যেখানে মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থিতিশীল ও টেকসই জীবন গড়ে তুলতে পারে

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ