বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৩ অপরাহ্ন

চীনে কেন জনপ্রিয় হচ্ছে কাজ না করে শুয়ে থাকার সংস্কৃতি?

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
  • ০ বার

একসময় চীনের তরুণদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল রাজধানী বেইজিংয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। শত শত বছর ধরে দেশটির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই শহরকে সফলতার প্রতীক মনে করা হতো। কিন্তু সেই চিত্র এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া, চাকরির তীব্র প্রতিযোগিতা, আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার ব্যয় এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টার চাপে রাজধানী ছেড়ে ছোট শহরে ফিরে যাচ্ছেন অনেক তরুণ। এরই মধ্যে দেশটিতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে লাইং ফ্ল্যাট বা শুয়ে থাকার সংস্কৃতি।

আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এস্কেপিং বেইজিং নামে পরিচিত একটি প্রবণতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এর মাধ্যমে রাজধানীর চাপযুক্ত জীবন ছেড়ে তুলনামূলক শান্ত পরিবেশে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন অনেক তরুণ।

চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল অভ্যন্তরীণ অভিবাসন। ১৯৯০ সালে বেইজিংয়ের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখে পৌঁছেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট এবং করোনা মহামারির প্রভাব ব্যবসা ও ভোক্তাদের আস্থায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। এর ফলে চাকরির বাজারও সংকুচিত হয়েছে।

২৯ বছর বয়সী রিয়েল এস্টেট খাতের কর্মী ওয়াং লেই বলেন, বড় কিছু করার স্বপ্ন নিয়েই তিনি বেইজিংয়ে এসেছিলেন। কিন্তু এখন বেতন দিয়ে ঘরভাড়া, দৈনন্দিন খরচ এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।

চীনে দীর্ঘদিন ধরে ৯৯৬ কর্মসংস্কৃতি সফলতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এর অর্থ সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত, সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করা। আগের প্রজন্মের অনেকেই মনে করতেন, কঠোর পরিশ্রম এবং কষ্ট সহ্য করেই সাফল্য অর্জন সম্ভব।

তবে বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশ এই সংস্কৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ২০২১ সালে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা তাং পিং বা লাইং ফ্ল্যাট আন্দোলনের মূল দর্শন হলো করপোরেট জীবনের অন্তহীন প্রতিযোগিতা এবং উচ্চ আয়ের পেছনে ছুটে মানসিক চাপ বাড়ানোর পরিবর্তে সহজ, স্বাভাবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন বেছে নেওয়া।

তরুণদের অনেকে এখন মনে করছেন, রাজধানীতে থেকে অবিরাম প্রতিযোগিতার মধ্যে জীবন কাটানোর চেয়ে ছোট শহরে কম আয়েও মানসিক শান্তি নিয়ে বসবাস করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

একসময় বেইজিংয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করাকে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করা হতো। রাজধানী ছেড়ে চলে যাওয়াকে অনেকেই ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে দেখতেন। কিন্তু নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। তাদের মতে, শহর ছাড়ার অর্থ উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করা নয়। বরং করপোরেট জীবনের চাপ থেকে বেরিয়ে টেকসই ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়ে তোলাই এখন তাদের কাছে সাফল্যের নতুন সংজ্ঞা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বেইজিং ছেড়ে ছোট শহরে বসবাস শুরু করা অনেক তরুণ দাবি করছেন, আগের তুলনায় তারা এখন বেশি স্বস্তিতে এবং কম মানসিক চাপে আছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং কর্মসংস্থানের পরিবর্তিত পরিস্থিতি তরুণদের জীবনদর্শনে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে দিয়েছে। আর সেই পরিবর্তনেরই প্রতীক হয়ে উঠেছে লাইং ফ্ল্যাট সংস্কৃতি, যা এখন শুধু একটি সামাজিক প্রবণতা নয়, বরং তরুণদের কাছে বিকল্প জীবনধারার প্রতীক।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ