টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজারে এক রাতেই পৃথক চারটি পাহাড়ধসের ঘটনায় রোহিঙ্গা নারী-শিশুসহ ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৮ জন রোহিঙ্গা এবং একজন স্থানীয় বাসিন্দা। আহত হয়েছেন অন্তত পাঁচজন।
আজ সোমবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ২৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস। বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আরও ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস থাকায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও জেলার পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকেরা যৌথভাবে কাজ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে ৩ নাম্বারের স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেওয়া হয়েছে।
গতকাল রোববার সকাল থেকেই কক্সবাজারে থেমে থেমে মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছিল। সন্ধ্যার পর তা টানা ভারী বর্ষণে রূপ নেয়। গভীর রাতে একের পর এক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও কক্সবাজার শহরে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে উখিয়ার ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। মধ্যরাতে পাহাড়ের ঢাল ধসে আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারের পাঁচ সদস্য মাটিচাপা পড়েন। তাদের চিৎকার শুনে স্থানীয় রোহিঙ্গারা ছুটে এসে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় পাঁচজনকে উদ্ধার করা হলেও উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩) মারা যায়। আহত একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পাহাড়ধসের পর আশপাশের আরও কয়েকটি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এর আগে রাত ১টা ৪৫ মিনিটে উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৭ ব্লকে পাহাড়ি ঢলে মাটিচাপা পড়ে একরাম (৭) নামে এক রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু হয়। ক্যাম্পের মাঝি এনায়েত উল্লাহ জানান, খবর পেয়ে রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকেরা শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করেন।
একই রাতে রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৬ ব্লকে মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের বসতঘরের ওপর পাহাড় ধসে পড়ে। এতে কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস নিহত হন। আহত আরও দুজনকে প্রায় তিন ঘণ্টার উদ্ধার অভিযান শেষে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এদিকে আজ সোমবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে স্থানীয় বাসিন্দা আলী আকবরের বসতঘর বিধ্বস্ত হয়। এতে আলী আকবর, তার স্ত্রী ও ছেলে মাটিচাপা পড়েন। স্থানীয়রা দ্রুত তাদের উদ্ধার করে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের ইনচার্জ ডলার ত্রিপুরা বলেন, ‘রাতের সব ঘটনাই খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে ঘটেছে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একাধিক দল উদ্ধারকাজে নামে। রাতভর অভিযান চালিয়ে মরদেহ উদ্ধার এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।’
১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ক্যাম্প-ইনচার্জ মোহাম্মদ আরাফাতুল আলম বলেন, ‘ভারী বর্ষণে ক্যাম্পের বেশ কয়েকটি পাহাড়ি ঢাল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’
দুর্ঘটনার পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পজুড়ে নেমে এসেছে শোক ও আতঙ্ক। ১৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা হাফেজ আব্দুস সালাম বলেন, ‘প্রতিবছর ক্যাম্পে পাহাড়ধস হয়। তারপরও বাধ্য হয়ে এখানে থাকতে হয়। জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে এসেছিলাম। এখানে মৃত্যু হলেও কিছু করার নেই। সবকিছু আল্লাহর হাতে। নিজের দেশে ফিরে মৃত্যু হলেও অন্তত সেই কষ্টটা থাকত না।’
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘শহরে পাহাড়ধসের ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।’