দেশে প্রচলিত ও শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোতে স্কুল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে গত চার মাসে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৯৬৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা। গত বছরের শেষ চার মাস (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) আমানতের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ১৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা। সে হিসাবে আমানতের পরিমাণ কমেছে ৪৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা। দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক মিলিয়ে ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ৫৯টি ব্যাংকে শিক্ষার্থী অ্যাকাউন্ট চালু রয়েছে।
স্কুল ব্যাংকিং হলো শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ধরনের সঞ্চয়ী হিসাব। সাধারণত প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এ হিসাব খুলতে পারে। বেশিরভাগ ব্যাংকে কম টাকা জমা দিয়েই এ হিসাব চালু করা যায়। শিক্ষার্থীরা এ অ্যাকাউন্ট থেকে একবারে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা পর্যন্ত তুলতে পারবে। আর শিক্ষার্থী হিসাবধারীর ১৮ বছর হওয়ার আগ পর্যন্ত পুরো টাকা তুলতে পারবে না। তিন থেকে সাত দিনের মধ্যে এই ব্যাংক হিসাব খোলা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালানাগাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে ব্যাংকগুলোতে ছেলে শিক্ষার্থীদের স্কুল অ্যাকাউন্ট রয়েছে সব ব্যাংক মিলিয়ে মোট ১ কোটি ১ লাখ ২৪ হাজার ৩৮টি। আর মেয়ে শিক্ষার্থীদের অ্যাকাউন্ট রয়েছে ৯৬ লাখ ৯৪ হাজার ১টি। একই সময়ে ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থী মিলিয়ে শিক্ষার্থী অ্যাকাউন্ট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৯৮ লাখ ১৮ হাজার ৩৯টি।
এর মধ্যে শহরাঞ্চলে অ্যাকাউন্টের হিসাব করলে দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরে শিক্ষার্থী অ্যাকাউন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় তিনগুণ বেশি। এর মধ্যে গত জানুয়ারিতে গ্রামে ৫৮০ কোটি ২২ লাখ টাকা, একই মাসে শহরে ১ হাজার ৩৯৬ কোটি ৫ লাখ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে ৫৭৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা গ্রামে, শহরে ১ হাজার ৩৮৮ কোটি ৫ লাখ টাকা। মার্চ মাসে গ্রামে ৫৮২ কোটি ৪০ লাখ এবং শহরে ১ হাজার ৪২০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এপ্রিলে গ্রামে ৫৯১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং শহরে ১ হাজার ৪৩২ কোটি ৯২ লাখ টাকা শিক্ষার্থীদের স্কুল অ্যাকাউন্টে আমানত জমা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে চায় সরকার। অল্প বয়সে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে অর্থ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ে। তাই সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই সঞ্চয়ে আগ্রহী করতে স্কুল ব্যাংকিং হতে পারে কার্যকর একটি উদ্যোগ। বর্তমানে দেশে প্রায় এক কোটি শিক্ষার্থীর ব্যাংক হিসাব রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থীর ব্যাংক হিসাবে সরকারি-বেসরকারি বৃত্তির টাকা যায়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান কালবেলাকে বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এ উদ্যোগের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সুস্পষ্ট ও ইতিবাচক উদ্দেশ্য রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে তারা বিনিয়োগ ও ব্যাংকে আমানত রাখার বিষয়ে আরও আগ্রহী হবে। একই সঙ্গে এটি তাদের আর্থিক সচেতনতা বাড়াবে এবং বিভিন্ন সামাজিক অবক্ষয় থেকে দূরে থাকতে সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে সমাজে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি একটি উদ্বেগজনক সামাজিক ব্যাধি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এমন বাস্তবতায় দেশের স্কুলশিক্ষার্থীরা ব্যাংক হিসাবগুলোতে আমানত রাখলে সমাজ ও রাষ্ট্র—উভয়ের জন্যই অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা বহন করবে।
আরিফ হোসেন খান আরও বলেন, আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া অর্থ অনেক সময় নেশা, মাদক বা অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হওয়ার ঝুঁকি থাকে; কিন্তু সেই অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যদি এখন শিক্ষার্থীরা তাদের স্কুল ব্যাংকিং হিসাবে জমা রাখে তাহলে সঞ্চয়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। পাশাপাশি দায়িত্বশীল ও আর্থিকভাবে সচেতন একটি নতুন প্রজন্মও গড়ে উঠবে।
স্কুল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ডেবিট কার্ড, এসএমএস সেবা ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের সুবিধাও পাবে। শিক্ষার্থীর অ্যাকাউন্ট খুলতে জন্মনিবন্ধন সনদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র বা প্রত্যয়নপত্র, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের পাসপোর্ট সাইজের ছবি, অভিভাবকের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি এবং নমিনি-সংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে।