প্রশাসনিক সংস্কারের ইঙ্গিত : প্রশাসনকে আরো গতিশীল করার ঘোষণা নতুন সরকারের ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, ফাইল নিষ্পত্তির সময় কমানো এবং কর্মদক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়নের উদ্যোগ প্রশাসনিক সংস্কারের ইঙ্গিত বহন করে। তবে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, শুধু নীতিগত ঘোষণা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এখনো সেই পুরনো কর্মসংস্কৃতি, সিদ্ধান্তহীনতা এবং প্রভাবনির্ভর চর্চার ছাপ রয়ে গেছে। কোথাও কোথাও দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা স্বার্থান্বেষী নেটওয়ার্ক ও অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতার বলয় সংস্কারের গতিকে ধীর করে দেয়। রাজনৈতিক পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রাতিষ্ঠানিক আচরণেও পরিবর্তন আসবে।
একই প্রশাসনিক মানসিকতা ও জবাবদিহিহীন চর্চা বহাল থাকলে নতুন নীতির সুফলও সীমিত হয়ে পড়বে। তাই দক্ষতা, সততা ও কর্মদক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দায়িত্ব বণ্টন এবং অনিয়ম, প্রভাবের অপব্যবহার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণই হবে প্রশাসনিক সংস্কারের প্রকৃত মানদণ্ড।
পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্যের চেষ্টা : প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান শুরু থেকেই অর্থনৈতিক কূটনীতিকে পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন। বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তির জন্য নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি এবং জলবায়ু অর্থায়ন আকর্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের প্রচেষ্টা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তবে কূটনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড হবে সমঝোতা স্মারক নয়, বরং বাস্তব বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রপ্তানি আয়ে তার দৃশ্যমান প্রতিফলন।
প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নে সরকারের কিছু ইতিবাচক দিক স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। সক্রিয় নেতৃত্বের ইঙ্গিত, অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা, কৃষি ও জলবায়ু অভিযোজনকে অগ্রাধিকার, প্রশাসনিক ডিজিটাইজেশনের উদ্যোগ এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিকে জোরদার করার চেষ্টা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে একই সঙ্গে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়ে গেছে। ঘোষিত সংস্কারের অনেকগুলোর বাস্তব প্রভাব এখনো দৃশ্যমান নয়, মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগ হিসেবেই রয়েছে। কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক সংস্কারের বাস্তবায়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মাঠ পর্যায়ের কার্যকারিতার মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, সেটি কমানোই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথম ১০০ দিনের সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে দৃশ্যমান ফলাফলের ওপর।
প্রথম ১০০ দিনে সরকার নীতিগত সক্রিয়তার একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ এবং ব্যবসায়ী ও উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করেছে। একই সঙ্গে কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তি, জলবায়ুসহনশীল উৎপাদনব্যবস্থা এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনে সেবার গতি বাড়াতে ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও কর্মদক্ষতাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার আলোচনা নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে রপ্তানি, বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সামনে আসল পরীক্ষা : প্রথম ১০০ দিন কোনো সরকারের সাফল্যের মানদণ্ড নয়, বরং এটি সরকারের অগ্রাধিকার, নীতিগত দর্শন এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার একটি প্রাথমিক সূচক। এই সময়ে সরকার অর্থনীতি, কৃষি, প্রশাসনিক সংস্কার এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিতে সক্রিয়তার বার্তা দিয়েছে, যা জনমনে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। তবে নীতিগত ঘোষণা ও বাস্তব পরিবর্তনের মধ্যে যে ব্যবধান, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো প্রত্যাশিত। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, সফল সরকার সেই, যারা নীতিকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে এবং প্রতিশ্রুতিকে পরিমাপযোগ্য ফলাফলে রূপ দিতে পারে। তারেক রহমানের সরকারের ক্ষেত্রেও প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন সংস্কারের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, কৃষকের আয়, কর্মসংস্থানের সুযোগ, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং জনসেবার মানে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস উদ্যোগ বা ঘোষণাকে নয়, বরং মানুষের জীবনে আনা বাস্তব পরিবর্তনকেই স্মরণে রাখে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি