কাতারের রাজধানী দোহায় দীর্ঘ দুই দিনব্যাপী আলোচনায় কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি বা স্থায়ী শান্তির আভাস ছাড়াই বৈঠক শেষ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এটিকে ‘উচ্চ-পর্যায়ের’ বৈঠক হিসেবে দাবি করা হলেও প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দুই পক্ষ মূলত গত দুই সপ্তাহ আগে ঘোষিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির শর্তগুলো নিয়েই নতুন করে দরকষাকষি করেছে, যা আগেই সমাধান হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। খবর রয়টার্সের। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির আসন্ন দাফন প্রক্রিয়া (আগামী ৯ জুলাই) সম্পন্ন হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফকে পাঠানো হলেও তারা সরাসরি মূল সেশনগুলোতে অংশ নেননি। ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির উপপরিকল্পনামন্ত্রী কাজেম ঘারিভাবাদি। ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দাবি করেছেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সীমিতকরণের বিষয়ে আলোচনা বেশ ভালো গতিতে এগিয়ে চলেছে। ইরানের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া ভালোভাবেই এগোচ্ছে, দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়। উল্লেখ্য, ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তার মূল কারণ হিসেবে এই পরমাণু কর্মসূচিকেই সামনে আনা হয়েছিল। তবে হোয়াইট হাউসের এই দাবির সঙ্গে বাস্তবতার অমিল রয়েছে বলে জানিয়েছেন আলোচনা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। সূত্র মতে, দুই দিনের এই দোহা বৈঠকে পরমাণু ইস্যুটি একেবারেই উত্থাপিত হয়নি; বরং আলোচনা ছিল সম্পূর্ণ কারিগরি বিষয়ের ওপর সীমাবদ্ধ। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও পরবর্তীতে ট্রাম্পের বক্তব্য কিছুটা সংশোধন করে সাংবাদিকদের বলেন, অবশ্যই আমরা পরমাণু ইস্যু নিয়ে উদ্বিগ্ন, তবে এই বিষয়ে আমরা পরবর্তী ধাপে আলোচনা শুরু করব। সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং আমেরিকার হাতে আটকে থাকা ইরানের বিলিয়ন ডলারের তহবিল মুক্ত করা। জুনের যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী, বিশ্ব খনিজ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ নিয়ন্ত্রণকারী এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে এই কৌশলগত জলপথের নিরাপত্তা এখনও অনিশ্চিত।
ইরানের ঊর্ধ্বতন সূত্রগুলো জানিয়েছে, তেহরান যেকোনো মূল্যে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের একক নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি নিতে মরিয়া। অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির ‘টোল-মুক্ত’ সময়সীমা শেষ হওয়ার পর আগামী আগস্টের মাঝামাঝি থেকে এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী প্রতিটি জাহাজ থেকে টোল বা শুল্ক আদায়ের ঘোষণা দিয়ে রেখেছে ইরান। তেল বাজার বিশ্লেষক সংস্থা ‘ভান্দা ইনসাইটে; প্রতিষ্ঠাতা বন্দনা হরি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত হচ্ছে ঠিকই, তবে তা অত্যন্ত ধীরগতির, অনাকাঙ্ক্ষিত ও স্বচ্ছতাহীন। এদিকে সর্বাত্মক যুদ্ধের সম্ভাবনা নাকচ করে দেওয়া ট্রাম্পের ইতিবাচক মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম গত চার মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম বাজার বিশ্লেষকেরা তেলের দামের পূর্বাভাস কমিয়ে এনেছেন। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালিকে মাইনমুক্ত করতে বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ সহায়তার প্রস্তাব দিলেও জার্মানির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরানের অনীহার কারণে জার্মানি এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে না।