২০২৪ এর জুলাই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক অনন্য মাস। পহেলা জুলাই থেকে কোটা সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা ৫ আগস্টের গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল আসলে একটি উপলক্ষ মাত্র। এই দাবির সাথে যুক্ত হয়েছিল সাধারণ মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়। তাই কোটা আন্দোলন ধাপে ধাপে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রূপ নেয়। এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার আপামর জনগণ। এই আন্দোলন কেবল কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণের সরকারি চাকরিতে বৈষম্য মুক্তির দাবিতে আন্দোলন ছিল না, এই আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের মানুষের অধিকার ও বৈষম্য মুক্তির।
এই আন্দোলন সফল হয়েছিল যখন মা-বোনেরা ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমেছিলেন। এই আন্দোলন পূর্ণতা পেয়েছিল যখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এমনকি স্কুলের শিশু কিশোর এবং তরুণরা বুক চিতিয়ে গুলির সামনে দাঁড়িয়েছিল। এই গণ অভ্যুত্থান সফল হয়েছিল যখন আপামর জনতা রাজপথে এসে প্রতিবাদে মুখর হয়েছিল। এই বিজয় তখনই অর্জিত হয়েছিল যখন যখন বাংলাদেশের দেশ প্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সাধারণ জনগণের আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছিল।
জুলাই থেকে কোটা আন্দোলন শুরু হলেও এই আন্দোলনের বীজ রোপিত হয়েছিল বহু আগে। যখন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করা হয়েছিল তখনই এই আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন তৎকালীন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ২০১৪ এর বিনা ভোটের নির্বাচন, ২০১৮ এর রাতের ভোট এবং ২০২৪ সালের আমি ডামি নির্বাচন এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। বেগম জিয়াকে গ্রেফতার, লাখো রাজনৈতিক নেতাকর্মী গ্রেফতার ও নির্যাতন এই আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছে। অবশেষে হয়েছে গণ বিস্ফোরণ।
কিন্তু জুলাই আন্দোলনের পরপরই দেখা গেল বিশেষ গোষ্ঠী এই আন্দোলনের বিজয়কে নিজেদের পকেটে ভর্তি করে ফেললেন। শুধুমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুষ্টিমেয় কিছু শিক্ষার্থী জুলাইয়ের সর্বস্তরের মানুষের আন্দোলনকে নিজস্ব সম্পত্তি বানিয়ে ফেলার চেষ্টা করলেন। আর এই অনাকাঙ্ক্ষিত উদ্যোগের মূল ষড়যন্ত্রকারী ড. ইউনূস। বাংলাদেশের জনগণের ১৫ বছরের আন্দোলন সংগ্রাম, ত্যাগ এবং আত্মাহুতি আমলে না নিয়েই ড. ইউনূস পুরো আন্দোলনের ফসল একটি বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিলেন। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট প্যরিস থেকে দেশে ফিরে তিনি ছাত্রদের নিয়োগ কর্তা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। এর মাধ্যমে জনগণের বিজয় ছিনতাই করা হলো। ইউনূস কতিপয় ছাত্রনেতাদের নিয়েই মেতে থাকতেন, তাদের সামনে রেখে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করতেন। কেউ ইউনূসের সমালোচনা করলে ছাত্রদের লেলিয়ে দিতেন। এভাবেই জুলাই আন্দোলন পরিচিত মুখ কয়েকজনকে নিয়ে তিনি একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এখানেই পথ হারায় জুলাইয়ের বিজয়। ড. ইউনূসের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে জুলাই আন্দোলনের স্বপ্ন গুলো বিবর্ণ হতে থাকে। জুলাই আন্দোলনের অকুতোভয় রাজপথের সৈনিকদের দূরে ঠেলে দেয়া হয়। আস্তে আস্তে জুলাইয়ের আকাঙ্খার মৃত্যু হয়।
ইউনূস জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া তিনজনকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন। লক্ষ্যনীয়, তিনজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। প্রথমত, ছাত্রদের উপদেষ্টা করার সিদ্ধান্তটাই ছিল মারাত্মক ভুল। শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে দেশকে গণতান্ত্রিক পথে ফিরিয়ে আনার পথ উন্মুক্ত করেছে, কিন্তু তাই বলে তাদের উপদেষ্টা করতে হবে কেন? ইউনূস যদি দায়িত্বশীল অভিভাবক হতেন তাহলে তিনি শিক্ষার্থীদের বলতেন, তোমরা আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। এখন তোমরা শিক্ষাঙ্গনে ফিরে যাও, তোমাদের শিক্ষাজীবন শেষ কর। দেশ গঠনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করো। কিন্তু ইউনূস দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকার জন্য শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করলেন। শিক্ষা জীবন অসমাপ্ত রেখেই তাদের মন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা বানিয়ে দিলেন। জুলাইয়ের সর্বনাশের শুরু হলো এভাবেই। আরও দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হলো যে, শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনজন উপদেষ্টা নিয়োগ করে ইউনূস জুলাই আন্দোলনের তাৎপর্য নষ্ট করলেন। আন্দোলনেবেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান, ঢাকার বাইরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদানকে রীতিমতো অস্বীকার করা হলো। লাখো তরুণের ত্যাগকে অস্বীকার করা হলো। জুলাই আন্দোলনের বিজয় একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কাছে বিক্রি হয়ে গেল। এই শিক্ষার্থীরা ক্ষমতার মজা পেল বটে দায়িত্ব বুঝলো না। অচিরেই তা বিপথগামী হয়ে গেলো। ক্ষমতায় গিয়ে তারা শুধু এটাই বুঝতে পারলো যে, টাকা বানানো অনেক সহজ। ব্যস শুরু হলো জুলাই নিয়ে ব্যবসা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীরা যে যার মতো টাকার নেশায় উন্মত্ত হয়ে উঠলো। তারা সচিবালয়ে গিয়ে বদলি বাণিজ্য শুরু করলো। লেখাপড়ার বদলে টেন্ডার বাণিজ্যে মনোনিবেশ করলেন অনেকে। কেউ আবার শুরু করলেন চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্য। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পুলিশ, সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাংবাদিক-সবাইকে হত্যা মামলায় আসামি করার ভয় দেখিয়ে শুরু হলো চাঁদাবাজির মহোৎসব। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের কেউ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে গিয়ে মব করলো মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের জন্য। দেশে শুরু হলো এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার এবং জামায়াত শিক্ষার্থীদের এই সব অগ্রহণযোগ্য কর্মকাণ্ডে প্রশ্রয় দিয়েছিল তাদের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য। ইউনূসের এজেন্ডা ছিল নিজের আখের গোছানো। তিনি নিজের কর মওকুফ করালেন, মামলা প্রত্যাহার করলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, রিক্রুটিং এজেন্সি, ডিজিটাল ওয়ালেটের লাইসেন্স নিলেন। রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় করে নিজের জনসংযোগের জন্য বিদেশ সফরের উৎসব করলেন। জাতির বিবেক ছাত্রসমাজ তখন শর্ট কাটে বড়লোক হবার নেশায় বুঁদ। গোটা বিষয়টি অনেকটাই সিনেমার গল্পের মতো। প্রহরীদের নেশায় ডুবিয়ে যেমন ডাকাতি করা হয়, তেমনি শিক্ষার্থীদের লুটপাটের দরজা খুলে দিয়ে ইউনূস এবং তার উপদেষ্টারা শুরু করলেন দেশ লুট। দেশ গঠনের বদলে কতিপয় মানুষের দুর্নীতির প্রতিযোগিতা শুরু হলো। পথ হারালো একটা সম্ভাবনাময় প্রজন্ম। ইউনূস শুধু দেশের ক্ষতি করেননি, একটা জেনারেশন ধ্বংস করেছেন।
শিক্ষার্থীদের বিপথে পরিচালিত করতে এবং ক্ষমতায় চিরস্থায়ী করতে ইউনূস গুটিকয়েক শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে এনসিপি গঠন করান। এটি ছিল আসলে কিংস পার্টি। এই কিংস পার্টি এবং জামায়াত মিলে ড. ইউনূসকে সামনে রেখে চলে জুলাই চেতনা ধ্বংসের চূড়ান্ত আয়োজন। ইউনূসের এই দেশবিনাশী অপকর্মের যারাই প্রতিবাদ করতো তাদেরই হয় মবের ভয় দেখানো হতো অথবা জেলে পাঠিয়ে দেয়া হতো। জামায়াত তাদের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এই নৈরাজ্যের উৎসবের অংশীদার হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করা। নেপথ্যে থেকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা। এ কারণেই শিক্ষার্থীদের সামনে রেখে, তাদের এসব কর্মকাণ্ডকে সমর্থন দিয়ে জামায়াত সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সব ধরনের স্থাপনা ভাঙচুর শুরু করে। প্রশাসন সহ সরকারের সব প্রতিষ্ঠানে নিজেদের লোকদের ঢোকায়। এভাবেই অন্তর্বর্তী সরকারকে সামনে রেখে জামায়াত আসলে দেশ দখলের চেষ্টা করেছিল। এ কারণেই জামায়াত এবং এনসিপি নির্বাচনের বিরোধিতা করেছিল। এই রাজনৈতিক কূটকৌশলের কারণে জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য পথ হারায়।
ইউনূসের দেড় বছরে জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত নিহতের সংখ্যা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়নি। অনেক জীবিত মানুষকে জুলাই শহীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে গোটা বিষয়টিকে খেলো করে ফেলা হয়। জুলাইয়ে আহতদের চিকিৎসা নিয়েও চলে তেলেসমাতি কারবার। অন্য কারণে অসুস্থদের জুলাই আহত হিসেবে দেখিয়ে তাদের ভাতা দেয়ার খবরও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এসব দুর্নীতি আর অনিয়মের কারণে জনগণের মধ্যে জুলাইয়ের আবেগ কমতে থাকে। আর জুলাই যোদ্ধা নামে কতিপয় ইউনূস ঘনিষ্ঠ যেন হঠাৎ করেই আলাদিনের চেরাগ পেয়ে যান। তাদের রাতারাতি বিত্তবান হয়ে ওঠা সকলের কাছে দৃষ্টিকটু হয়ে ওঠে। যারা কদিন আগেও টিউশনি করে চলতো তারা হঠাৎ করেই ধনকুবের হয়ে যায়। মেসে থাকা তরুণ গুলশান, বারিধারায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিক হন। পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ানো শিক্ষার্থী প্রাডো গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়ান। হঠাৎ এই বিত্তের উৎকট রূপ দেখে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ এবং বিরক্ত হয়। ’২৪ এর পাঁচ আগস্টের পর একটা নব্য গোষ্ঠীর জন্ম হয়, যাদের একমাত্র উপার্জনের পথ হলো জুলাই চেতনা বিক্রি করা। জুলাই চেতনার ব্যবসা করে নতুন একটি লুটেরা শ্রেণি তৈরি হয়েছে দেশে। যারা নব্য ফ্যাসিবাদী হিসেবই পরিচিতি পেয়েছে।
জুলাইয়ে যে নারীরা তাদের অধিকারের জন্য রাস্তায় নেমেছিলেন তারা তাদের অধিকার পাননি বরং নারীদের উপর নিপীড়ন বেড়েছে। যে শিক্ষক শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশের জন্য রাস্তায় নেমেছিলেন তিনি এখন মবের ভয়ে আতঙ্কিত। যে ব্যবসায়ী চাঁদাবাজ মুক্ত, ব্যবসা বান্ধব পরিবেশের আশায় বুক বেঁধেছিলেন তার প্রতিষ্ঠান এখন বন্ধ হবার উপক্রম। যে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ চেয়েছিল তাদের শিক্ষাজীবন আজ অনিশ্চিত। যারা বৈষম্য মুক্তির স্বপ্ন দেখছিলেন তারা আজ নতুন বৈষম্যে আক্রান্ত। যে সাংবাদিকরা মন খুলে স্বাধীন মত প্রকাশের আশা করেছিলেন তিনি এখন চাকরি হারা, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এভাবেই জুলাই আন্দোলনের দুই বছরের মাথায় আজ দেশ জুড়ে স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা, প্রতারিত হওয়ার গল্প। আশাহত মানুষের দীর্ঘশ্বাস কান পাতলেই শোনা যায়। কিন্তু এদেশের মানুষ হারতে জানে না। তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে কখনও ভুল করে না। তাই তারা ইউনুসের ষড়যন্ত্র সফল হতে দেয়নি। তারা নিজেদের পছন্দের দলকে বাছাই করার জন্য একটি নির্বাচন আদায় করেছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। এখন জুলাই চেতনার ব্যবসায় ভাটার টান। সরকার চারমাসের মধ্যে দেশকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আনার চেষ্টা করছে। আর তাই জুলাই নিয়ে যারা বানিজ্য করছে তাদের অনেক অভিমান। তারা সুযোগ পেলেই সরকারকে নানারকম হুমকি দিচ্ছে। আশা কথা সরকার এখনও এসব ধমক এবং হুমকিতে ভয় পায়নি। বর্তমান সরকার কে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে আস্হার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। বৈষম্য মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। এটাই জুলাই চেতনা। জুলাই বিক্রি করে যারা দেশের নতুন মালিক বনে গেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। জুলাই আন্দোলন কতিপয় শিক্ষার্থীর ভাগ্যের বদলের জন্য হয়নি,আপামর মানুষের সুন্দর জীবনের প্রত্যাশায় হয়েছে।