খালি হাত ও বেলচা দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে চলছে উদ্ধার অভিযান। উপরে ড্রোন উড়ছে। প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জীবিতদের খুঁজে বের করার প্রাণান্তকর চেষ্টা চলছে ভেনিজুয়েলায়। আজ রোববার ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব দৃশ্য উঠে এসেছে।
দেশটির রাজধানী কারাকাসের কাছাকাছি উপকূলীয় রাজ্য লা গুয়াইরায় চারদিকে শুধু বিধ্বস্ত দৃশ্য। গত বুধবার পরপর আঘাত হানা ম্যাগনিটিউড ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে এই অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পটি দেশের গত শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প।
ধ্বংসস্তূপে আটকে আছেন হাজারো মানুষ
পরিবারের সদস্যরা ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রিয়জনদের খুঁজছেন। কংক্রিট ও লোহার তারের আবর্জনার নিচ থেকে কোনো শব্দ আসে কি না, সেদিকে কান পেতে আছেন তারা।
এখন পর্যন্ত সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১,৪৩০ জন। শত শত ভবন ধসে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও হাজারো মানুষ আটকে রয়েছেন। জাতিসংঘের অনুমান, নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৫০,০০০ জন। মৃত ও আহতের সংখ্যা প্রতি ঘণ্টায় বাড়ছে।
জাতীয় উদ্ধারকারী দলের সংখ্যা অপ্রতুল। তবে মেক্সিকো, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল এসে পৌঁছেছে। এখনও সাহায্য যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, জীবিত উদ্ধারের জন্য প্রথম ৪৮-৭২ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে খাবার-পানি পেলে এই সময় আরও বাড়তে পারে।
জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট জর্জে রদ্রিগেজ বলেন, ‘প্রতিটি জীবিত উদ্ধার একটি অলৌকিক ঘটনা। আমরা এই বিপর্যয়ের সত্যিকারের মাত্রা কিছুই লুকাব না।’
‘যন্ত্রপাতি ছাড়া উদ্ধার অসম্ভব’
ক্যাটিয়া লা মার শহরে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। অধিকাংশ ভবন ধসে পড়েছে। সরকারি বাহিনী খাবার ও পানি বিতরণ করছে। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলেছেন, জীবিত উদ্ধারের এই ‘গুরুত্বপূর্ণ সময়ে’ ব্যাপক অভিযান চলছে।
জেসুস সুয়ারেজ ২০০ কিলোমিটার দূর থেকে ছেলে জিন সুয়ারেজকে খুঁজতে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো তথ্য নেই। আমি বিশ্বাস করি সে ধ্বংসস্তূপের নিচে আছে। কিন্তু উন্নত যন্ত্রপাতি ছাড়া তাকে বের করা অসম্ভব। একা মানুষের পক্ষে এটা খুব বিপজ্জনক।’
অন্যদিকে, কার্লোস এদুয়ার্দো (৩১) নামে এক যুবকের আত্মীয়রা জানেন তিনি কোথায় আটকে আছেন। মাঝে মাঝে তার কাতরানি শোনা যাচ্ছে। তার চাচাতো ভাই বলেন, ‘আমরা ডাকছি, সে শব্দ করছে। কিন্তু এখন আর কোনো সাড়া নেই। আমরা সাহায্যের অপেক্ষায় আছি।’
সাহায্যের আকুতি
স্থানীয়রা জানান, ট্রাফিক ও ভিড় উদ্ধার কাজে বাধা সৃষ্টি করছে। সৈন্য ও বিদেশি ভলান্টিয়াররা নীরবতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন যাতে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে শব্দ শোনা যায়।
যাদের ড্রোন আছে তারা তা ব্যবহার করে কঠিন জায়গায় অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। পরিবারের সদস্যরা ড্রোনের ফুটেজ দেখে চেনা কোনো জিনিস কাপড়, চুল বা অন্য কিছু খুঁজছেন।
গ্লেন্ডিস ডেলগাডো বলেন, ‘মৃতদেহের গন্ধ ছড়াচ্ছে। এটা আমাদের ও শিশুদের অসুস্থ করে ফেলবে। সরকারি সাহায্য এখনও পৌঁছায়নি। কারাকাস থেকে মানুষ খাবার নিয়ে এসেছে, তাদের ধন্যবাদ।’
ডেইয়ের গ্যাব্রিল (২৭) জানান, মাকুটো, ক্যারিবে সহ সব এলাকাই ক্ষতিগ্রস্ত। চারদিকে মৃত্যুর গন্ধ।
গত শুক্রবার পর্যন্ত ৮৬১ জন বিদেশি ভলান্টিয়ার ভেনিজুয়েলায় পৌঁছেছেন। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে কথা বলে উদ্ধার দল ও সাহায্য সামগ্রী পাঠানোর প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন।
এক নারী তার ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলেন, ‘আমরা মানবিক সাহায্য চাই। আমাদের সাহায্য করতে আসুন। আমরা এত কষ্ট করে যা অর্জন করেছিলাম, সব চোখের পলকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।’