বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৬ পূর্বাহ্ন

অর্থনীতির মঞ্চে ‘চ্যাম্পিয়ন’ ফিফা

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬
  • ০ বার

বিশ্বকাপ শেষ, শুরু হয়েছে ফিফা তহবিলের হিসাব। ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসব মাঠের রোমাঞ্চেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, অর্থনীতির মঞ্চেও রচনা করেছে নতুন ইতিহাস। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা মিলিয়ে আয়োজিত ৪৮ দলের মহাযজ্ঞ থেকে ফিফার চার বছরের বাণিজ্যিক চক্রে (২০২৩-২৬) মোট আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকার সমান!

ফিফার আর্থিক হিসাবটা করা হয় চার বছরের চক্র ধরে। সেই চক্রের হিসাব করলে সংস্থাটির আয় সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হুহু করে বাড়ছে। ২০২৩ থেকে ২০২৬ চক্রের মধ্যে শুধু বিশ্বকাপ থেকেই এসেছে সিংহভাগ অর্থ। ফোর্বসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিফার নিজস্ব বার্ষিক প্রতিবেদনের হিসাবে এ আসর থেকে আয় প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার (১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা) ছাড়িয়ে যাবে, যার মধ্যে সম্প্রচার স্বত্ব থেকেই এসেছে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। আতিথেয়তার প্যাকেজ ও টিকিট বিক্রি থেকে এসেছে ৩ বিলিয়নের বেশি। ব্রাজিলের ক্রীড়া অর্থনীতি বিশ্লেষণ সংস্থা স্পোর্টস ভ্যালু অবশ্য আরও এগিয়ে বলছে, চূড়ান্ত হিসাবে এই আসরের আয় ছুঁতে পারে ১০.৯ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত, যা ২০২২ সালের কাতার

বিশ্বকাপের তুলনায় ৫৬ শতাংশ বেশি। সংখ্যাগুলো শুনতে যতটা শুষ্ক লাগে, ইতিহাসের পাতায় তার নাটকীয়তা কিন্তু আরও তীব্র। মাত্র চার বছর আগে কাতারের মরুভূমিতে যে বিশ্বকাপ রেকর্ড গড়েছিল ৭.৬ বিলিয়ন ডলার আয় করে (টাকায় যা প্রায় ৯৩ হাজার ৪৮০ কোটি), সেই রেকর্ড এবার ধুলোয় মিশে গেছে। ২০১৯-২২ চক্রে ফিফার মোট আয় ছিল ৬.৫ বিলিয়ন ডলার, সেখান থেকে এবারের প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো এক লাফে দ্বিগুণেরও বেশি! ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ২০১৬ সালে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সংস্থার আয় চারগুণ করবেন। ফোর্বসের ভাষ্য বলছে, চূড়ান্ত হিসাব মিললে সেই প্রতিশ্রুতি কিন্তু তিনি পূরণ করতে চলেছেন।

জাঁকজমকের আড়ালে ব্যয়ের হিসাবও কম নাটকীয় নয়। ফিফা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্যের বরাতে ইন্দোনেশিয়ার তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কাতাদাতা জানাচ্ছে, ২০২৬ বিশ্বকাপের সামগ্রিক ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৩.৯ বিলিয়ন ডলার, বাংলা টাকায় যা প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ৯৭০ কোটি টাকার সমান। ফিফার নিজস্ব ব্যয়ের ভাগ ৩.৭৬ বিলিয়ন ডলার (৪৬ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা), যার সবচেয়ে বড় অংশ গেছে পরিচালন ব্যয়ে। ফোর্বস জানাচ্ছে, শুধু পরিচালন খাতেই ফিফার খরচ ১.১ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ইভেন্ট পরিবহনে ১৫৯ মিলিয়ন এবং রেফারি সেবায় ২৩ মিলিয়ন ডলার। আর পুরস্কারের ভান্ডার এবার স্ফীত হয়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭১ মিলিয়ন ডলারে, প্রায় ১০ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা। কাতারে এই অঙ্ক ছিল মাত্র ৪৪০ মিলিয়ন ডলার। যে দলগুলো নকআউট পর্বে উঠেছে, তারা প্রত্যেকে পাচ্ছে অন্তত ১১ মিলিয়ন ডলার, গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়া দলগুলোও খালি হাতে ফেরেনি, প্রত্যেকের ভাগ্যে জুটেছে ১০ মিলিয়ন ডলার করে।

ফিফার কোষাগার ভরলেও, স্বাগতিক শহরগুলোর হিসাবের খাতা ততটা মসৃণ নয়। কানাডার সংসদীয় বাজেট কার্যালয়ের হিসাবে, শুধু ম্যাচ আয়োজনের জন্যই দেশটির সরকারি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১.০৬৬ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার, প্রতি ম্যাচে গড়ে প্রায় ৮২ মিলিয়ন কানাডীয় ডলার। অন্যদিকে

নিউইয়র্ক-নিউজার্সি আয়োজক কমিটি ও পর্যটন পরামর্শক সংস্থা ট্যুরিজম ইকোনমিক্সের যৌথ সমীক্ষা বলছে, শুধু এই অঞ্চলেই আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রভাব দাঁড়াতে পারে ৩.৩ বিলিয়ন ডলার, প্রায় ৪০ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা। কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে ২৬ হাজারের বেশি মানুষের জন্য। প্রোপাবলিকা ও হিউস্টন ক্রনিকলের অনুসন্ধানে অবশ্য উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র, বহু স্বাগতিক শহরের খরচের বোঝা শেষমেশ চাপানো হয়েছে স্থানীয় করদাতাদের ঘাড়েই।

প্রশ্ন থেকে যায়, ফুটবলের এই বিশ্বযজ্ঞ আসলে কার জন্য মুনাফার উৎসব, আর কার জন্য বাজেটের বোঝা? জুরিখের সদর দপ্তরে বসে ফিফা যখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হিসাবের খাতা মেলাচ্ছে, তখন হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে স্বাগতিক শহরগুলোর নীরব হিসাব-নিকাশেই।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ