জুলাই থেকে অক্টোবর (আষাঢ় থেকে কার্তিক মাস) ইলিশের ভরা মৌসুম। এবারের বর্ষা মৌসুমে রাজধানীর বাজারগুলোতেও মাছের আমদানি বেড়েছে। চাঁদপুর, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকায় ইলিশ আসছে। তবে, সরবরাহ বাড়লেও দাম ক্রেতাদের নাগালে আসছে না। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর টাউন হল ও সাদেক খান বাজার ঘুরে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
এদিকে রাজধানীতে ইলিশ পাওয়া গেলেও চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলার বিভিন্ন মাছের আড়তে তেমন একটা দেখা মিলছে না। বিগত বছরের তুলনায় মাছের আমদানি কম। তবে আবাহওয়া স্বাভাবিক হলে মাছের আমদানি বাড়বে বলে প্রত্যাশ্যা স্থানীয় আড়তদারদের।
কারওয়ান বাজারের পাইকারি ইলিশ বিক্রেতারা জানান, ইলিশের বড় অংশ চাঁদপুর ও বরিশাল থেকে রাতের মধ্যে ঢাকায় পৌঁছায়। সকালের মধ্যে
পাইকারি বিক্রি শেষ হয়ে যায়। দুপুরের পর থেকে খুচরা বাজারে মেলে।
বাজার ঘুরে আকারভেদে ইলিশের দামের যে চিত্র দেখা গেছে তাতে, এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ সবচেয়ে দামি। প্রতি কেজি ২ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ২৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেড় কেজির বেশি হলে দাম আরও বেশি, তবে এই সাইজের ইলিশ বাজারে খুবই কম। ৭০০ গ্রাম থেকে ৮০০ গ্রামের ওজনের ইলিশ এই সাইজের ইলিশের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। কেজিপ্রতি ১ হাজার ৩০০ থেকে ১৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মধ্যবিত্ত ক্রেতারা এই সাইজই বেশি কেনেন। ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বাজারে এই ছোট সাইজের ইলিশ কেজিপ্রতি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। বাজারে ক্রেতাদের ভিড়
থাকলেও কিনছেন কম মানুষ। দাম দেখেই অনেকে ফিরে যাচ্ছেন।
পাইকারি বাজারে ইলিশের দাম খুচরার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। কারওয়ান বাজার পাইকারি মাছের আড়তে এক কেজি সাইজের ইলিশ পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। সেটাই খুচরায় বাজারভেদে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায়।
বৈরী আবহাওয়ায় চাঁদপুরে ইলিশের আকাল
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলেরা নদীতে মাছ ধরতে যেতে না পারায় চাঁদপুরে ইলিশের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সরবরাহ কম থাকায় এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৩ হাজার ২০০ টাকা দরে। তবে, আবহাওয়া অনুকূলে এলে জেলেরা নদীতে নামতে পারলে ইলিশের সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি দামও কিছুটা কমতে পারে বলে আশা ব্যবসায়ীদের। গতকাল মঙ্গলবার রাতে চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র এবং সদর উপজেলার হরিণা ফেরিঘাটসংলগ্ন মাছঘাটে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী শবে বরাত সরকার বলেন, মঙ্গলবার সারাদিন বড় স্টেশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে প্রায় ২০ মণ ইলিশের আমদানি হয়েছে। গত এক সপ্তাহে এর চেয়েও কম মাছ এসেছে।
ইলিশশূন্য বরিশালের মৎস্য আড়ত
বরিশালের আড়তেও পর্যাপ্ত ইলিশের দেখা মিলছে না। প্রতিবছর জুন-জুলাইয়ের এই সময় ইলিশে সয়লাব থাকত পোর্ট রোড মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। ক্রেতা-বিক্রেতায় মুখর থাকত প্রতিটি আড়ত। কিন্তু এক মাসের বেশি সময় ধরে বরিশালের সবকটি আড়ত মিলিয়েও ২০ থেকে ২৫ মণ ইলিশ আসছে না।
বরিশাল নগরীর পোর্টরোড পাইকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মালিক-সমিতির সাবেক অর্থ সম্পাদক ইয়ার হোসেন শিকদার জানান, আমাদের মোট ১৭০টি আড়তে ভরা মৌসুমে আগে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ১ হাজার মণ ইলিশ আসত। সেখানে এখন ২০-২৫ মণ পর্যন্ত মাছ আসছে। বেচাবিক্রি আগে কোটি কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত। এখন হচ্ছে মাত্র ১৫-২৫ লাখ টাকার।
নগরীর পোর্টরোড পাইকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে দেখা যায়, এক কেজি সাইজের ইলিশ প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৬৫০ থেকে ৩ হাজার টাকা, ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের (এলসি) ইলিশ প্রতি কেজি ২ হাজার ৫০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা, ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ভোলার নদীতে দেখা নেই ইলিশের
ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে এখন ইলিশের ভরা মৌসুম চললেও জেলেদের জালে মিলছে না কাক্সিক্ষত রূপালি ইলিশ। দিন-রাত নদী চষে বেড়িয়েও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে জেলেদের। মাছের দেখা না পাওয়ায় ট্রলারের জ্বালানি খরচ ও মাঝিমাল্লাদের খোরাকি তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন আড়তদার ও ট্রলার মালিকরা। ফলে রূপালি ইলিশের জন্য বিখ্যাত ভোলার ঐতিহ্যবাহী মৎস্য ঘাটগুলোতে বিরাজ করছে নীরবতা ও চরম হতাশা। ?সাধারণত বাংলা আষাঢ়-শ্রাবণ মাস থেকেই ভোলার নদী ও সাগরে পুরোদমে ইলিশের মৌসুম শুরু হয়। এ সময় নদীগুলোতে জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ার কথা থাকলেও এবার চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। ভোলার সদর উপজেলার তুলাতলি, ধনিয়ার নাছির মাঝি, রাজাপুর এবং দৌলতখান ও তজুমুদ্দিনের বিভিন্ন ঘাট ঘুরে দেখা গেছে, সারি সারি মাছ ধরার ট্রলার নোঙর করা। ঘাটে জেলেদের সেই চেনা ব্যস্ততা ও হাঁকডাক নেই। ?
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন বলেন, আগামীতে বৃষ্টিপাত বাড়লে এবং সাগরে লঘুচাপ তৈরি হলে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ নদীতে প্রবেশ করবে। আশা করছি দ্রুতই জেলেদের এই হতাশা কেটে যাবে এবং ঘাটগুলো আবার আগের মতো প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।
বলেশ্বরের ইলিশ এখন বিলাসিতা
দেশের সর্বদক্ষিণের উপজেলা শরণখোলা। নদী, সাগর ও বনবেষ্টিত এই জনপদ একসময় বলেশ্বর নদীর সুস্বাদু ইলিশের জন্য সুপরিচিত ছিল। এখন সেখানে জেলেদের জালে কাক্সিক্ষত ইলিশ মিলছে না। রায়েন্দা বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকার জেলে মনির হোসেন বলেন, সরকার নদী ও সাগরে ৫৮ এবং ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দেয়, যাতে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এতকিছুর পরেও নদীতে ইলিশ বাড়ছে না। নদীতে জাল ফেলে মাছ না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়। দু-একটি ছোট ইলিশ মিললেও বড় ইলিশ প্রায় পাওয়াই যায় না।
রায়েন্দা মাছ বাজারের ব্যবসায়ী বেল্লাল হোসেন জানান, বর্তমানে সাগরে ও বলেশ্বর নদীতে ইলিশ খুবই কম। জেলেরা দু-একটি বড় ইলিশ পেলেও তা বিক্রি করেন তিন থেকে চার হাজার টাকায়, যা সাধারণ মানুষ কিনে খেতে পারে না।
প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেনÑ আল আমিন, ঢাকা/ আল মামুন, বরিশাল / এম এ লতিফ, চাঁদপুর,/ ইয়ামিন হোসেন, ভোলা/ মিজানুর রাকিব, শরণখোলা (বাগেরহাট)