শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ০২:৩৭ পূর্বাহ্ন

সাম্য ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে আজ রথযাত্রা

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার

আজ বৃহস্পতিবার আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথি। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা। এ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হবে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, পূজা-অর্চনা, নামসংকীর্তন ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান। ভক্তদের বিশ্বাস, এদিন ভগবান জগন্নাথ, তার ভ্রাতা বলরাম ও ভগিনী সুভদ্রা মন্দির ছেড়ে রথে চড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে আসেন। তাই রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি ভক্তি, সমতা, সম্প্রীতি ও মানবিক মিলনেরও প্রতীক।

রথযাত্রার ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। সবচেয়ে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ভারতের ওড়িশার পুরীর জগন্নাথ মন্দিরকে কেন্দ্র করে এ উৎসবের সূচনা। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন ভগবান জগন্নাথের মূর্তি নির্মাণের দায়িত্ব দেন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মাকে। শর্ত ছিল, ২১ দিন বন্ধ কক্ষে কেউ প্রবেশ করতে পারবেন না। কিন্তু ১৪ দিনের মাথায় কোনো শব্দ না পেয়ে রানি গুণ্ডিচার অনুরোধে রাজা দরজা খুলে দেন। তখন দেখা যায়, জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তির হাত-পা অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং বিশ্বকর্মা অন্তর্ধান করেছেন। পরে স্বপ্নে জগন্নাথদেব রাজাকে জানান, তিনি এ অসম্পূর্ণ রূপেই পূজা গ্রহণ করবেন।

আরেকটি কাহিনিতে বলা হয়, মথুরায় যাওয়ার পর বৃন্দাবনের ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের বিরহে কাতর হয়ে পড়েন। তাদের আকুলতা দেখে শ্রীকৃষ্ণ বলরাম ও সুভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে রথে চড়ে বৃন্দাবনে যান। সেই পুনর্মিলনের স্মৃতিও রথযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

পুরীর রথযাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো গুণ্ডিচা মন্দিরে যাত্রা। ভক্তদের বিশ্বাস, এটি জগন্নাথদেবের ‘মাসির বাড়ি’। প্রতি বছর তিনি মূল মন্দির থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের গুণ্ডিচা মন্দিরে যান এবং সাত দিন অবস্থান করেন। এরপর উল্টো রথযাত্রার মাধ্যমে মূল মন্দিরে ফিরে আসেন।

রথযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্বাসও। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে, ভক্তিভরে রথের দড়ি টানলে পুণ্য লাভ হয় এবং জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তির পথ সুগম হয়। একই সঙ্গে এ উৎসব সমাজে সাম্য ও সম্প্রীতির বার্তা বহন করে। ‘জগন্নাথ’ শব্দের অর্থ জগতের নাথ বা প্রভু। তার কাছে ধনী-দরিদ্র, জাতি-বর্ণ কিংবা উচ্চ-নিচের কোনো বিভেদ নেই। তাই রথের দড়ি টানতে সবাই সমানভাবে অংশ নিতে পারেন। এ উৎসব মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক সহমর্মিতা জাগিয়ে তোলে।

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) বাংলাদেশ অন্যান্য বছরের মতো এবারও ৯ দিনব্যাপী রথযাত্রা মহোৎসবের আয়োজন করেছে। আজ সকাল ৮টায় রাজধানীর স্বামীবাগ ইসকন মন্দিরে বিশ্বশান্তি কামনায় বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ ও অগ্নিহোত্র যজ্ঞের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হবে। বিকেল ৩টায় মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে বের হবে জগন্নাথদেবের রথ। রথযাত্রাটি জয়কালী মন্দির, ইত্তেফাক মোড়, শাপলা চত্বর, দৈনিক বাংলার মোড়, পল্টন, জাতীয় প্রেস ক্লাব, হাইকোর্ট, দোয়েল চত্বর, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও পলাশী মোড় হয়ে সন্ধ্যার দিকে শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে পৌঁছাবে। আগামী ২৪ জুলাই একই পথে অনুষ্ঠিত হবে উল্টো রথযাত্রা।

ইসকন বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের পুরীর রথযাত্রার পর ঢাকার রথযাত্রাকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রথযাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ বছর ইসকনের উদ্যোগে দেশের ১২৮টি স্থানে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।

গত সোমবার স্বামীবাগ মন্দিরে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় ইসকন বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী জানান, রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে সরকারের উচ্চপর্যায়, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। পাশাপাশি ইসকনের প্রায় ৫০০ স্বেচ্ছাসেবকও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত থাকবেন। নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ধরনের শঙ্কা নেই বলেও তিনি জানান।

রাজধানীর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী তাঁতিবাজার শ্রীশ্রী জগন্নাথ জিউ ঠাকুর মন্দিরেও আজ বিকেল ৪টায় শুরু হবে রথযাত্রা। মন্দিরের সাংগঠনিক সম্পাদক তাপস সরকার জানান, শোভাযাত্রাটি তাঁতিবাজার, বংশাল, নবাবপুর, জনসন রোড, রায়সাহেব বাজার ও লক্ষ্মীবাজারসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করবে। প্রতি বছরের মতো এবারও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে রুট নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এখন রথযাত্রা উদযাপিত হচ্ছে। ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের উদ্যোগে ১৯৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো শহরে প্রথম আন্তর্জাতিক রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীনসহ বিশ্বের প্রায় সব বড় শহরেই এ উৎসব পালিত হচ্ছে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ