বর্তমান সরকার কোনোভাবেই চরমপন্থা ও উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। একই সঙ্গে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণেও সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন তিনি। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার কোনোভাবেই কোনো চরমপন্থা বা উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবে না। সরকারের এই অবস্থানের পক্ষে বিরোধী দল পুরোপুরি সহযোগিতা করবে বলেও বিশ্বাস করেন প্রধানমন্ত্রী। সমাপনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। অধিবেশনের শুরুতে প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। সমাপনী বক্তব্যে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে তারেক রহমান বলেন,
দুর্নীতির মাধ্যমে স্বৈরাচারের সময়ে প্রতিবছর এ দেশ থেকে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার করে দেওয়া হয়েছে। সব সমস্যার অন্যতম কারণ হচ্ছে এই দুর্নীতি। হাত বেঁধে হোক, টুঁটি চেপেই হোক, দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পেশাদার বাহিনীতে পরিণত করার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
যেকোনো মূল্যে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার বিষয়ে জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মতভিন্নতা থাকবে, তবে অবশ্যই শত্রুতা নয়। প্রতিহিংসা-প্রতিশোধের পরিবর্তে থাকবে ন্যায়পরায়ণতা। এই বাংলাদেশ যেন আর কখনই ফ্যাসিবাদ, স্বৈরাচারের কবলে না পড়ে, এই প্রশ্নে সংসদের বিরোধী দল এবং সরকারি দল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে চাইÑ জাতীয় ঐক্য, সেই ঐক্য বজায় থাকবে।
রাষ্ট্র ও সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকবে এমন বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, আমি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই, বর্তমান সরকার জনগণের সরকার, বর্তমান সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। আমরা জনগণের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করি, জনগণের আকাক্সক্ষাকে সম্মান করি। জনগণের জীবন এবং সম্পদ সুরক্ষা সরকারের পবিত্র আমানত বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই যেখানে রাষ্ট্র এবং সরকার হবে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক, অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সর্বোপরি নাগরিকের জীবন হবে নিরাপদ মর্যাদাপূর্ণ এবং সম্ভাবনাময়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগেও বলেছি আবার আমি উল্লেখ করতে চাই, বর্তমান সরকার কোনোভাবেই কোনো ধরনের চরমপন্থা বা উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দিবে না। আমরা যেভাবে সরকারি দল এবং বিরোধী দল এই সংসদে কোনো কোনো বিষয় হয়তো দ্বিমত করেছি কিন্তু একই সঙ্গে অনেক বিষয় একমত পোষণ করেছি। আমি বিশ্বাস করি দৃঢ়ভাবে যে উগ্রবাদ এবং চরমপন্থাকে বর্তমান সরকার প্রশ্রয় দিবে না। এ ব্যাপারে সম্পূর্ণভাবে বিরোধী দলের সহযোগিতা পাব ইনশাআল্লাহ।
মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার শিকার ও শহীদদের তালিকা করতে গিয়ে রাজনীতি টেনে আনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের পর মুক্তিযুদ্ধের তালিকা করার দায়িত্ব যাদের ছিল, তারা নিরপেক্ষ ও সঠিকভাবে সেই কাজটি করেনি। এ অবস্থায় নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য তালিকা প্রণয়নে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতির যে বিষয়টি আছে আমরা দেখেছি স্বৈরাচারের সময় কীভাবে প্রতিবছর এই দেশ থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার করে দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা উনার বক্তব্যে যে রাস্তাঘাটের উনি বিবরণ দিয়ে থাকুক না কেন এই সব সমস্যা একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে এই দুর্নীতি। এই দুর্নীতিকে যেকোনোভাবেই হোক, সেটি হাত বেঁধেই হোক টুঁটি চেপে হোক নিয়ন্ত্রণ করতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি দমন এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের অগ্রধিকার। বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে পেশাদার হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি মনে করি এই মুহূর্তে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কারণ ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশের মানুষের দ্বারা নির্বাচিত জাতীয় সংসদ বহু বছর পরে জনগণের সত্যিকার নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আলোচনা করে একটি বাজেট পাস করেছে। সেজন্যই এই মুহূর্তটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারগুলো যেমন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, কৃষকদের ঋণ মওকুফ, বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, জনশক্তিকে জন-সম্পদে পরিণত করা, কৃষি খাত, স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষা খাতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচি তুলে ধরেন। তিনি জানান, জনগণের জন্য যে সুবিধা দিয়ে কার্ড প্রচলন করা হচ্ছে সেগুলোকে একটি ইউনিভার্সেল কার্ডে রূপান্তরিত করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে যদি আমরা তাঁবেদার রুখতে চাই, স্বৈরাচার রুখতে চাই তাহলে অবশ্যই রাষ্ট্র এবং জনগণকে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে হবে।
বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলব
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঋণনির্ভর নয়, বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি আমরা গড়ে তুলতে চাই। আমাদের সরকারের যে কয়টি পরিকল্পনা তার অন্যতমই হচ্ছে অর্থনীতিকে ঋণনির্ভর থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত করব। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করব সম্পদ তৈরিতে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি হবে আমাদের প্রধান চালিকাশক্তি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমগ্র বিশ্ব একটি যুদ্ধ পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে এবং এই সংসদ এই সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অপরিসীম। এমন পরিস্থিতিতেও আমরা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছি, অর্থনৈতিকভাবে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছি।
সংসদ নেতা বলেন, সারাদেশ ঘুরে আমি মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, দেশ ঘুরেছি, বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি ঘুরে আসার পরে মানুষের মধ্যে আমি যে উৎসাহ, যে উদ্দীপনা যে আগুন দেখেছি, যে উদ্যম দেখেছি, একজন নাগরিক হিসেবে আমি কনফিডেন্ট।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যারা সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছি, আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, সংসদে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ ও অক্ষর আমাদের সরকার বাস্তবায়ন করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। একই সঙ্গে আমাদের যে ৩১ দফা রয়েছে যাকে জনগণ ম্যান্ডেট দিয়েছে তা এখন সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার।
মতভিন্নতা থাকবে, শত্রুতা নয়
সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার বক্তব্য শেষ করার আগে একটি কথা বলতে চাই। অবশ্যই এটি জাতীয় সংসদ এবং সংসদের রীতি অনুযায়ী সারা বিশ্বে যেটি প্র্যাকটিস সেই অনুযায়ী অবশ্যই আমাদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকবে। তবে অবশ্যই শত্রুতা নয়। প্রতিহিংসা প্রতিশোধের পরিবর্তে থাকবে ন্যায়পরাণতা। যা বিরোধীদল নেতা জোর দিয়েছেনÑ আমিও একই সঙ্গে তার ওপরে জোর দিতে চাইছি। এই বাংলাদেশ আর যাতে কখনও কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদ স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি তাঁবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত হতে না পারে, এই প্রশ্নে আমরা অর্থাৎ সংসদে বিরোধী দল এবং সরকারি দল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে চাই। আমাদের মধ্যে রয়েছে জাতীয় ঐক্য এবং যেকোনো মূল্যে এই ঐক্য অটুট এবং বজায় থাকবে ইনশাআল্লাহ।