হরমুজ প্রণালিতে তিনটি জাহাজে হামলার ঘটনাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আবারও চরমে পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এর পরপরই দুই দেশ একে অপরকে কড়া ভাষায় সতর্কবার্তা দেয়, যা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
মঙ্গলবারের পাল্টাপাল্টি হামলার পর ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, প্রয়োজনে আরও কঠোর সামরিক অভিযান চালানো হবে। তাঁর ভাষায়, ‘আজ রাতেও তাদের ওপর আরও শক্তিশালী হামলা হতে পারে।’
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিরিক, বন্দর আব্বাসসহ কয়েকটি এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। হরমুজ প্রণালির তীরে অবস্থিত এসব বন্দর আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরবর্তী হামলার পর ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, আগের দিন ইরানের জাহাজে হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া আরও কঠোর হবে।
অন্যদিকে মার্কিন হামলার পর উপসাগরীয় কয়েকটি দেশও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কথা জানিয়েছে। বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। কুয়েত জানিয়েছে, তারা কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে। একই সময়ে কাতারও নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে।
এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি ইরান। তবে এর আগে দেশটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হামলার দ্রুত ও সরাসরি জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তার প্রতি ইরানের হুমকি কমাতেই এই সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে তারা দাবি করে, বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের ওপর সাম্প্রতিক হামলার জন্য তেহরানকে জবাবদিহির মুখোমুখি করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ইরানের উপকূলীয় শহর কোনারাক, চাবাহার ও জাস্ক থেকেও বিস্ফোরণের খবর এসেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের দাবি, শুধু বন্দর আব্বাসেই অন্তত আটটি বিস্ফোরণ হয়েছে। এছাড়া সিরিক ও জাস্ক বন্দরে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলেও জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরের আবু মুসা দ্বীপেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতের ঘটনা ঘটেছে। দ্বীপটির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বিরোধ চলছে।
হামলার পর বন্দর আব্বাসে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। তবে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো প্রকাশ করা হয়নি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চাবাহারে সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে এবং বুশেহরে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর একটি স্থাপনায় আগুন লাগে।
ইরানি স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সি (আইএসএনএ) জানিয়েছে, চাবাহারের তিনটি বিদ্যুৎ লাইনের মধ্যে দুটি দ্রুত পুনরায় চালু করা হয়েছে। বাকি লাইনটিও অল্প সময়ের মধ্যে সচল করার কাজ চলছে।
বুধবার রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরান সম্প্রতি যোগাযোগ করেছে এবং তারা একটি নতুন সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, তেহরান আদৌ কোনো চুক্তি মেনে চলবে কি না।
এর আগে মঙ্গলবার মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে তিনটি তেলবাহী জাহাজে হামলার জবাব হিসেবে তারা ‘শক্তিশালী’ সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে।
মঙ্গলবার থেকে বুধবার পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে যে পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে, তা গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের পর সবচেয়ে বড় সামরিক উত্তেজনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, গত মাসের যুদ্ধবিরতি কার্যত আর কার্যকর নেই। তার ভাষায়, ‘গতরাতে আমরা কঠোর হামলা চালিয়েছি, প্রয়োজন হলে আজ রাতেও তা অব্যাহত থাকবে।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি আর তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে চাই না।’
এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘অশালীন বক্তব্যের জবাব আমরা অশালীন ভাষায় দিই না; আমরা আমাদের জবাব দিই দৃঢ় পদক্ষেপ ও সাহসিকতার মাধ্যমে।’