মঙ্গলবার, ১২ ডিসেম্বর ২০২৩, ০১:৫১ পূর্বাহ্ন

দর্শনার্থীর বেঞ্চ হয়ে গেছে ডেঙ্গু রোগীর শয্যা

দর্শনার্থীর বেঞ্চ হয়ে গেছে ডেঙ্গু রোগীর শয্যা

স্বদেশ ডেস্ক: মুগদা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার (হোমিও) ডা. মো. ওসমান গনি গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার লাকসাম থেকে গত শনিবার সকাল ৮টার দিকে সরাসরি অফিসে আসেন। পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে দেড়টার দিকে বের হন হাসপাতাল থেকে। আড়াইটার দিকে উত্তরায় তার বড় বোনের বাসায় যান। দুপুরের খাবার খেয়ে সেই বাসাতেই ঘুম দেন। ওঠেন বিকাল চারটার দিকে। গা বেশ গরম। দেখলেন, তার

শরীরের তাপমাত্রা ১০৫ ডিগ্রি উঠে গেছে। কালবিলম্ব না করে চলে আসেন তার নিজ কর্মস্থল মুগদা হাসপাতালে। সেই থেকে এখানেই চিকিৎসাধীন তিনি। ডেঙ্গুজ্বরে তার কিডনিসহ হেপাটাইটিসজনিত সমস্যাও দেখা দিয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা।

তার পাশের শয্যায় চিকিৎসাধীন ডা. মো. শাহ আলম সিকদার। গত শুক্রবার টঙ্গীতে তার নিজ কার্যালয় থেকে ফেরার পর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এই পশুর চিকিৎসক। তার অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যাচ্ছে বলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান।

সরেজমিন গতকাল শুক্রবার মুগদা হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর অন্যান্য হাসপাতালের মতো এখানেও প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাত পর্যন্ত হাসপাতালটির মেডিসিন ওয়ার্ড, শিশু ওয়ার্ড ও কেবিনে ভর্তি ছিল ১৩২ ডেঙ্গু রোগী। গতকাল শুক্রবার মধ্যরাত পর্যন্ত এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় দেড়গুণ হয়ে গেছে।

এখানে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৩ মাসের শিশু থেকে শুরু করে ৮৭ বছরের বৃদ্ধও রয়েছেন। খোদ এই হাসপাতালটিরই চিকিৎসক ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এখানে শয্যা নিয়েছেন। এখানকার রোগীদের মধ্যে মো. জিয়াউদ্দিন নামে ১৭ বছরের এক মানসিক প্রতিবন্ধীর অবস্থা খুবই সঙ্গিন। বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে এ কিশোরকে আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

দিন-রাত কাজ করেও ডেঙ্গু রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন মুগদা হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা। শয্যা সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি রোগী এখানে চিকিৎসাধীন। তাই নির্দিষ্ট ওয়ার্ডের বাইরে তো বটেই, মেঝেতে এমনকি দর্শনার্থীদের বেঞ্চকেও শয্যা বানিয়ে এখানে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রোগী ও তাদের স্বজনদের ভিড় সর্বত্র। সব মিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এহেন পরিস্থিতিতে সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রাখার কথা বলছেন চিকিৎসকরা।

এ হাসপাতালের বহির্বিভাগে জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের প্রচুর ভিড়। এর মধ্যে অধিকাংশই ডেঙ্গু-আক্রান্ত। যাদের অবস্থা নাজুক, শুধু তাদেরই ভর্তি করা হচ্ছে। অন্যদের প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে ওষুধ ও সেবন পদ্ধতি জানিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

হাসপাতালটির মেডিসিন ওয়ার্ডের সিনিয়র নার্স আমেনা খাতুন বলেন, হাসপাতালে আসা রোগীদের মধ্যে বেশিরভাগই ডেঙ্গু রোগী। বৃহস্পতিবার মধ্যরাত পর্যন্ত এই ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন ১১০ জন রোগী। শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫১ জনে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

শিশু ওয়ার্ডের সিনিয়র নার্স সিমা কর্মকার বলেন, শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত এই ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে ৪০ জন রোগী। এদের মধ্যে ৮ শিশুর অবস্থা খারাপ। আমরা সাধ্যমতো চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছি। তারপরও বিধাতা স্বয়ং যদি এই বিপদ থেকে রক্ষা না করেন তা হলে পরিস্থিতি মহামারী রূপ নিতে পারে।

মুগদা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. আমিন আহমেদ খান আমাদের সময়কে বলেন, যে যাই বলুক, ধীরে ধীরে ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, তা অস্বীকার করা যাবে না। প্রতিনিয়ত বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা।

এ বছর ডেঙ্গুর ধরন পাল্টে গেছে জানিয়ে পরিচালক আরও বলেন, আগে যেমন তীব্র জ্বরের সঙ্গে গায়ে র‌্যাশ ওঠা, ঠোঁট ফেটে রক্ত বের হওয়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যেত, এবার সেসব লক্ষণ নেই আক্রান্ত অনেকের মধ্যে। রোগীর রক্তের প্লাটিলেট খুব দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। জ্বর না কমা বা অবস্থা খারাপের দিকে যেতে থাকা, বমি হওয়া, পেটে তীব্র ব্যথা, রক্তক্ষরণ, মাথা ধরা, চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া, হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া, ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা প্রস্রাব না হওয়া বা কম হওয়া, খুব বেশি দুর্বল হয়ে পড়া, নিদ্রাহীনতা ও আচরণের আকস্মিক পরিবর্তন ডেঙ্গুজ্বরের অন্যতম লক্ষণ। তাই জ্বর হলেই ঘরে বসে চিকিৎসা না নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কিংবা হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি রোগীকে প্রচুর পরিমাণে তরল জাতীয় খাবার দিতে হবে। যেমন- ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ফলের জুস এবং খাবার স্যালাইন। ডেঙ্গু নির্মূলে যারা মশা নিধনের দায়িত্বে আছেন অনতিবিলম্বে তাদের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি সবাইকে আত্মকেন্দ্রিক সচেতনতা বাড়ানোর কথাও বলেন এই চিকিৎসক।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

© All rights reserved © 2019 shawdeshnews.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
themebashawdesh4547877