শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ১২:২০ অপরাহ্ন

তিন দফায় সক্রিয় হচ্ছে বিরোধী জোট

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬
  • ২ বার

সংসদে তুমুল বাগ্বিতণ্ডা আর রাজপথে আন্দোলনের হুশিয়ারির মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তাপের আভাস দিচ্ছে বিরোধী দল জামায়াত জোট। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং সংবিধান সংস্কারের দাবিতে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে বিরোধী জোটের রাজনীতি। তিনটি ইস্যুকে সামনে রেখে নতুন করে আন্দোলনের হুশিয়ারি দিচ্ছেন বিরোধী নেতারা। তাদের অভিযোগ, জনগণের রক্ত, ত্যাগ ও প্রত্যাশার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। আর তাই সত্য প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের স্বার্থে এই তিন দাবির দ্রুত বাস্তবায়ন অপরিহার্য।

এদিকে সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনই বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে জুলাই হত্যার সহযোগী ও পতিত সরকারের মিত্র উল্লেখ করে তার পদত্যাগ দাবি করেন। জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে হলে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে সরকারকে স্পষ্ট অঙ্গীকার করতে হবে। অন্যথায় জুলাই শহীদদের আত্মদান বৃথা হয়ে যাবে।

অন্যদিকে সংসদ ভবনের বাইরে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জামায়াত জোটের অন্যতম শরিক এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তিনটি মূল দাবি তুলে ধরে বলেন, গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রপতির অভিশংসন ও জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত না হলে আন্দোলন তীব্র করা হবে। জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের দাবি করেছেন, পরিকল্পিতভাবে বিএনপিকে সুবিধা দিতেই নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করা হয়েছে। সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সূত্র ধরে তিনি বলেন, রিজওয়ানা হাসান টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে মন্তব্য

করেছেনÑ যারা নারীদের উপযুক্ত অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি, তারা বিরোধী দলে থাকলেও আমরা তাদের মূলধারা বা প্রধান শক্তি হিসেবে আসতে দিইনি। এই বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ হয়েছে। যদি কেউ প্রকাশ্যে বলে যে একটি দলকে মূলধারায় আসতে দেওয়া হয়নি, তা হলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এরই মধ্যে জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অন্তত ৫৩টি আসনে অনিয়মের মাধ্যমে তাদের পরাজিত দেখানো হয়েছে।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, আমরা সংসদের ভেতরে সমাধান চাই। সংসদে যদি সেই পরিবেশ তৈরি না হয়, তা হলে রাজপথে নামতে বাধ্য হব।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক নিজের নির্বাচনী আসনে ফলাফলে কারচুপির অভিযোগ তুলে আদালতে রিট করেছেন। তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এবং বলেছেন, নির্বাচনী অনিয়মের সত্যতা জাতির সামনে তুলে ধরা জরুরি।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক আব্দুল হালিম আমাদের সময়কে বলেন, আমাদের জোট প্রথমে সংসদের ভেতরেই বিষয়গুলো উত্থাপন করবে। সেখানে সন্তোষজনক প্রতিক্রিয়া না পেলে তখন রাজপথে আন্দোলনের পথেও হাঁটতে হতে পারে।

এদিকে বিরোধী জোটের দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা করতে চাইলেও গুরুত্ব দিতে নারাজ ক্ষমতাসীন বিএনপি। তবে নির্বাচনের ফলাফল কারচুপির অভিযোগের বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তা পাগলের প্রলাপ বলে মন্তব্য করে বলেছেন, একটি সর্বজনস্বীকৃত নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা জনগণ গ্রহণ করবে না। জুলাই আন্দোলনকে বিএনপি ধারণ করে এবং যে কোনো মূল্যে জুলাই হত্যার বিচার হবে। এ নিয়ে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ নেই। সরকারি দলের একাধিক শীর্ষপর্যায়ের নেতা মনে করেন, বিরোধী দল রাজনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে রাষ্ট্রপতিসহ বিভিন্ন ইস্যুকে সামনে এনে রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত।

ইতোমধ্যে জামায়াত ও এনসিপির একধিক শীর্ষ নেতা আমাদের সময়কে বলেছেন, রাষ্ট্রপতিকে অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে। ফ্যাসিস্টের দোসর কোনো অবস্থাতেই থাকতে পারে না। জুলাই হত্যার বিচার ও সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিকে সামনে রেখে তারা সংসদের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। ঈদের পর এই ইস্যুতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে জানান নেতারা।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে বিতর্ক নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি মূলত রাজনৈতিক আস্থার সংকটের প্রতিফলন। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবি রাজনৈতিকভাবে জোরালো হতে পারে, কিন্তু সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তারা মনে করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে কিনা তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকতা ও ঐকমত্যের ওপর। সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নটি আরও গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই সংবিধানের বিভিন্ন ধারা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অনেকের মতে, সময়ের বাস্তবতায় কিছু মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। তবে এই সংস্কার কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির স্বার্থে নয়, বরং রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে হয়Ñ এ বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সারোয়ার জাহান বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের মতো বিষয় হঠাৎ করে বাস্তবায়নযোগ্য নয়। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের জন্য সংসদে নির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। তাই রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে বাস্তব পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর। বিরোধী দলের এই দাবি মূলত রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল, যা রাজপথ ও সংসদ দুই জায়গাতেই সরকারকে চাপে রাখার একটি অংশ হতে পারে। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার ব্যবস্থা নিতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে সংসদে বড় বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে চাইছে জামায়াত। সেই কারণে তারা সরকারকে চাপে রাখতে নির্বাচনী ইস্যু ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্ন সামনে আনছে। বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের দৃশ্যমান করতে সংসদের ভেতরে তর্ক-বিতর্ক এবং বাইরে রাজনৈতিক কর্মসূচি দুই পথেই সক্রিয় থাকার কৌশল নিতে পারে তারা।

আরেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাব্বির আহমদের মতে, নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। তবে শক্ত প্রমাণ ছাড়া এসব অভিযোগ দীর্ঘমেয়াদে বড় রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে না। যদি অভিযোগের পক্ষে স্পষ্ট প্রমাণ সামনে আসে, তা হলে এটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। আর প্রমাণ না থাকলে বিষয়টি রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ