শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন থেকে মূল্যবান সময় বাঁচাতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা এগিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে দুটি পাবলিক পরীক্ষা শেষ করার সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। কিন্তু সময় বাঁচানোর সেই লক্ষ্য বাস্তব শিক্ষাপঞ্জিতে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই। জুলাইয়ে ক্লাস শুরুর কথা থাকলেও ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু হচ্ছে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস শুরু হবে।
ফলে উচ্চমাধ্যমিকের শুরুতেই প্রায় তিন মাস পিছিয়ে যাচ্ছে সদ্য একাদশে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের পাঠক্রম। এর সঙ্গে আগামী বছরগুলোয় পাবলিক পরীক্ষা আরও এগিয়ে আনার পরিকল্পনা যুক্ত হলে ক্লাস ও পরীক্ষার প্রস্তুতির মধ্যকার সময় আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক।
সাধারণ শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী একাদশ শ্রেণির শিক্ষা কার্যক্রম ১ জুলাই শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু এবার ভর্তি-প্রক্রিয়াই শেষ হচ্ছে সেপ্টেম্বরের দিকে। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ করা হয় ১০ আগস্ট। লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৮২ দিন পর ফল প্রকাশের মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দীর্ঘ বিলম্ব হয়। এরপর ২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় একাদশে ভর্তির আবেদন।
প্রথম ধাপে ৯ লাখ ৮০ হাজার ৮১৫ শিক্ষার্থী কলেজ ও মাদ্রাসায় ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছে। আবেদন করেও আসন পায়নি ১৪ হাজার ৪১৫ জন; তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীও রয়েছেন ২ হাজার ২০৫ জন। এরপর ২৩ সেপ্টেম্বর ক্লাস শুরুর কথা থাকলেও পবিত্র ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম উপলক্ষে ওই দিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটি থাকায় এক দিন পিছিয়ে ২৪ সেপ্টেম্বর করা হয়েছে।
শুধু একাদশের ক্লাস নয়, সামগ্রিক শিক্ষাপঞ্জিতেই রয়েছে একের পর এক সময়ের অসামঞ্জস্য। ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা গত বছরের ডিসেম্বরে হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের ১৫ থেকে ১৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়। ফলে নির্ধারিত শিক্ষাবর্ষের সঙ্গে পরীক্ষা-ব্যবস্থার সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
মাধ্যমিক পর্যায়েও একই চিত্র। ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা প্রথমে ৭ জানুয়ারি শুরুর পরিকল্পনা করা হলেও পরে তা পিছিয়ে ১৪ মার্চ করা হয়েছে। অথচ একই সময়ে পরীক্ষা এগিয়ে এনে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময়ের অপচয় কমানোর পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে।
একাদশে ভর্তি হতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের বড় উদ্বেগ এখন— ক্লাসের শুরুতেই যে সময় হারাচ্ছে, সেটি কীভাবে পুষিয়ে নেওয়া হবে। তাদের আশঙ্কা, একদিকে ক্লাস শুরু হচ্ছে দেরিতে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে এইচএসসি পরীক্ষা এগিয়ে এলে স্বাভাবিক পাঠদান ও পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নির্ধারিত সময় কমে যাবে।
কয়েকজন সদ্য এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী জানায়, শিক্ষা কার্যক্রম শুরুতেই যদি কয়েক মাস পিছিয়ে যায়, পরে পরীক্ষা এগিয়ে আনা হলে আমাদের প্রস্তুতির সময় স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে। তখন দ্রুত সিলেবাস শেষ করার চাপ তৈরি হবে।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মো. জিয়াউল কবির দুলু বলেন, অভিভাবকদেরও একই উদ্বেগ। তাদের বক্তব্য, পরীক্ষা এগিয়ে আনার আগে শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকে নির্ধারিত সময়ের পূর্ণ ক্লাস নিশ্চিত করা জরুরি। না হলে সময় বাঁচানোর উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. সেলিম আহমদ বলেন, সেশনজট কমানোর জন্য পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন করা হলে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্লাস শুরুর সময়ও পুনর্বিন্যাস করতে হবে। শুধু পরীক্ষার তারিখ এগিয়ে নিলে শিক্ষার্থীদের ওপর সিলেবাস শেষ করার বাড়তি চাপ পড়তে পারে।
শিখন নয়, শুধু পরীক্ষা শেষ করার প্রবণতা উল্লেখ করে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, শিক্ষাপঞ্জির উদ্দেশ্য শুধু নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা নেওয়া নয়; নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় শিখন নিশ্চিত করাও এর সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেছেন, শিক্ষার্থীরা কতদিন ক্লাস করল এবং ক্লাসে কী শিখল— এ বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে দ্রুত শিক্ষাবর্ষ শেষ করার প্রবণতা থেকে বের হতে হবে। তার মতে, শিখন ঘাটতি রেখে তাড়াহুড়ো করে শিক্ষাবর্ষ শেষ করলে ফল বিপর্যয়ের ঝুঁকি থাকে।
শিক্ষা প্রশাসনের দৃষ্টিতে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেছেন, শিক্ষাপঞ্জি অতীতের তুলনায় খুব বেশি এলোমেলো হয়নি; নতুন পরিকল্পনায় কিছু পরিবর্তনের কারণে সাময়িক সমস্যা হচ্ছে এবং আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে সবকিছু শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী শৃঙ্খলায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, এবার ভর্তি-প্রক্রিয়া এগিয়ে আনা হয়েছে এবং যে সময়টুকু পিছিয়েছে, তা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।