বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়নে উন্নতি হয়েছে শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, জর্ডান, মাইক্রোনেশিয়া ও আফ্রিকার দেশ টোগোর। চলতি বছর প্রথম পাঁচটি দেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। আর আফ্রিকার দেশ টোগো নিম্ন আয়ের (এলডিসি) দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উঠে এসেছে। বাংলাদেশেরও নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বেরিয়ে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নিত হওয়ার কথা ছিল চলতি বছর। কিন্তু অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার কারণে বাংলাদেশ আরও তিন বছর সময় নিয়েছে। প্রশ্ন হলো, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন ও টোগোর মতো দেশ অর্থনৈতিক মর্যাদায় এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশের অগ্রগতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জের কারণে চাপের মুখে পড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, ব্যাংক খাতে দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি, বিনিয়োগ পরিবেশের সীমাবদ্ধতা, দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি এবং নীতির বাস্তবায়নে দুর্বলতা প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বেসরকারি খাত গত তিন বছরে এক গভীর কাঠামোগত সংকটের মুখে পড়েছে। জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদের হার ও কার্যকর মূলধনের ঘাটতিতে শিল্প খাতের মূলধন উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষয় হয়েছে এবং হচ্ছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ, উৎপাদন বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা কমে এসেছে। এসব কারণে বাংলাদেশকে পিছিয়ে আসতে হয়েছে।
তারা বলছেন, যদি অর্থনৈতিক কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়িত হয় এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, তবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে পারবে। তবে যদি সংস্কারের গতি ধীর থাকে তবে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। এক্ষেত্রে আরও পিছিয়ে পড়তে পারে বলেও তাদের আশঙ্কা।
বিশ্বব্যাংক সদস্য দেশগুলোকে মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে চার শ্রেণিতে ভাগ করে। এগুলো হলো নিম্ন, নিম্নমধ্যম, উচ্চমধ্যম ও উচ্চ আয়ের দেশ। এর ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক ঋণের পরিমাণ, শর্তসহ অন্যান্য সুবিধা নির্ধারণ করে।
মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে এ বছরের ১ জুলাই থেকে পরবর্তী এক বছরে বিশ্বব্যাংক কোন দেশ কোন শ্রেণিতে, তা নির্ধারণের জন্য নতুন সীমা নির্ধারণ করেছে। এখন থেকে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে মাথাপিছু আয় কমপক্ষে ১ হাজার ১৭৫ ডলার হতে হবে। নিম্নমধ্যম থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে মাথাপিছু আয় কমপক্ষে ৪ হাজার ৬৩৫ ডলার হতে হবে। আর উচ্চ আয়ের দেশে যেতে হলে ১৪ হাজার ৩৭৫ ডলার মাথাপিছু আয় হতে হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, বাংলাদেশের গড় মাথপিছু আয় এখন ৩ হাজার ২০ মার্কিন ডলার।
তবে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর অবস্থা স্বস্তিকর নয়। দেশের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে, যা আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রপ্তানি আয় গত অর্থবছরজুড়েই নেতিবাচক অবস্থানে ছিল। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ০.৫৮ শতাংশ কমে ৪৮ বিলিয়ন (৪ হাজার ৮০০ কোটি) ডলারে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক সুদের হার ১২-১৩ শতাংশ, যা বিনিয়োগের জন্য মোটেও সুখকর নয় বলে ব্যবসায়ীরা বলছেন। গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে কারখানার উৎপাদন ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে, দাবি কারখানা মালিকদের। রাজস্ব আয়ে বিশাল ঘাটতি নিয়েই বছর শেষ করেছে রাজস্ব বোর্ড। সবমিলিয়ে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। দেশের ব্যাংক খাতের চরম দুরবস্থার কারণে মোট ঋণের ৩২ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। এতে নতুন করে বিনিয়োগে যেতে পারছেনা অনেক ব্যাংক। এমনকি গ্রাহকের টাকাও দিতে পারছে না বেশ কিছু ব্যাংক। স্বস্তির মধ্যে শুধু রয়েছে রেমিট্যান্স আয় ও রিজার্ভ। সেই রেমিট্যান্সও জুন মাসে কিছুটা কমেছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উঠতে আরও তিন বছর সময় চেয়ে জাতিসংঘে চিঠি দিয়েছে সরকার। তা মেনে নিয়েছে সংস্থাটি। সে হিসেবে ২০২৯ সালে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে উঠে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় যাবে বাংলাদেশ।
জানতে চাইলে অর্থনীতির অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ভিয়েতনামের মতো দেশ উৎপাদনশিল্প, রপ্তানির বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করেছে। বিপরীতে বাংলাদেশের অগ্রগতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জের কারণে চাপের মুখে পড়েছে।
প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের গতি তুলনামূলকভাবে ধীর হওয়ায় আমরা প্রত্যাশিত অগ্রগতির তুলনায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকির মুখে রয়েছি বলেও মনে করছেন এ অর্থনীতিবিদ।
তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো প্রবৃদ্ধি, তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং সামাজিক উন্নয়নের কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য ধরে রেখেছে। তাই ‘আমরা পারছি না’—এটা বলাও ঠিক নয় বলে মনে করেন তিনি।
তার মতে, বাংলাদেশ এরই মধ্যে বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের অন্তর্ভুক্ত; তাই আগামী তিন বছরে মূল চ্যালেঞ্জ হবে এ অবস্থানকে শক্তিশালী করা এবং উচ্চতর আয়ের স্তরের দিকে এগোনোর ভিত্তি তৈরি করা। যদি অর্থনীতির ক্ষেত্রে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়িত হয় এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, তবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে পারবে। কিন্তু সংস্কারের গতি ধীর থাকলে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন কঠিন হতে পারে।
জানা যায়, বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনাম। রপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক মডেলের ওপর ভর করে ভিয়েতনাম শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২০২৪ ও ২০২৫—উভয় বছরেই দেশটির রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশের বেশি। একই সময়ে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) যথাক্রমে ৭ ও ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফিলিপাইন অর্থনীতির ব্যাপক সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন আয়ের শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে। গত পাঁচ বছরে দেশটির জিডিপি গড়ে বছরে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ হারে বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধি কোনো একক খাতের উল্লম্ফনের ফল নয়; বরং অর্থনীতির প্রায় সব প্রধান খাতেই উন্নতির প্রতিফলন।
২০২২ সালে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে প্রায় ধসে পড়ার তিন বছরের মাথায় শ্রীলঙ্কা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালে দেশটির প্রকৃত জিডিপি ৫ শতাংশ বেড়েছে। শিল্প, আর্থিক সেবা ও পর্যটন খাতের পুনরুদ্ধার এ প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নতুন আয়ের শ্রেণিতে উন্নীত হওয়া দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও পুনরুদ্ধারের প্রতীক হলেও তারা নির্ধারিত সীমা অল্প ব্যবধানে অতিক্রম করেছে।
দীর্ঘ কভিড-১৯ পরবর্তী পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার পর মাইক্রোনেশিয়া ধীর ছিল। কিন্তু স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। নির্মাণ ও কৃষি খাত ছিল এ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের বেসরকারি খাত গত তিন বছরে এক গভীর কাঠামোগত সংকটের মুখে পড়েছে। জ্বালানি সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, উচ্চ সুদের হার ও কার্যকর মূলধনের ঘাটতিতে শিল্প খাতের মূলধন উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষয় হয়েছে এবং হচ্ছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ, উৎপাদন বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা কমে এসেছে। যা বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছানো বা এলডিসি-পরবর্তী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য শক্তিশালী উৎপাদন খাত অপরিহার্য। কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা ও বেসরকারি খাতে মূলধনের প্রবাহ দ্রুত পুনরুদ্ধার না হলে সে সক্ষমতা ফিরে আসবে না। এলডিসি উত্তরণের জন্য পাওয়া অতিরিক্ত তিন বছরকে কার্যকর সংস্কার, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, ঋণ পুনর্গঠন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কাজে লাগাতে হবে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের গবেষণা ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক সূচক ও সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে এখনই খুব একটা আশাবাদী হওয়ার সুযোগ দেখছি না। তবে কিছু ইতিবাচক দিক হলো—বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের সংকটের তুলনায় কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কঠোর রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সংস্কার কর্মসূচি চলছে। ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, কম কর আদায়, বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির ধীরগতি, খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচারের প্রভাব ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে অর্থনীতি গতিশীল হবে। এতে এলডিসি থেকে বের হওয়া সহজ হবে।