আজ ৫ জুলাই। ২০২৪ সালের এই দিনটি ছিল শুক্রবার অর্থাৎ ছুটির দিন। সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিলসহ চার দফা দাবি আদায়ে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী এদিন জনসমর্থন আদায়ে বৈষম্যবিরোধী
ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে সারাদেশে সমন্বিতভাবে অনলাইন ও অফলাইনে জনসংযোগ কর্মসূচি পালন করা হয়। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেন বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা।
এর আগে, ৪ জুলাই সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে কর্মসূচি শেষে তিন দিনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন ‘৫ জুলাই চার দফা দাবির ভিত্তিতে অনলাইন ও অফলাইনে আমাদের জনসংযোগ কর্মসূচি চলবে। ৬ জুলাই সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে বিকাল ৩টায় বিক্ষোভ মিছিল বের করা হবে। ৭ জুলাই সব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস পরীক্ষা বর্জনের মতো ধর্মঘট পালন করা হবে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এ কর্মসূচির প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ সমর্থন জানাতে থাকেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। একই দিন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও এ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তার আগের রাতে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ব্যানার ছাড়াই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকেন।
ছাত্রদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে কর্মসূচিগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ব্যাপক হারে সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণ করতে থাকেন। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের প্রতিটি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ৪ থেকে ৫ জুলাইয়ের মধ্যে অভিন্ন বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের আহ্বানে একাত্মতা পোষণ করেন।
এটা দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে। সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক প্রচার হয়। কোন কোন বিভাগ ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেছে, ফেসবুকে তার হালনাগাদ তালিকাও প্রকাশ করেন সমন্বয়করা।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রথমত ২০১৮ সালে সরকারের জারি করা পরিপত্র পুনর্বহাল করতে হবে। এর বাইরে কোটাব্যবস্থা নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইলে আগের পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করতে হবে। এই কমিশনের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকারি চাকরিতে সব গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাদ দিতে হবে। অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য যৌক্তিক ও ন্যূনতম কোটা রাখা যেতে পারে। তবে কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধাতালিকা থেকে নিয়োগ দিয়ে শূন্য পদগুলো পূরণ করতে হবে। চাকরিতে একই কোটা একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে না। দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এসব দাবি আদায়ে ৫ জুলাই দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। চট্টগ্রাম, খুলনা ও গোপালগঞ্জে সড়ক অবরোধ করা হয়। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে মানববন্ধন করেন কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা। এ-দিন তৎকালীন ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) নেতাকর্মীরা ভয়ভীতি দেখিয়ে চলমান আন্দোলন থেকে তাদের বিরত রাখার চেষ্টা করেন। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নানাভাবে হয়রানিও করা হয়, দেওয়া হয় হুমকি-ধমকি। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলমকে ৪ জুলাই দিবগত রাতে অমর একুশে হল থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে ছাত্রলীগ। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ওই হলের সামনে জড়ো হন। সারজিস আলম হলে তার নিজের কক্ষে ফেরত যান। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে এই প্রথম ছাত্রলীগ পিছু হটতে বাধ্য হয়।
কোটাব্যবস্থা বাতিলের দাবিতে এদিন চট্টগ্রাম শহরের ২ নম্বর গেট সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভ হয় গোপালগঞ্জের তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও। বেলা দুইটা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত প্রায় দেড় ঘণ্টা গোপালগঞ্জ-টুঙ্গিপাড়া সড়ক অবরোধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা।
খুলনার জিরো পয়েন্ট এলাকায় বিকালে অবরোধ করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ সময় জিরো পয়েন্ট এলাকার চারটি সড়কেই যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সন্ধ্যার দিকে অবরোধ প্রত্যাহার করে ক্যাম্পাসে ফিরে যান আন্দোলনকারীরা।
এভাবেই চলতে থাকে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলন। অমূল্য মূল্যবান অনেক প্রাণের বিনিময়ে শেষ পর্যন্ত এটি পরিপূর্ণতা পায়।