শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১৬ অপরাহ্ন

হাসপাতালে শিশুদের ভিড়, উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪ বার

জন্মের মাত্র ২২ দিন পর থেকেই নানা জটিলতায় ভুগছে ফরিদপুরের আনসার শাওনের ছয় মাস বয়সী সন্তান। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও সুস্থতা মেলেনি। এবারের ঈদও কেটেছে হাসপাতালের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে। ঈদের পরদিন শিশুটিকে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে তার হাম শনাক্ত হয়। শাওন বলেন, ‘অনেক দিন ধরে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে নিজের সব টাকা শেষ। এখন ধার-দেনাও হয়ে গেছে। কারও কাছে সাহায্য চাইলে আর কেউ দিতে চায় না।’

দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৩৭ জন। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে ৩ জন, আর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও ২ জন।

সর্বশেষ তথ্য বলছে, এক দিনে নতুন করে ১ হাজার ১১৫ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে ১২৭ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট ৩ হাজার ১৯২ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৪৬৭ জনে। এর মধ্যে ১১ হাজার ২৪৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।

ঢাকা বিভাগে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। এখানে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। ৯ হাজার ২৭৪ জন সন্দেহভাজনের মধ্যে ১ হাজার ৯৬৫ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। শুরুতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম চালু করা হয়। পরে তা ঢাকা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনেও সম্প্রসারণ করা হয়।

এ পর্যন্ত বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকা, খুলনা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে মোট ১৩ লাখ ২৫ হাজার ১৬৪ জন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি টিকা দেওয়া হয়েছে ঢাকা বিভাগে ৫ লাখ ১০ হাজার ৩৬০ জনকে।

আগামী ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী শুরু হচ্ছে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন। ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী সব শিশুকে অন্তত এক ডোজ টিকা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। শিশুর টিকা কার্ড থাকলেই দেশের যেকোনো কেন্দ্র থেকে টিকা নেওয়া যাবে। আগে টিকা নেওয়া থাকলেও এই ক্যাম্পেইনে অতিরিক্ত ডোজ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, তবে দুই ডোজের মধ্যে কমপক্ষে ২৮ দিনের ব্যবধান থাকতে হবে।

রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে হামে আক্রান্ত রোগীর চাপ স্পষ্ট। শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, নতুন রোগীর পাশাপাশি অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ভর্তি রয়েছে। সরকারি ছুটির দিনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় নতুন রোগীরা ভোগান্তিতে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে এক থেকে দুই দিন পর্যন্ত সিনিয়র চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যা গুরুতর রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

পাবনা থেকে আসা অভিভাবক সাজেদুল ইসলাম জানান, ‘আমার ছেলে সাফিন তিন দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি, প্রায় ১৫ দিন ধরে অসুস্থ। অবস্থা খারাপ হওয়ায় ঢাকায় এনেছি। গতকাল দুইজন মারা গেছে শুনে খুব ভয় লাগছে। আমি গরিব মানুষ, খরচ সামলাতে পারছি না।’

অন্যদিকে, বরিশাল বিভাগেও হামের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সেখানে

আক্রান্তের সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়েছে এবং হাম সন্দেহে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ জনে। ইতোমধ্যে ১ হাজার ৩৩১ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের প্রথম ১৫ দিনেই বরিশালে ১ হাজার ৩ জন শিশু চিকিৎসা নিয়েছে এবং প্রায় ৯০০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে হাম সন্দেহে মারা গেছে ১০ শিশু, যার মধ্যে ৪ জনের হাম নিশ্চিত ছিল।

প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে বরিশালের বাকেরগঞ্জ, মেহেন্দিগঞ্জ, নলছিটি ও বরগুনা সদর উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যা প্রায় শেষ পর্যায়ে। পাশাপাশি বরিশাল নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে প্রায় ৪২ হাজার শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। আগামী ২৩ এপ্রিলের মধ্যে এ কার্যক্রম শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল জানিয়েছেন, ‘সব শিশু যেন টিকার আওতায় আসে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০ এপ্রিল থেকে দেশের অন্যান্য স্থানের মতো বরিশালের সব স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে।’

হামের বিস্তার রোধে দ্রুত টিকাদান নিশ্চিত করা এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপরই এখন জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ