ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনভিত্তিক হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর লোহিত সাগরে দুটি সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। এতে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বিশ্বের তেল সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি নৌপথ বাব এল-মান্দেব প্রণালিও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বুধবার পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকার বাব এল-মান্দেব প্রণালি এড়াতে গতিপথ পরিবর্তন করে। এর আগের দিন সৌদি তেল নিয়ে চীন ও ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করা তিনটি ট্যাংকারও ঘুরে ফিরে যায়। পরে হুথিরা জানায়, তাদের বাহিনী লোহিত সাগরে সৌদি পতাকাবাহী এনসেলিয়া ও লায়লা ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে।
একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র জানায়, এনসেলিয়া সৌদি আরবের জিজান বন্দরের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হওয়ার কথা জানিয়ে জরুরি বিপদসংকেত পাঠিয়েছিল। ব্রিটিশ সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ভ্যানগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি পতাকাবাহী ট্যাংকারটি আল-শুকাইক বন্দরের প্রায় ৭০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে লায়লার ওপর হামলার বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
হুথিদের এই পদক্ষেপকে ইরানের কৌশলগত চাপ তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন কিছু বিশ্লেষক। বাব এল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে হুথিরা। আর আরব উপদ্বীপের অপর প্রান্তে অবস্থিত হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও অবরোধের কারণে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ইতোমধ্যেই বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
সৌদি আরব হরমুজ প্রণালি এড়াতে পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পাঠাচ্ছে। কিন্তু লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের বাব এল-মান্দেব প্রণালিও যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে এসব জাহাজকে উত্তরের সুয়েজ খাল ব্যবহার করতে হবে। এতে তেল পরিবহনে কয়েক সপ্তাহ অতিরিক্ত সময় এবং উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত ব্যয় যোগ হতে পারে।
ইরানের ওপর মার্কিন হামলা অব্যাহত
এদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলা টানা ১২তম রাতেও অব্যাহত ছিল। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি সৃষ্টির ইরানের সক্ষমতা আরও দুর্বল করতে তারা অভিযান চালিয়ে যাবে।
ইরানের গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র বুশেহরে দুটি দফায় একটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এলাকাটি ইরানের একমাত্র চালু বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছাকাছি। এতে দুই দিনে ওই এলাকায় হামলার সংখ্যা তিনটিতে দাঁড়ায়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, ইরাক সীমান্তের শালামচেহ সীমান্ত ক্রসিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন বলে খুজেস্তান প্রদেশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
ট্রাম্পের অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি
এর আগে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরান কোনো জাহাজে হামলা চালালে প্রতিবার একটি করে ইরানি সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করা হবে। এর জবাবে ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তাহলে ইরানি বাহিনী আঞ্চলিক তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে হামলা চালাবে। এমনকি ‘এক ফোঁটা তেলও’ রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
ইরানের পাল্টা হামলায় কুয়েতের গুরুত্বপূর্ণ পানি বিশুদ্ধকরণ ও জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত মাসের শেষ দিক থেকে দেশটিতে ৫৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৫৯২ জন আহত হয়েছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় না। তবে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত বেসামরিক অবকাঠামো আন্তর্জাতিক আইনের নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এদিকে, যুদ্ধে ১৮ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত এবং ৪৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
বুধবার ডেলাওয়্যারের ডোভার এয়ার ফোর্স বেসে ইরানের হামলায় নিহত চার মার্কিন সেনাসদস্যের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেন ট্রাম্প। অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে তিনি বলেন, ‘একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার জন্য এটি সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। কিন্তু এটি করতেই হবে।’
তবে পরে জর্জিয়ায় এক বক্তব্যে যুদ্ধের গুরুত্বকে তুলনামূলকভাবে হালকা করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এটাকে একটি ছোটখাটো সংঘর্ষ (স্কারমিশ) বলি।’
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরানের হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এবং হুথিদের বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে নতুন অবরোধের হুমকি একসঙ্গে কার্যকর হলে বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ একই সময়ে ঝুঁকির মুখে পড়বে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ, পরিবহনব্যবস্থা ও মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে বড় চাপ তৈরি হতে পারে।