বিগত ১৭ বছরের ‘রাজনীতিকরণের ধারা’ থেকে জনপ্রশাসনকে বের করে এনে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পক্ষপাতমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক করার তাগিদ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজেদের ‘শাসক’ না ভেবে জনগণের প্রকৃত ‘সেবক’ হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আজ রোববার সকালে রাজধানীর শাহবাগে বিসিএস প্রশাসন একাডেমি মিলনায়তনে ‘জাতীয় পাবলিক সার্ভিস দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক কর্মশালার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান।
‘দক্ষ, জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক জনপ্রশাসন: সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন কর্মকৌশল’ শীর্ষক চার দিনব্যাপী এই কর্মশালার আয়োজন করে বিসিএস প্রশাসন একাডেমি। উদ্বোধনী পর্বে স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন স্তরের উচ্চপদস্থ ও মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সিভিল সার্ভিস হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রধান চালিকাশক্তি। বিগত ১৭ বছরে দেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে যে রাজনীতিকরণ হয়েছে, তা থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।’
বর্তমান সরকারের প্রতি দেশের জনগণের সুউচ্চ প্রত্যাশা রয়েছে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সেই প্রত্যাশা পূরণের জন্য প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আবশ্যক। কেবল আনুষ্ঠানিকতার জন্য কোনো কর্মশালা বা কর্মসূচি গ্রহণ না করে, তার মাধ্যমে জনগণের জন্য প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করা উচিত।’
কর্মকর্তাদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা এ সমাজের সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত একটি অংশ। তাই নিজেদের শাসক মনে না করে জনগণের সেবক হিসেবে জনসেবায় আত্মনিয়োগ করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়মের বাইরে কোনো কার্যক্রম চালানো যাবে না। নির্বাচিত সরকারের যে নির্বাচনী ইশতেহার এবং ৩১ দফা অঙ্গীকার রয়েছে, যার ওপর জনগণ ম্যান্ডেট দিয়েছে, তা বিধি মোতাবেক বাস্তবায়ন করাই সরকারি কর্মকর্তাদের মূল দায়িত্ব।
এ সময় সঠিক নীতি বা পলিসি প্রণয়নের জন্য দেশের তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে পূর্ববর্তী সরকারের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বিগত রেজিমের সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেশের সব পরিসংখ্যান ধ্বংস করা হয়েছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিগত আমলে আদমশুমারি, কৃষি উৎপাদন কিংবা মাথাপিছু আয়ের মতো স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতেও ভুল তথ্য পরিবেশন করা হয়েছিল। দেশের সঠিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নীতি নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (বিবিএস) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্থায় রূপান্তর করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে কৃষি ও রেমিট্যান্স খাতকে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ারও কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখনও প্রধানত কৃষি ও কৃষকদের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। সে কারণে কেবল প্রচলিত কৃষির ওপর নির্ভর না করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের সমন্বয়ে ‘এগ্রো-ইন্ডাস্ট্রি’ বা কৃষিনির্ভর শিল্প গড়ে তোলার দিকে নজর দিতে হবে।
একই সঙ্গে দেশের বিশাল জনসংখ্যাকে দক্ষ করে তোলার জন্য সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ভোকেশনাল বা কারিগরি শিক্ষাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন সালাহউদ্দিন আহমদ। এ ছাড়া দেশের ক্রমবর্ধমান জন্মহার নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্থবির হয়ে থাকা পরিবার পরিকল্পনা (ফ্যামিলি প্ল্যানিং) বিভাগকে পুনরায় সক্রিয় করার বিষয়টিও সরকারের ভাবনায় রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হকের সভাপতিত্বে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিসিএস প্রশাসন একাডেমির রেক্টর (সচিব) মোহাম্মদ আলতাফ-উল-আলম। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সিপিটি) মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম।