ফিফা বিশ্বকাপের চলতি আসরের মধ্যেই বৈশ্বিক এই টুর্নামেন্টের সম্প্রসারণের কথা ভাবছে ফিফা। ২০৩০ সালের পরবর্তী আসরে আর ১৬টি দেশ বাড়িয়ে ৬৪ দলের আসরে রূপান্তর করার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংস্থাটির সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।
১৯৯৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপের মূল পর্বে ৩২ দল অংশ নিয়ে আসছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত আসরে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দলের অংশগ্রহণের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে দক্ষিণ আমেরিকার প্রভাবশালী নেতাদের একটি প্রতিনিধি দলের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাওয়ার পর। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ফিফা ২০৩০ সালের টুর্নামেন্টটি আরও বড় করার বিষয়ে আলোচনা করেছিল।
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সভাপতি ইনফান্তিনো নিশ্চিত করেছেন, এই গ্রীষ্মের টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর প্রস্তাবিত ফরম্যাটটি নিয়ে আলোচনা করা হবে। সুইস গণমাধ্যম ‘ব্লুউইন’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই বিশ্বকাপের পর সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোতে ৬৪ দলের টুর্নামেন্টের বিষয়টি অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে এবং আলোচনা করা হবে।
ফিফা সভাপতি আবারও জোর দিয়ে বলেন, এই টুর্নামেন্টটি পুরো বিশ্বের জন্য কেবল ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার জন্য নয়। তিনি আরও বলেন, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের স্বপ্ন দেখার সুযোগ প্রতিটি দেশেরই থাকা উচিত। আপনারা দেখছেন যে দলগুলোর খেলার মান অত্যন্ত উন্নত এবং সারা বিশ্বেই এই মান ক্রমশ আরও উন্নত হচ্ছে। ছোট দেশগুলোকে যদি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়া হয়, তবে নিজেদের উন্নতির ধারা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে তারা কোনো অনুপ্রেরণা পাবে না।
৫৬ বছর বয়সী এই কর্মকর্তা দাবি করেন, এবারের আসরে বিশ্বকাপকে ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে উন্নীত করার সিদ্ধান্তটি ছিল শতভাগ সফল। এর আগে ইনফান্তিনো এবং ফিফা চার বছরের পরিবর্তে প্রতি দুই বছর অন্তর বিশ্বকাপ আয়োজনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছিল, যদিও পরবর্তীতে সেই প্রস্তাবিত পরিবর্তনটি আর বাস্তবায়ন করা হয়নি।
ইনফান্তিনো আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার ‘প্রায় প্রতিদিনই’ যোগাযোগ হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, ট্রাম্প খুবই আনন্দিত এবং টুর্নামেন্টটি উপভোগ করছেন। সশরীরে কোনো ম্যাচ দেখতে না গেলেও ট্রাম্প টেলিভিশনে প্রায় প্রতিটি ম্যাচই দেখছেন।
৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের পক্ষে কারা?
২০২৫ সালের মার্চ মাসে ফিফা কাউন্সিলের এক সভায় উরুগুয়ের ফুটবল কর্মকর্তা ইগনাসিও আলোনসো প্রথম এই ধারণাটি প্রস্তাব করেন। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-কে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, সভার শেষ পর্যায়ে ‘অন্যান্য বিষয়’ আলোচনার সময় আলোনসো স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিলেন।
এরপর ওই বছরের নভেম্বরে কনমেবল-এর প্রেসিডেন্ট এবং ফিফার ভাইস-প্রেসিডেন্ট আলেহান্দ্রো ডোমিনগুয়েজ ২০৩০ সালের টুর্নামেন্টটিকে ৬৪ দলের আসর হিসেবে আয়োজনের বিষয়টিকে তার ‘স্বপ্ন’ বলে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন, এ ধরনের সম্প্রসারণ ‘বিশ্বকে অন্তত একবারের জন্য হলেও ঐক্যবদ্ধ করবে’।
২০৩০ সালের টুর্নামেন্টের ম্যাচ আয়োজনের ফলে দক্ষিণ আমেরিকা অন্তত ২০৪২ সাল পর্যন্ত আর বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পাবে না। কারণ ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, কোনো মহাদেশ প্রতি তিনটি আসরের মধ্যে কেবল একবারই বিশ্বকাপ আয়োজন করতে পারে।
এর অর্থ হলো ৬৪ বছরের দীর্ঘ সময়ে দক্ষিণ আমেরিকা মাত্র একটি বিশ্বকাপের (২০১৪ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত আসর) প্রধান আয়োজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। টুর্নামেন্টের পরিধি বাড়লে উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা এবং প্যারাগুয়ে প্রতিটি দেশই হয়তো কেবল একটি করে ম্যাচের পরিবর্তে একটি করে পূর্ণাঙ্গ গ্রুপের ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ পেতে পারে।
সম্প্রসারণের বিপক্ষে কারা?
৬৪ দলের টুর্নামেন্ট হলে ফিফার আওতাধীন ২১০টি পুরুষ আন্তর্জাতিক দলের মধ্যে এক-চতুর্থাংশের বেশি দল এতে অংশ নেবে, যার ফলে অনেক আঞ্চলিক বাছাইপর্বের প্রক্রিয়াই অর্থহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। ৪৮ দলের চূড়ান্ত পর্বের জন্য কনমেবল-এর ১০টি দেশের মধ্যে ৬টি দেশ ইতোমধ্যেই সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করে রেখেছে। এছাড়া প্লে-অফের মাধ্যমে আরও একটি দলের সুযোগ পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
গত এপ্রিলে উয়েফা সভাপতি আলেকজান্ডার সেফেরিন এই প্রস্তাবকে ‘বাজে ধারণা’ বলে নাকচ করে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এটি টুর্নামেন্ট এবং ইউরোপের বাছাইপর্ব উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হবে। উত্তর আমেরিকার সংস্থা কনকাকাফ -এর সভাপতি ভিক্টর মন্ট্যাগলিয়ানিও একই মত পোষণ করে বলেছেন, এটি ‘খুব একটা ভালো ধারণা নয়’।
উল্লেখ্য, ২০৩০ সালে তিনটি মহাদেশের ছয়টি দেশে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপ। এর মধ্যে উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে একটি করে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। বাকি সব ম্যাচ মরক্কো, পর্তুগাল ও স্পেনে অনুষ্ঠিত হবে।