মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা আলোচনাকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। পাকিস্তান, ওমান এবং অন্যান্য আঞ্চলিক পক্ষের মধ্যস্থতামূলক উদ্যোগে আলোচনা প্রক্রিয়াটি নতুন গতি পেয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ওমান থেকে আবারও পাকিস্তানে পৌঁছেছেন। তিনি এর আগে ইসলামাবাদ সফরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। আজ সোমবারও তাদের সঙ্গে পুনরায় বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে। সফর শেষে তার রাশিয়া যাওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
পাকিস্তান সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সম্ভাব্য নতুন পর্বে সহায়তা করতে ইসলামাবাদ সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করছে। পাকিস্তানের মতে, চলমান যোগাযোগ প্রমাণ করছে যে আলোচনার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভেস্তে যায়নি, বরং এটি ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে চলেছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য চুক্তির পথে কয়েকটি মৌলিক ইস্যু বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ, বিদেশে আটকে থাকা অর্থ ফেরত এবং বন্দর ও জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা।
যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধের দাবি জানালেও ইরান বলছে, এটি কেবল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সীমিত করা যেতে পারে। অন্যদিকে ইরানের প্রায় ৪০০ কেজি উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে।
ইরান তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার অর্থ ফেরতের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতির জন্য প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণের দাবি তুলেছে তেহরান।
বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে দুপক্ষের অবস্থান আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য এ অঞ্চলে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার ওপর জোর দিচ্ছে; অন্যদিকে ইরান বলছে তাদের বন্দরে অবরোধ প্রত্যাহার না হলে বিধিনিষেধ বহাল থাকবে।
ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) হুশিয়ারি দিয়ে বলেছে, নতুন কোনো আগ্রাসন হলে ‘প্রত্যাশার চেয়েও ভয়াবহ’ পাল্টা জবাব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে তারা কৌশলগত অবস্থান হিসেবে বর্ণনা করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত, তবে পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, আলোচনার পরিবর্তে এখন ফোনের মাধ্যমে কূটনৈতিক যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আলোচনাকে জটিল করে তুলছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এ ছাড়া হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নৈশভোজে শনিবার রাতে গুলিবর্ষণের ঘটনার পরও ইরান যুদ্ধ নিয়ে নিজের অবস্থানে অনড় থাকার ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, এ হামলা তাকে ইরান যুদ্ধে জয়ী হওয়া থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না।
এরই মধ্যে আরব সাগরে ইরানি জ্বালানিবাহী একটি জাহাজ আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের গ্লুস্টারশায়ারে অবস্থিত রয়্যাল এয়ার ফোর্স (আরএএফ) ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। বিমানঘাঁটিটি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। রবিবার ভোরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি সেবা সংস্থার বেশ কয়েকটি ইউনিট মোতায়েন করা হয়। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া রয়্যাল এয়ার ফোর্সের কোনো উড়োজাহাজের ক্ষতি হয়নি। তবে বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন বিমানবাহিনীর কী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা জানা যায়নি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এসব ঘটনা আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে, যা কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক এক জটিল সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। একদিকে পাকিস্তানসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর কূটনৈতিক উদ্যোগ আলোচনার সম্ভাবনা উন্মুক্ত রাখছে, অন্যদিকে পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালি ও নিষেধাজ্ঞা ইস্যুতে মতপার্থক্য সংকটকে আরও গভীর করছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে চলমান কূটনৈতিক তৎপরতা কতটা অগ্রগতি আনতে সক্ষম হবে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।