মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের ধোঁয়া ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক চরম আলটিমেটামে ইরানযুদ্ধ এখন এক ভয়ংকর ও বিপজ্জনক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া না হলে তিনি ইরানের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রÑ এমনকি সেতুগুলোও পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, এই হামলায় যদি ‘পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়’, তবু তিনি তা তোয়াক্কা করেন না বলে দাম্ভিক হুংকার দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইনে বেসামরিক স্থাপনায় এ ধরনের হামলা ‘যুদ্ধাপরাধ’ হলেও সে বিষয়ে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের কাছে মাথা নোয়াতে নারাজ তেহরান। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সাফ বলে দিয়েছেন, আমেরিকাকে প্রতিহত করতে প্রয়োজনে শহীদ হওয়ার জন্য প্রস্তুত পুরো জাতিÑ তথা এক কোটি ৪০ লাখ জনতা।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর আকস্মিক ও একতরফা সামরিক আগ্রাসন শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন ভেবেছিল, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে ইরানকে নিজের পায়ের তলায় পিষতে পারবে। কিন্তু তেরহান পশ্চিমাদের পদতলে লুটিয়ে পড়েনি। নতুন সর্বোচ্চ নেতা, খামেনিপুত্র আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে উল্টো শিরদাঁড়া সোজা রেখে অপ্রতিরোধ্য প্রত্যাঘাত করে যাচ্ছে তারা।
কিন্তু নাকাল ট্রাম্প প্রতিদিন ইরানযুদ্ধ নিয়ে একঝুড়ি করে মিথ্যা দাবি প্রচার করেন এবং কথায় কথায় বেপরোয়া সব হুমকি-ধমকি দেন। পুরো ইরানি সভ্যতাকে ধ্বংস করার হুমকি দেওয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়Ñ জ্বালানি স্থাপনায় হামলা যে যুদ্ধাপরাধ, সে বিষয়ে তিনি কী বলবেন। অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সুরে ট্রাম্প জবাব দেনÑ ‘আমি এসব নিয়ে মোটেও চিন্তিত নই। জানেন, আসল যুদ্ধাপরাধ কী? ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়াই হলো সবচেয়ে বড় যুদ্ধাপরাধ।’ ট্রাম্পের মতে, এসব স্থাপনায় হামলা করা হলে ইরানের সাধারণ মানুষের কষ্ট হবে ঠিকই, কিন্তু ‘স্বাধীনতার জন্য এইটুকু কষ্ট তো তাদের সইতেই হবে।’ সুযোগ পেলে তিনি ইরানের সব তেলসম্পদ দখল করে বিপুল অর্থ আয় করতেন বলেও মন্তব্য করেন।
ট্রাম্পের এই আগ্রাসী ও বেপরোয়া হুমকির পর খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই তুমুল সমালোচনার ঝড় উঠেছে। নিজ দলের নেতারাও তার এমন ‘উন্মাদ ও বিকারগ্রস্ত’ আচরণের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছেন। ডেমোক্র্যাট দলের শীর্ষ সিনেটর চাক শুমার ট্রাম্পকে ‘মারাত্মক অসুস্থ মানুষ’ বলে আখ্যায়িত করে বলেছেন, ট্রাম্পের এই অযাচিত যুদ্ধের পরিণাম রিপাবলিকানদেরই বইতে হবে। ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মার্ফি ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে ‘হাজার হাজার নিরীহ ইরানিকে হত্যার’ চক্রান্ত বলে উল্লেখ করেছেন।
এমনকি ট্রাম্পের একসময়ের কট্টর সমর্থক ও রিপাবলিকান নেতা মার্জোরি টেইলর গ্রিন এবং ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের সাবেক পরিচালক অ্যান্টনি স্ক্যারামুচি এই চরম ধ্বংসাত্মক নীতির বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন। তারা সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগ করে ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে অবিলম্বে সরানোর দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেন, আমেরিকার বুকে একটি বোমাও আঘাত হানেনি, অথচ আমরা একটি পুরো সভ্যতাকে ধ্বংস করে দিতে চাইছি! এটি কোনোভাবেই আমেরিকাকে মহান করবে না, এটি স্রেফ একটি শয়তানি ও পাগলামি। সাবেক শীর্ষ সন্ত্রাসবাদবিরোধী কর্মকর্তা জো কেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্পের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত খোদ আমেরিকার অস্তিত্বকেই সংকটে ফেলবে ও বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার পরাশক্তি তকমা মুছে দেবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এই রক্তচক্ষু ও সভ্যতা ধ্বংসের হুমকির জবাবে ইরানও কড়া ভাষায় প্রত্যাঘাতের কথা জানিয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সামাজিক মাধ্যম এক্সে বীরদর্পে ঘোষণা করেছেনÑ ‘১ কোটি ৪০ লাখের বেশি গর্বিত ইরানি নিজেদের দেশ রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। আমি ছিলাম, আছি এবং ভবিষ্যতেও ইরানের সুরক্ষায় নিজের জীবন বিলিয়ে দেব।’
যুদ্ধের এই আগুন শুধু ইরান আর যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নেই; এর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে আটলান্টিকের ওপারে যুক্তরাজ্যেও। ট্রাম্পের সভ্যতা ধ্বংসের হুমকির পর যুক্তরাজ্যের লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা এড ডেভি সতর্ক করে বলেছেন, ব্রিটিশ মাটি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে যদি ইরানে হামলা চালাতে দেওয়া হয়, তবে যুক্তরাজ্যও এই ‘যুদ্ধাপরাধের সহযোগী’ হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি অবিলম্বে ব্রিটিশ বিমানঘাঁটিগুলোতে মার্কিন প্রবেশাধিকার বন্ধ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা আরও জোরদার হয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সদম্ভে ঘোষণা করেছেন, তারা ইরানের একাধিক সেতু ও রেলপথে মারাত্মক হামলা চালিয়েছেন। এর আগে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইরানিদের ট্রেন বা রেলপথ ব্যবহার না করার জন্য কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছিল। অন্যদিকে, ট্রাম্পের আলটিমেটাম শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি টার্মিনাল খার্গ দ্বীপের সামরিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালিয়েছে।
যুদ্ধের এই দাবানল থেকে রক্ষা পায়নি তুরস্কও। ইস্তানবুলে ইসরায়েলি কনসুলেটের সামনে এক বন্দুকযুদ্ধে এক হামলাকারী নিহত ও আরও দুজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় পুলিশের দুই সদস্যও আহত হয়েছেন। তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই হামলাকারীদের সঙ্গে ধর্মভিত্তিক একটি সংগঠনের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
ট্রাম্পের আলটিমেটাম শেষ হওয়ার আগেই মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোÑ বিশেষ করে পাকিস্তানÑ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তির জন্য শেষ মুহূর্তের মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। ইরান আগে ৪৫ দিনের একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি দাবি করেছিল।