২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করেন, তখন এর লক্ষ্য ছিল সুনির্দিষ্ট : ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস, নৌবাহিনী গুঁড়িয়ে দেওয়া ও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ঠেকানো। এক মাসের বেশি সময় পর যুদ্ধের পঞ্চম সপ্তাহে এসে সেই লক্ষ্যগুলো বারবার বদলাচ্ছে, আর ট্রাম্পের কথায় প্রকাশ পাচ্ছে চরম স্ববিরোধিতা।
কখনও তিনি বলছেন, তেলের সঙ্গে এই যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই; আবার পরক্ষণেই বলছেন, ‘তেল দখল করে ভাগ্য ফেরাতে হবে’। কখনও যুদ্ধ শেষের দাবি করছেন, আবার কখনো অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দিচ্ছেন। হরমুজ প্রণালি নিয়েও কখনও বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র সহজেই এটা খুলে দেবে, আবার কখনও বলছেন, অন্য দেশগুলোকে নিজেদের দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে হবে। গত এক সপ্তাহে ট্রাম্পের এই বারবার সুর বদলের চিত্র এক প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে দ্য গার্ডিয়ান।
২৯ মার্চ : ‘আলোচনা দারুণ হচ্ছে’, তবে খার্গ দ্বীপ দখলের হুমকি
এয়ারফোর্স ওয়ানে বসে ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, কূটনৈতিক তৎপরতা ভালোই এগোচ্ছে। পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা দাবির বেশির ভাগই ইরান মেনে নিয়েছে। সদিচ্ছার প্রমাণ হিসেবে তারা যুক্তরাষ্ট্রে তেল পাঠিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে একই দিনে ফিন্যান্সশিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানের তেল নিতে চান এবং খার্গ দ্বীপ দখলের কথা ভাবছেন, যেখান দিয়ে ইরানের ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়।
৩০ মার্চ : ‘ব্যাপক অগ্রগতি’ বনাম সম্পূর্ণ ধ্বংসের হুমকি
ট্রাম্প তার সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেন, ইরানের ‘নতুন ও তুলনামূলক যৌক্তিক সরকারের’ সঙ্গে তাদের ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’ চলছে ও এতে ‘ব্যাপক অগ্রগতি’ হয়েছে। তবে একই পোস্টে তিনি হুমকি দেন, শিগগিরই কোনো চুক্তি না হলে এবং হরমুজ প্রণালি ‘অবিলম্বে’ খুলে দেওয়া না হলে ইরানের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেলের খনি, খার্গ দ্বীপÑ এমনকি সব পানি শোধনাগার ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
৩১ মার্চ : ‘শিগগির ফিরব’ ও ইউরোপের সমালোচনা
যুক্তরাষ্ট্রে যখন জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারে ঠেকেছে, তখন ট্রাম্প সাংবাদিকদের সামনে যুদ্ধ থেকে সরে আসার এক নতুন বার্তা দেন। হরমুজ প্রণালি খোলার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে তিনি বলেন, ‘আমার কাজ শুধু ইরান থেকে বেরিয়ে আসা, আর আমরা শিগগিরই তা করব… হয়তো দুই বা তিন সপ্তাহের মধ্যে।’ প্রণালিটির বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘ফ্রান্স বা অন্য কোনো দেশ তেল-গ্যাস চাইলে তারাই ওই হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিয়ে আসুক।’ এ ছাড়া যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় মিত্রদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আর তাদের সাহায্য করবে না। একই দিন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও ব্রিটিশ নৌবাহিনীকে কটাক্ষ করে কথা বলেন।
১ এপ্রিল : যুদ্ধবিরতির ‘আহ্বান’ ও ‘পাথর যুগে’ পাঠানোর হুমকি
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের আগে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ইরানের নতুন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধবিরতির ‘আহ্বান’ জানিয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালি খুলে না দেওয়া পর্যন্ত ইরানকে বোমাবর্ষণ করে ‘পাথর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেন তিনি। সেদিন সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, তাদের কৌশলগত লক্ষ্য প্রায় অর্জনের পথে। তিনি আগামী ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গুঁড়িয়ে দিয়ে দেশটিকে ‘পাথর যুগে’ পাঠানোর হুমকি দেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, এ যুদ্ধের সঙ্গে তেলের কোনো সম্পর্ক নেই, কারণ যুক্তরাষ্ট্র এখন আর মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল নয়।
২ এপ্রিল : ‘এরপর সেতু, তারপর বিদ্যুৎকেন্দ্র’
মার্কিন হামলায় তেহরান ও কারাজের সংযোগকারী বি-১ সেতু ধ্বংস ও আটজন নিহতের ঘটনার পর ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালের একটি ভিডিও পোস্ট করেন। তিনি লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইরানে ধ্বংসযজ্ঞ শুরুই করেনি। এরপর সেতু ধ্বংস করা হবে, তারপর বিদ্যুৎকেন্দ্র!’
৩ এপ্রিল : ‘তেল নাও, ভাগ্য ফেরাও’
ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প এদিন লেখেন, ‘আর একটু সময় পেলে আমরা সহজেই হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে পারব, তেল নিতে পারব এবং ভাগ্য ফেরাতে পারব। এটি কি বিশ্বের জন্য একটি তেলের খনি হবে?’
মাত্র তিন দিন আগে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেছিলেন, তেলের সঙ্গে এ যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই। আর তিন দিন পরই তার এমন উল্টো সুর মার্কিন প্রশাসনের উদ্দেশ আর পরিকল্পনার চরম স্ববিরোধিতাকেই আবার বিশ্বের সামনে তুলে ধরল।