সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬, ০২:৩৪ পূর্বাহ্ন

ফের পদত্যাগের মিছিল এনসিপিতে

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৬
  • ৯ বার

ভোটের মাঠের সমীকরণ মেলাতে গিয়ে এখন খোদ ঘরের মাঠই হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী আসন সমঝোতার সিদ্ধান্তটিই যেন দলটির জন্য ‘কাল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচন ঘিরে শুরু হওয়া পদত্যাগের ঢেউ যেন এখন সুনামিতে পরিণত হয়েছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল—সর্বস্তরেই পড়েছে দল ছাড়ার হিড়িক, যা দলটির সাংগঠনিক অস্তিত্বকে সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

এনসিপির তৃণমূল ও মধ্যম সারির নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট বা সমঝোতাকে সহজভাবে নিতে পারেনি। দলের

আদর্শিক বিচ্যুতি এবং রাজনৈতিক কৌশলে বড় ধরনের ভুল হয়েছে বলে মনে করছেন পদত্যাগীরা। ফলে ভোটের আগে যে অসন্তোষের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছিল, নির্বাচনের পর তা প্রকাশ্যে যেন পদত্যাগের মিছিলে রূপ নিয়েছে। এমনকি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক পূর্ণাঙ্গ কমিটির নেতারা একযোগে পদত্যাগ করছেন। আর পদত্যাগীদের বড় একটি অংশ বসে থাকছে না; তারা পুরোনো দল ছেড়ে অন্য রাজনৈতিক দলে যোগ দিচ্ছেন, যা এনসিপির সাংগঠনিক কাঠামোকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।

নির্বাচন-পরবর্তী এ বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পদত্যাগ করা প্রভাবশালী নেতাদের ফিরিয়ে আনতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে যোগাযোগ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতারা সরাসরি বৈঠক করে ভুল বোঝাবুঝি দূর করার এবং ভবিষ্যতে দল পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা, পদত্যাগীদের অনেকেই সিদ্ধান্তে থাকছেন অনড়।

জামায়াতের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ঘোষণার আলোচনার মধ্যেই প্রথমেই পদত্যাগ করেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব, আলোচিত চিকিৎসক ও সমাজকর্মী ডা. তাসনিম জারা। তিনি দলটির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ছিলেন। সমঝোতার আলোচনা চলার মধ্যে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সমর্থন জানিয়ে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন দলে জামায়াতবিরোধী অংশের নেতা হিসেবে পরিচিত মীর আরশাদুল হক। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। পদত্যাগ করা অন্য কেন্দ্রীয় নেতারা হলেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ ও তাজনূভা জাবীন, মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন, আইসিটি সেলের প্রধান ফরহাদ আলম ভূঁইয়া, যুগ্ম সদস্য সচিব আরিফ সোহেল, যুগ্ম সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন, উত্তরাঞ্চলের সংগঠক আজাদ খান ভাসানী, দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক ওয়াহিদুজ্জামান, উত্তরাঞ্চলের সংগঠক দ্যুতি অরণ্য চৌধুরী, সদস্য সৈয়দা নীলিমা দোলা, আসিফ মোস্তফা জামাল, মীর হাবীব আল মানজুর, মারজুক আহমেদ ও আল আমিন টুটুল।

দল ছাড়া নেতাদের অভিযোগ, এনসিপি নতুন বন্দোবস্তের কথা বললেও বাস্তবে পুরোনো ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার অংশীজনের সঙ্গে আপস করেছে। এনসিপি তার মূল লক্ষ্য থেকে সরে গেছে।

এনসিপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, অনেকেই ভুল বুঝে দল থেকে পদত্যাগ করেছে। কেউ কেউ অভিমান করেছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। দলের পক্ষ থেকে যোগাযোগের জন্য নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যারা ফিরবেন তাদের সর্বোচ্চ সম্মান জানানো হবে।

তবে এনসিপির শীর্ষ পর্যায় থেকে নেতাদের ফেরানোর উদ্যোগ নিলেও তা খুব বেশি কাজে আসছে না। এখনো পর্যন্ত ফেরেননি পদত্যাগ করা কোনো নেতা। উল্টো বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা কমিটির নেতাদের পদত্যাগের হিড়িক দেখা গেছে। কেউ কেউ বিএনপি কিংবা জামায়াতে যোগ দিয়েছেন, কেউবা নতুন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার এনসিপির চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক আলাউল হকসহ চার নেতা দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। তারা দলের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান বলে জানিয়েছেন। পরে পদত্যাগপত্রের অনুলিপি চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রেস ক্লাবে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে দেওয়া হয়। পদত্যাগ করা অন্য তিন নেতা হলেন এনসিপির জেলা শাখার সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব নাজমুল হুদা খান, যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ ওলিউল ইসলাম ও যুগ্ম সদস্য সচিব সৈয়দ কিবরিয়া।

পদত্যাগ করা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শাখার সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব নাজমুল হুদা খান কালবেলাকে বলেন, পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে তারা এনসিপিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে সেই আশা–আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। তাই তারা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেছেন এনসিপির রংপুর জেলা কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব শেখ রেজওয়ান। গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে দলের সব পদ ও দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি।

পদত্যাগের বিষয়ে শেখ রেজওয়ান গণমাধ্যমকে বলেন, এনসিপির রংপুর জেলা ও মহানগর কমিটির নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিদের আনা হয়েছে, যারা জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তার দাবি, যারা জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের লোক ছিল তারা নেতৃত্বে এসেছে।

তিনি আরও বলেন, বিপ্লবীদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টিতে যারা বিপ্লবের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না, তাদের মাধ্যমে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব নয়। জেলা কমিটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিয়েও অভিযোগ তোলেন।

এর আগে গত ১১ জানুয়ারি বাগেরহাটে দলটির ১২ জন নেতা একযোগে পদত্যাগ করেন। বাগেরহাট প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সদর উপজেলা এনসিপির প্রধান সমন্বয়কারী মো. আলী হোসেন আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। পদত্যাগকারী অন্য নেতারা হলেন সদর উপজেলা এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়কারী কাজী মাহফুজুর রহমান, এনসিপির বাগেরহাট সদর উপজেলা সদস্য আশিকুর রহমান (সুমন), শেখ রাসেল, শেখ মিজানুর রহমান, মো. হাসান শেখ, মো. শহিদুল ইসলাম, শেখ জাহিদুল ইসলাম, শেখ নাবিল হোসেন, মো. জনি, মুনিয়া আক্তার জেনি ও মো. রাতুল আহসান।

সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির বাগেরহাট সদর উপজেলার প্রধান সমন্বয়কারী ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য মো. আলী হোসেন বলেন, ‘২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে যে অঙ্গীকার ও নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এনসিপি গঠিত হয়েছিল, বর্তমান প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক সমীকরণে সেই অঙ্গীকারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যতা দেখা যাচ্ছে।’

গত বৃহস্পতিবার নীলফামারীতে এনসিপির তিন নেতা দলত্যাগ করে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে নীলফামারী জেলা জামায়াতের আলোচনা সভায় এ যোগদানের ঘোষণা দেওয়া হয়। যুগ্ম আহ্বায়ক মো. খয়রাত হোসেন শাহর নেতৃত্বে এনসিপির নীলফামারী জেলা শাখা থেকে পদত্যাগ করে তারা জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। জামায়াতে সদ্য যোগদানকারী আরও দুই সদস্য হলেন যুগ্ম সদস্য সচিব মো. শাহ আলম চৌধুরী এবং যুগ্ম সদস্য সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।

এর আগে চলতি বছরের শুরুতে (৫ জানুয়ারি) খাগড়াছড়িতে এনসিপির তিনশর বেশি নেতাকর্মী বিএনপিতে যোগ দেন। এনসিপি খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব ত্রিপুরার নেতৃত্বে তারা বিএনপিতে যোগ দেন। পরে নবাগত সদস্যদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেন জেলা বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা।

বিপ্লব ত্রিপুরা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে থেকেই তারা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা আশা করেছিলেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি সাধারণ মানুষের পক্ষে দাঁড়াবে এবং ন্যায়ের পক্ষে রাজনীতি করবে। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে দলটি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একটি রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে অবস্থান নেওয়ায় তারা হতাশ হয়েছেন।

পদত্যাগ করা নেতাদের ফেরানোর বিষয়ে কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার কালবেলাকে বলেন, ‘অনেকের সঙ্গেই কথা হচ্ছে। তারা (পদত্যাগী) তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন। দল তাদের বিষয়ে ইতিবাচক আছে। যে কোনো সময় তারা ফিরতে পারেন।’

একই ধরনের আশাবাদের কথা জানালেন এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক মোহাম্মদ আতাউল্লাহ। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘রাজনীতিতে নতুন হওয়ায় অনেকেই বিষয়টি না বুঝেই পদত্যাগ করতে পারে। আমরা আশা করি, তারা এনসিপিতেই ফিরে আসবেন।’

এ প্রসঙ্গে দলটির কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘যারা পদত্যাগ করেছেন, তাদের বিষয়টি আমাদের আহত করেছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তাদের জন্য সবসময় দরজা খোলা।’

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ