শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ১২:১৯ অপরাহ্ন

অবৈধ বাণিজ্য রুখতে বাড়ছে প্রযুক্তিনির্ভরতা

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ০ বার
দেশে সিগারেটের অবৈধ বাজারের বিস্তার রোধ এবং থমকে যাওয়া রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে গতি ফেরাতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সিগারেট খাতে শুধু কর বা মূল্যবৃদ্ধি নয়, বরং কাঠামোগত সংস্কার ও আধুনিক প্রযুক্তি চালুর কৌশল নেওয়া হয়েছে।

কর ফাঁকি দিয়ে তৈরি নকল ও চোরাচালানের সিগারেটের কারণে সরকার বছরে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আগামী অর্থবছরে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ প্রযুক্তি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বছরে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব আদায় সম্ভব।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ কঠোরভাবে তদারকি করতে এবং রাজস্ব ফাঁকি রোধে কয়েকটি নতুন ব্যবস্থার কথা বলেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ প্রযুক্তি।

উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর নজরদারি বাড়াতে এই পদ্ধতি প্রণয়ন করা হবে। তামাকপণ্যের  উৎপাদন ও সরবরাহ কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য কারখানায় কাউন্টিং ডিভাইস এবং অত্যাধুনিক এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। সিগারেটের স্ট্যাম্পে কিউআর বা এআর কোড যুক্ত করা হবে। এ ছাড়া রয়েছে হুইসেলব্লোয়ার সিস্টেম, সাধারণ মানুষ যাতে অবৈধ সিগারেটের তথ্য দিতে পারে, সেজন্য একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ তৈরি করা হবে এবং তথ্য প্রদানকারীকে পুরস্কৃত করা হবে।
প্রস্তাবিত বাজেটে সিগারেটের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ শুধু সিগারেটের দাম আরও বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন, আবার কেউ বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও অবৈধ সিগারেট বাণিজ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপকে বাস্তবমুখী বলে উল্লেখ করছেন।গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনসাইট মেট্রিক্সের তথ্যে বলা হয়েছে, দেশের মোট সিগারেট বাজারের ১৩ থেকে ১৮ শতাংশ অবৈধ পণ্যের দখলে রয়েছে। এর ফলে সরকার বছরে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বৈধ সিগারেট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৮৪ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন শলাকা।

পরবর্তী অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৬৫ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন শলাকায়। এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন শলাকার এই ঘাটতির বড় অংশ অবৈধ বাজারে স্থানান্তরিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম গড়ে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ, মধ্যস্তরের সিগারেটের দাম ৬ দশমিক ২ শতাংশ এবং উচ্চ ও প্রিমিয়ামস্তরের সিগারেটের দাম ৮ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ ধূমপায়ী নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এই শ্রেণির ভোক্তাদের ওপর বেশি পড়ে। ফলে নিম্নস্তরের মূল্যবৃদ্ধি পেলেই তারা কম দামি নকল ও অবৈধ সিগারেটের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কর বৃদ্ধি ছাড়াও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। মরক্কোসহ কয়েকটি দেশে ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস পদ্ধতি চালুর পর অবৈধ সিগারেটের বাজার উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। বাংলাদেশে প্রযুক্তিটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

প্রাক-বাজেট আলোচনায় এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, ‘বিদ্যমান ব্যান্ডরোল বা স্ট্যাম্পব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হবে। এর অংশ হিসেবে স্ট্যাম্পের রং, আঠার প্রযুক্তি ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আনা হবে, যাতে তা সহজে নকল বা অপসারণ করা না যায়। একই সঙ্গে প্রতিটি প্যাকেটে অটোমেটেড কিউআর কোড বা অনুরূপ ডিজিটাল শনাক্তকারী কোড যুক্ত করা হবে। যে-কেউ চাইলে এ কোড স্ক্যান করে যাচাই করতে পারবেন পণ্যে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে কি না। কেউ কর ফাঁকির প্রমাণ দিয়ে আমাদের তথ্য দিলে তার জন্য বড় অঙ্কের পুরস্কারের ব্যবস্থাও রাখা হবে।’

আবদুর রহমান খান আরও বলেন, ‘উৎপাদন পর্যায় থেকেই এ কোডিংব্যবস্থা চালু থাকবে এবং কারখানা থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহশৃঙ্খল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা হবে। অবৈধ সিগারেট উৎপাদন বা বিপণনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ