একসময় বাড়িটির ফটকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতেন নেতা-কর্মীরা। কখন বের হবেন এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন কিংবা তাঁর পরিবারের কেউ, তখন একটা সালাম দেবেন। পদ পেতে কেউ নেবেন পায়ের ধুলো। এমন অনেক ঘটনার নীরব সাক্ষী তিনতলা বাড়িটি।
কে দলের মনোনয়ন পাবেন, কোন ঠিকাদার পাবেন কাজ, কার পদোন্নতি হবে, কে পাবেন চাকরি, দলীয় কোন কর্মসূচি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে—এর সবই ঠিক হতো রাজশাহী উপশহরের এই বাড়িটি থেকে। পছন্দের পদে বসতে সরকারি কর্মকর্তারাও ছুটতেন এ বাড়িতে। সেই বাড়ি আজ ধ্বংসস্তূপ। নেই রাজনৈতিক বৈঠক, নিরাপত্তাবলয় কিংবা নেতা-কর্মীদের ভিড়।
ভাঙা দেয়াল, পোড়া কক্ষ, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ইট-পাথর আর ময়লার স্তূপের মধ্যে বসছে মাদকসেবীদের আসর। একসময় রাজশাহীতে ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠা বাড়িটির এমন করুণ অবস্থা এখন।
বাড়ির মালিক এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য। তিনি জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামানের ছেলে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের দিনও তিনি ছিলেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র। বাসায় যে সাক্ষাৎকক্ষে তিনি বসতেন, সেখানে এখন পড়ে আছে গাঁজা-ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম।
প্রতিবেশীরা জানান, আওয়ামী লীগের শাসনামলে এ বাড়িতে খায়রুজ্জামান লিটন, স্ত্রী শাহীন আক্তার রেণী এবং মেয়ে ডা. আনিকা ফারিহা জামান থাকতেন। বাড়িটি এখন পথচারী-ভবঘুরেরা ব্যবহার করছেন উন্মুক্ত শৌচাগার হিসেবে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়ির ভেতরের প্রায় প্রতিটি কক্ষই নোংরা ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সিঁড়ি ও মেঝেতে পুরোনো কাপড় বিছিয়ে মাদকসেবীদের বসার জায়গা বানানো হয়েছে। পড়ে আছে মাদক সেবনের নানা সরঞ্জাম। দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে লেখা রয়েছে নানা বার্তা।
সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের সুপারভাইজার কাশমি খানসহ কয়েকজন বসে ছিলেন বাড়ির সামনে ভাঙা প্রাচীরের ওপর। কাশমি খান বলেন, ‘মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই বাড়িটির এই অবস্থা হয়েছে। এখন এটি মাদকসেবীদের আড্ডা ও ভবঘুরেদের ব্যবহৃত স্থানে পরিণত হয়েছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন শেখ বলেন, ‘রাজশাহীর রাজনীতিতে একসময় এই বাড়িতে প্রবেশ করাই ছিল অনেকের কাছে স্বপ্ন। আজ সেই বাড়িতে অবাধে ঢুকছে মাদকসেবী আর ভবঘুরেরা। ক্ষমতার পালাবদলে এটি এখন পরিণত হয়েছে ধ্বংসের প্রতীকে।’ তিনি বলেন, ‘রাজনীতি করতে হয় মানুষের জন্য। তাহলে মানুষের কোনো ক্ষোভ থাকে না। যে রাজনীতি করলে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়, তেমন রাজনীতি না করাই ভালো। তা না হলে আজ এই বাড়ির পরিণতি এমন হয়েছে, কাল আরেক বাড়িরও একই হাল হবে।’
বাড়িটি রাজশাহীর অভিজাত এলাকায়। ২০ গজ দূরেই রয়েছে উপশহর পুলিশ ফাঁড়ি। তারপরও সন্ধ্যার পর তো বটেই, দিনের বেলাতেও বাড়ির ভেতর থেকে গাঁজার গন্ধ পাওয়া যায়। ইয়াবা ও হেরোইন সেবনও চলে। স্থানীয়রা বলছেন, এলাকার পরিবেশ নষ্ট হলেও পদক্ষেপ নেয় না পুলিশ।
এ বিষয়ে উপশহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহ আলম বলেন, ভবনটিতে মাদকসেবীরা আসে, এ বিষয়টি তাঁদের জানা আছে। পুলিশ নজরদারি করে। তবে তারা অল্প সময় অবস্থান করে চলে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয় না।