বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১১:২৩ পূর্বাহ্ন

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা খাদের কিনারে

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা খাদের কিনারে পৌঁছে গেছে, এমন আশঙ্কা আর কেবল বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধ নেই, বাস্তবতাও এখন সেই সতর্কবার্তা দিচ্ছে। মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর এক সপ্তাহ ধরে সারাদেশে যে তীব্র গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে, তাতে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন পর্যন্ত বিপর্যস্ত। একটি মাত্র অবকাঠামো বিকল হয়ে পড়তেই জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত বিকল্প অবকাঠামোর অভাব; সব মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকার যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিকল্প এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে যোগাযোগ অব্যাহত রাখলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংকটের দ্রুত সমাধান সহজ নয়; বরং এটি দেশের জ্বালানি পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা কৌশল পুনর্বিবেচনার কঠিন প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রায় এক দশক আগে থেকে শুরু হওয়া জ্বালানি নিরাপত্তার শঙ্কা এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনালে শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার পর ভয়াবহ সংকটে পড়ে গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থায়। এ ছাড়া রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়েছে। সিএনজিচালিত গণ-পরিবহন থমকে গেছে। সিএনজি গাড়ির ওপর আয়ে নির্ভরশীল মানুষের আয় কমে গেছে। এ ছাড়া আবাসিক এলাকাগুলোতেও রান্নার গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে অনেক পরিবার বিকল্প ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হচ্ছে। ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করে রান্না করছে। অর্থাৎ দেশে গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাপক সংকট তৈরির ফলে প্রায় প্রতিটি খাত নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের আয় এবং অর্থনীতিতে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি মাত্র অবকাঠামোর দুর্ঘটনায় যদি দেশের শিল্প, পরিবহন ও আবাসিক খাতে এমন বিপর্যয় নেমে আসে, তাহলে সেটি শুধু সাময়িক সংকট নয়; বরং দেশের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। এমন ভঙ্গুর চিত্র দেখলে দেশি-বিদেশি কোনো বিনিয়োগই আসবে না। ফলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ সংকুচিত হবে।

শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত, বাড়ছে অর্থনৈতিক ক্ষতি

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে রপ্তানিমুখী শিল্পে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, কাচ, স্টিল, সার ও অন্যান্য গ্যাসনির্ভর শিল্পে উৎপাদন কমে গেছে। অনেক কারখানায় গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। শিল্পমালিকদের বিভিন্ন সংগঠনগুলো বলছে, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু উৎপাদন নয়, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সরকারের সামনে তাৎক্ষণিক সমাধানের সীমাবদ্ধতা

জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ এবং দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাব্য সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। তবে জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি কিনতে চাইলেই তা সঙ্গে সঙ্গে দেশে আনা সম্ভব নয়। স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ, জাহাজের প্রাপ্যতা, পরিবহন, পুনর্গ্যাসীকরণ এবং জাতীয় গ্রিডে সরবরাহÑ সব মিলিয়ে এটি সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া। এ ছাড়া বাংলাদেশে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার রয়েছে। চাইলেই আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন না করে বেশি পরিমাণ এলএনজি আমদানি সম্ভব নয়। জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে সরকার অন্তত একটি টার্মিনাল দ্রুত গতিতে স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে পুরনো ভাসমান টার্মিনাল হলেও আনার চেষ্টা করছে। তবে সেটাও সময়সাপেক্ষ বিষয়। সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করলেও জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান করা কঠিন মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। ফলে বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান খুব সহজ নয় বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

বাংলাদেশে বর্তমানে আমদানিকৃত এলএনজি জাতীয় গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ পূরণ করছে। কিন্তু এই সরবরাহ মূলত সীমিতসংখ্যক ভাসমান টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল। মাত্র দুটি টার্মিনাল দিয়ে সর্বোচ্চ ১১শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রতিদিন সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। অন্যদিকে দেশি উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলন প্রতিনিয়ত কমছে। ফলে গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো একটি টার্মিনাল রক্ষণাবেক্ষণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা দুর্ঘটনার কারণে বন্ধ হয়ে গেলে পুরো গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাই বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। তাদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প অবকাঠামো, পর্যাপ্ত ব্যাকআপ সক্ষমতা এবং বহুমুখী সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

কমছে দেশীয় গ্যাস, বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা

একসময় দেশের গ্যাসের প্রায় পুরো চাহিদাই দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পূরণ হতো। কিন্তু পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় এখন আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, গত এক দশকে নতুন বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের গতি আশানুরূপ হয়নি। একই সময়ে শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে গ্যাসের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে দেশীয় উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বড় হচ্ছে।

সরকার ইতোমধ্যে নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল (ল্যান্ড-বেইজড টার্মিনাল) স্থাপন, দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি চুক্তি, গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং স্থলভাগে নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। এ ছাড়া বঙ্গোপসাগরে অফশোর ব্লকে আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল এলএনজির ওপর নির্ভর করে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাদের মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ ও গ্যাস বাণিজ্য, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিল্পে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মতো সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত রিজার্ভ সক্ষমতা, বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার কার্যকর পরিকল্পনা গড়ে তোলারও পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

বর্তমান সংকট শুধু কয়েক দিনের গ্যাস সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাকে সামনে এনে দিয়েছে। একটি টার্মিনালে দুর্ঘটনা ঘটতেই শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, আবাসিক জীবন এবং সামগ্রিক অর্থনীতি চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন কেবল নতুন এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, অবকাঠামোর বহুমুখীকরণ, পর্যাপ্ত ব্যাকআপ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত জ্বালানি নীতি বাস্তবায়নই হতে পারে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ।

বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিকেএমইএর সভাপতি মো. হাতেম। তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস সংকটের কথা সরকারের দায়িত্বশীলদের বলে আসছি। আমাদের ব্যবসায়ীরা পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ার কারণে নানামুখী সংকটে পড়েছে। কারখানা বন্ধ থাকার ফলে ক্রেতাদের নিয়মিত অর্ডার সরবরাহ করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, এতে কেবল কারখানার মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো দেশ। তিনি বলেন, আমরা আশা করব সরকার দ্রুত গ্যাস এবং জ্বালানি সংকটের সমাধান করবে।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গণমাধ্যমকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী ইতোপূর্বে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটে তাদের সহযোগিত চেয়ে । এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে এলএনজি, জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রেখে সংকট সমাধানের।

এদিকে দেশের চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি সচিবালয়ে এক সভা শেষে সাংবাদিকদের উদ্দেশ বলেছেন, জ্বালানি সংকট দ্রুত কোনো সমাধানের সম্ভাবনা নেই। তবে সমাধানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে সরকার।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ