রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন

বদলে যাচ্ছে বাণিজ্যের হিসাব-নিকাশ

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬
  • ১ বার

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাজারে বাণিজ্য সুরক্ষার সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যাবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ক-সুবিধা সংকুচিত হওয়ার এই ক্রান্তিকালে দেশি শিল্প খাতকে বিদেশি পণ্যের অন্যায্য আগ্রাসন ও তীব্র প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করতে এখন থেকেই নেওয়া হচ্ছে বিশেষ প্রস্তুতি। এ লক্ষ্যে এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নিচ্ছে সরকার। মূলত বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়ানো, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতেই এ নতুন কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

পাঁচ বছর মেয়াদি নতুন কর্মপরিকল্পনায় ১২টি অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম রাখা হয়েছে। এই কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য সহজকরণ, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা জোরদার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বৃদ্ধি।

জানা গেছে, এলডিসি তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা আগামী ২৪ নভেম্বর। এ সময়সীমা পিছিয়ে নিতে আরও তিন বছর সময় বৃদ্ধির আবেদন জানায় বর্তমান সরকার। এই আবেদন জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) আমলে নেয়। তবে তিন বছর নয়, স্বল্প সময় দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে সিডিপি। সংস্থাটি অবশ্য এ জন্য আর্থিক খাত, রাজস্ব খাতসহ বিভিন্ন খাতে সংস্কার করার তাগিদ দিয়েছে।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) ‘বাণিজ্য প্রতিরক্ষা পদ্ধতি’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে। এ বাস্তবতায় আমদানি বিষয়ে দেশি শিল্পকে রক্ষায় অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এ সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সরকার, শিল্প খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বিত অংশীদারত্ব গড়ে তোলা জরুরি বলে জানিয়েছে। প্রতিবেদন তৈরিতে মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের সাবেক মহাপরিচালক হাফিজুর রহমান। তিনি সম্প্রতি বিটিটিসির কর্মকর্তাদের কাছে এ সুপারিশ তুলে ধরেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা। শুল্ক-সুবিধা কমে যাওয়ায় বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাড়বে। অন্যায্য আমদানির কারণে বাড়বে দেশি শিল্পের ঝুঁকি। তাই বাণিজ্য প্রতিরক্ষামূলক উপায় ব্যবহারে সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

বাণিজ্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা শুধু অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড- এই তিন ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো- যার মধ্যে আইন, তদন্ত, তথ্য সংগ্রহ, বাজার পর্যবেক্ষণ, আন্তর্জাতিক মামলা পরিচালনা এবং দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত। কোনো দেশ উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে পণ্য রপ্তানি করলে তাকে ডাম্পিং বলা হয়। ডাম্পিং ঠেকাতে আরোপ করা হয় অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক। আবার কোনো দেশের সরকার রপ্তানিকারকদের বিশেষ ভর্তুকি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যায্য সুবিধা দিলে তার বিরুদ্ধে কাউন্টারভেইলিং ব্যবস্থা নেওয়া যায়। অন্যদিকে কোনো পণ্যের আমদানি হঠাৎ বেড়ে গিয়ে দেশি শিল্পের ক্ষতি করলে সাময়িক সুরক্ষার জন্য নেওয়া হয় সেফগার্ড ব্যবস্থা।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম অনুযায়ী, বাণিজ্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা কোনো সংরক্ষণবাদী নীতি নয়, বরং এটি বৈধ প্রতিকার, যার মাধ্যমে কোনো দেশ অন্যায্য বাণিজ্যিক আচরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।

বিটিটিসির প্রতিবেদনে সরকার, শিল্প খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) করার পাশাপাশি জাতীয় বাণিজ্য প্রতিরক্ষা কাউন্সিল গঠন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য বাণিজ্য সুরক্ষা সহায়তা কেন্দ্র, যৌথ বাণিজ্য সুরক্ষা সেল, তথ্য বিনিময়ের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বয়ে একটি একাডেমিক কনসোর্টিয়াম গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, ওষুধ, পাটপণ্য, প্লাস্টিক, সিরামিক ও কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান তৈরি করছে। তবে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে বিদ্যমান শুল্ক-সুবিধা কমে যাবে। ফলে বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে। এ অবস্থায় শুধু নতুন বাজার খোঁজা বা রপ্তানি বাড়ানোর কৌশল যথেষ্ট হবে না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়ম মেনে দেশি শিল্পকে অন্যায্য প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষার সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অনেক শিল্প সমিতি এখনও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী তথ্য সংরক্ষণ করে না। ফলে ক্ষতির অভিযোগ থাকলেও তা প্রমাণ কঠিন হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই বাণিজ্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়। অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্ত শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়। এতে অর্থনীতি, পরিসংখ্যান, হিসাববিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক আইনের সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সুপারিশ করেছে বিটিটিসি। সংস্থাটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একটি নিরপেক্ষ ‘থিঙ্কট্যাংক’ হিসেবেও ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে।

বিটিটিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশে বাণিজ্য সুরক্ষা তদন্তের আইনি ভিত্তি থাকলেও কার্যকর প্রয়োগের জন্য শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্য যাচাই, আন্তর্জাতিক শুনানিতে অংশ নেওয়া এবং ডব্লিউটিওর বিধান মেনে তদন্ত পরিচালনার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

অন্যদিকে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) তাদের এক মূল্যায়নে স্পষ্ট জানিয়েছে, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণকালীন ও পরবর্তী সময়ের প্রধান দুর্বলতাই হলো এই আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। এই সুবিধাগুলো হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের কারণে দেশের বাজারে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের ওপর নজিরবিহীন অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ও কর্মসংস্থানে এই আন্তর্জাতিক সহায়তামূলক ব্যবস্থাগুলোর ভূমিকা অপরিসীম বিধায় বর্তমান অনিশ্চয়তার মধ্যে এলডিসি থেকে উত্তরণ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে সম্পূর্ণরূপে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান খান বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রাক্কালে বাংলাদেশকে নন-ট্যারিফ বাধা, আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এসব বিবেচনায় ডব্লিউটিওর আওতাধীন ‘এনহ্যানসড ইন্টিগ্রেটেড ফ্রেমওয়ার্কে’র (ইআইএফ) তৃতীয় পর্যায়ের জন্য ১২টি অগ্রাধিকারভিত্তিক কার্যক্রম নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, শুধু নীতিমালা বা গবেষণা নয়, কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এসব উদ্যোগের সুফল নিশ্চিত করতে হবে। বাণিজ্য সহজকরণ, প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালার সংস্কার এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ আরও উন্নত করা হবে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ