দেশজুড়ে গত কয়েক দিনের ভূমিকম্প শুধু ভূ-তাত্ত্বিক দুর্বলতাই নয়, প্রকাশ করেছে আমাদের শহুরে নিরাপত্তাবোধ কতটা নড়বড়ে। বড় ধরনের ক্ষতি না হলেও রাজধানীর মানুষের মনোজগতে এর প্রভাব ছিল তীব্র। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেভাবে হোস্টেল ছাড়তে শুরু করেছেন এবং পুরান ঢাকার বাসিন্দারা যেভাবে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে খোলা জায়গায় রাত কাটিয়েছেন—তা এক ধরনের আতঙ্কনির্ভর নগর ত্যাগের ধারা তৈরি করেছে। এ আকস্মিক, অপ্রত্যাশিত এবং পরিকল্পনাবিহীন জনসংস্থানকে অভিবাসন গবেষকরা বলেন শক মোবিলিটি।
এ ধরনের গতিশীলতা প্রচলিত অভিবাসনের যুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে। সাধারণত মানুষ কাজ, শিক্ষা বা জীবনমানের উন্নয়নের জন্য স্থান বদলায়। কিন্তু শক মোবিলিটিতে সিদ্ধান্তের ভিত্তি একটাই— অনিশ্চয়তা ও জীবনরক্ষার তাড়না। ঢাকার দুর্বল ভবনকাঠামো, পূর্বের দুর্ঘটনার স্মৃতি, রানা প্লাজার মতো বেদনাদায়ক ঘটনাগুলো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোসহ সব মিলিয়ে মানুষ মনে করছে, শহরটা নিরাপদ নয়। এখনো দৃশ্যমান ক্ষতি কম হলেও মানসিক অভিঘাত থেকেই তৈরি হচ্ছে শহর ছাড়ার প্রবণতা।
এ পরিস্থিতির প্রতিচ্ছবি আমরা আগেও দেখেছি। ২০২০ সালের কভিড-১৯ লকডাউনের সময় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজার হাজার মানুষ ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে গিয়েছিল। লকডাউন ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে কর্মহীনতা, আয়ের অনিশ্চয়তা এবং সংক্রমণের ভয় শহরকে মানুষবিরোধী করে তোলে। দিনের পর দিন যারা শহরে শ্রম দিয়েছে, তারাই হেঁটে, সিএনজিতে কিংবা ট্রাকে চড়ে গ্রামে ফিরে যায় যেখান থেকে তারা পরবর্তী সময়ে আবার শহরে ফিরে আসে। এসব দেখায়, সংকটের মুহূর্তে শহর নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলে মানুষ ঘনবসতিপূর্ণ নগরকেন্দ্র ছেড়ে সাময়িক আশ্রয়ের সন্ধানে অন্যত্র সরে যায়। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পেও একই বাস্তবতা স্পষ্ট—শিক্ষার্থীরা বা পরিবারগুলো শহর ছাড়ছে না উন্নত জীবনের খোঁজে, বরং তাৎক্ষণিক ভয় থেকে বাঁচতে।
গবেষণা বলছে, বিশ্বজুড়েই এ ধরনের শক মোবিলিটির হার বেড়েছে। কারণ, মানুষ এখন এমন পরিবেশে বাস করছে যেখানে বিপদ ও নিরাপত্তার সীমারেখা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি তো আরও জটিল। অধিক জনসংখ্যার চাপ, পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ, দুর্বল বিল্ডিং কোড, যত্রতত্র উচ্চভবন নির্মাণ, বিশ্ববিদ্যালয় হলগুলোর জীর্ণ অবস্থা—সব মিলিয়ে নগরের কাঠামোগত অনিরাপত্তা মানুষের মনের ভেতরে আতঙ্ক তৈরি করে। ঢাকার বহু ভবনে ফাটল, জরাজীর্ণ সিঁড়ি, অনির্ভরযোগ্য লিফট এ বাস্তবতা মানুষকে বুঝিয়ে দেয়, কোনো বড় ভূমিকম্পে শহর ভয়ংকর বিপদের মুখে পড়তে পারে। ফলে মানুষ মনে করে, থাকা মানেই ঝুঁকি; চলে যাওয়াই আপাত নিরাপত্তা।
এ ধরনের মোবিলিটি শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের নানা দেশেও দেখা গেছে। জাপানের ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর বহু মানুষ সরকার ঘোষিত বিপদসীমার বাইরেও অঞ্চল ত্যাগ করে। তুরস্কের ২০২৩ সালের ভূমিকম্পের পর লক্ষাধিক মানুষ এমন শহরও ছাড়ে, যেগুলোতে দৃশ্যত বড় ক্ষতি হয়নি, কিন্তু ভবন-পরিদর্শন ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারায়। সিরিয়ায় রাসায়নিক হামলার পর এক রাতে পুরো জনপদ স্থানান্তরিত হয়েছে। এসব উদাহরণ দেখায়, শক মোবিলিটি সাধারণত সাময়িক হলেও মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে, যা ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত ও অভিবাসনের ধরনকে প্রভাবিত করে।
সর্বোপরি, সাম্প্রতিক ভূমিকম্প-উদ্ভূত নগরত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বর্তমান বিশ্বে অভিবাসন শুধু আকাঙ্ক্ষা বা উন্নতির পথে যাত্রা নয়; বরং ভয়, অনিশ্চয়তা ও সাময়িক আশ্রয়ের সন্ধানই অনেক সময়ে প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়ায়। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি এসব বাড়তে থাকলে বাংলাদেশ আরও ঘন ঘন এমন শক মোবিলিটির মুখোমুখি হবে। মানুষের চলাচল থামানো জরুরি নয়; বরং প্রয়োজন এমন শহর গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ প্রতিটি গুজব, প্রতিটি কম্পন বা প্রতিটি দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব না করে। কারণ, জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত যদি ভয় দ্বারা পরিচালিত হয়, তবে শহর হারায় তার স্থিতি, রাষ্ট্র হারায় মানুষের আস্থা আর নাগরিক হারায় মৌলিক নিরাপত্তাবোধ। অতএব, দুর্যোগ মোকাবিলা, ভবন নিরাপত্তা, কার্যকর তথ্য প্রচার এবং নগর ব্যবস্থাপনায় ইচ্ছাশক্তির অভাব দূর করতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও বড় শক মোবিলিটির মুখোমুখি হতে হবে।
মোহাম্মদ আব্দুর রহমান, শিক্ষার্থী
অনার্স চতুর্থ বর্ষ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়