অবশেষে নানা জল্পনা-কল্পনা ও দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তারেক রহমান দেশে ফিরছেন। তার ফেরার তারিখ নিশ্চিত করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ থেকে। এ ঘোষণায় দেশের রাজনীতির জোয়ারের যেমন তীব্রতা এসেছে, তেমনি দেশের মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে বহুমুখী প্রত্যাশা। দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দলের প্রধানের কাছ থেকে এ প্রত্যাশা নতুন কিছু নয়, তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখনকার প্রত্যাশার গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পর বাংলাদেশ আজ এক গভীর রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ দেড় দশকের ভয়, দমন-পীড়ন, ভোটাধিকার হরণ, গুম-খুন এবং বিচারহীনতা ও বৈষম্যের সংস্কৃতির পর ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান মানুষের মনে যেমন স্বস্তির নিশ্বাস এনেছে, তেমনি নতুন আশার জন্ম দিয়েছে-শুধু সরকার বা ক্ষমতার পরিবর্তন কিংবা চরিত্র বদলই নয়, দেশ রূপান্তরের স্বপ্ন আজ কোটি মানুষের চোখে। আর দেশের বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির কাছে সাধারণ মানুষের চাওয়া এখন অনেক। তাই জনগণও প্রতীক্ষার চাতক হয়ে অপেক্ষা করেছিল দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ফিরে আসার।
গণঅভ্যুত্থানের পরপর তারেক রহমানকে নিয়ে মানুষের ধারণা ছিল, তিনি আসবেন, দেখবেন, জয় করবেন। কিন্তু দেশের ক্রমশ জটিল হওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর ফিরে আসার সময় যতই পিছিয়ে যাচ্ছিল, গডোর জন্য অপেক্ষার মত মানুষের অপেক্ষাও অর্থহীন হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এখন যেহেতু তারিখ নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে, আস্থা ও প্রত্যাশাও একইসাথে বাড়ছে।
সম্প্রতি তারেক রহমান নিজেই বলেছেন, স্বৈরাচার পতনের পর নিরপেক্ষ মানুষও ভালো পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা করছে বিএনপির কাছে। কথাটি কিছুটা আত্মসমর্থনের মতো শোনালেও বাস্তবতাও অনেকটাই তাই। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির কার্যালয়ের সামনে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত, সমাবেশে মানুষের উপস্থিতি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ঘিরে উদ্বেগ, সব কিছু মিলে তারেক রহমান ও বিএনপির প্রতি মানুষের প্রত্যাশা অনেক। একই সঙ্গে এ প্রত্যাশা দল ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের জন্যও এক বড় পরীক্ষা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় দল মানেই কেবল বড় সংগঠন নয়, বরং বড় দায়িত্ব। বিএনপি বড় দল বলেই তাদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা বেশি। এই প্রত্যাশা কেবল নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের নয়; বরং রাজনৈতিক আচরণে পরিপক্বতা, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা, ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে চলার সক্ষমতা দেখানোর।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিএনপির জন্মই হয়েছিল রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা থেকে। ১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দলটি প্রতিষ্ঠার সময় ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ,’ বহুদলীয় গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ছিল এর মূল দর্শন। তাঁর ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল তৎকালীন সংকটগ্রস্ত রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল ও গণমুখী করার এক প্রয়াস।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি স্বৈরাচার-বিরোধী, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে একটি কার্যকর রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার আজ বিএনপির জন্য যেমন গর্বের, তেমনি দায়বদ্ধতারও। কারণ মানুষের প্রত্যাশা কেবল অতীত স্মরণে সীমাবদ্ধ নয়; তারা দেখতে চায়, বর্তমান ও ভবিষ্যতে বিএনপি সেই গণতান্ত্রিক ধারাকে কতটা শক্তভাবে ধারণ করতে পারে। আর এ জায়গাতে তারেক রহমানকেও জনগণের সামনে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হচ্ছে এবং হবে।
সম্প্রতি বিভিন্ন আলোচনায় তারেক রহমান বারবার বলেছেন, দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা বাড়াতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যায়ে বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীর আচরণ যে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নীতির প্রতিফলন নয়, সাধারণ মানুষ সে বিষয়ে আশ্বস্ত থাকতে চাইবে বারবার। স্বৈরাচার–পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষ আর ‘ক্ষমতায় গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে,’ এমন যুক্তিতে বিশ্বাস করতে চায় না। তারা দেখতে চায়, বিএনপি নিজের ভেতর থেকেই শুদ্ধতার প্রক্রিয়া শুরু করুক এবং তারেক রহমান তাদের প্রত্যাশা পূরণ করে সত্যিকার অর্থেই জনগণের নেতা হয়ে উঠুন।
বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান, উভয় ক্ষেত্রেই নিজেদের স্পষ্ট অবস্থান ব্যাখা করেছে। জানিয়েছে, তারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং চব্বিশের গণ-অভ্যুস্থানের চেতনায় বিশ্বাসীদের সাথী করে পথ চলবে। এক্ষেত্রেও, মানুষের প্রত্যাশা বিএনপি যেমন আওয়ামী লীগের কুক্ষিগত ন্যারেটিভ থেকে মুক্তিযুদ্ধকে বের করবে এবং স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতির পক্ষে জোরালো অবস্থান নিবে, তেমনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে যথাযথ মর্যাদা প্রদান করবে। দেশ ও জাতির আত্ম-পরিচয়ের প্রশ্নে এ দু’য়ের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি-কেই এ কাজটি সম্পন্ন করতে হবে। একাত্তর ও জুলাই দেশের মানুষের অর্জন, এ অর্জনকে দেশের মানুষের কাছেই ফিরিয়ে দিতে হবে।
এ ছাড়া ছাত্রলীগের পতনের পর শূন্য হয়ে পড়া ছাত্র রাজনীতিতে ছাত্রদলের ভূমিকা কী হবে, এ প্রশ্ন এখন সামনে। তরুণ সমাজ চায়, ছাত্রদল যেন সত্যিকার অর্থে ছাত্রদের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠনে পরিণত হয়, যেন ছাত্র লীগের মতো ক্ষমতার লাঠিয়াল বাহিনীতে রূপ না নেয়। অন্যথায় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যায়। তারেক রহমান যেহেতু দেশে ফিরছেন, সে ক্ষেত্রে বিএনপির তৃণমূল থেকে ছাত্রদল, সকল ক্ষেত্রেই যেন সঠিক নীতির প্রতিফলন ঘটে, এ চাওয়া সাধারণ মানুষের।
আরেকটি বড় প্রত্যাশা হল, নিজস্ব ঐতিহ্য অনুযায়ী বিএনপি যেন প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে দূরে থাকে, রাজনৈতিক সৌহার্দ্য ও সম্মানের সংস্কৃতির চর্চা করে। মানুষ চায় এমন রাজনীতি, যেখানে ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে নয়, বরং গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা হবে। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নেও বিএনপির ভূমিকা এখন নির্ণায়ক। বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব এবং ভিশন-২০৩০ আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা, এসব ক্ষেত্রে বিএনপিকে কেবল স্লোগান নয়, স্পষ্ট রোডম্যাপ দিতে হবে।
সম্প্রতি মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায়, তারেক রহমান বাংলাদেশের আগামী দশককে ‘রূপান্তরের দশক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষও রূপান্তর চায়; তারাও চায় ‘দেশ গড়ার কর্মসূচি’- তে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করতে। কিন্তু বিএনপি’র কাণ্ডারি হিসেবে তারেক রহমানকে জনগণের জন্য সে সুযোগ করে দিতে হবে।
দেড় দশকের দমন-পীড়নের ক্ষমতালোভী রাজনীতি ও অপশাসন বিএনপি ও তারেক রহমানের ত্যাগ ও সংগ্রামকে মানুষের সামনে এনেছে। এখন তারেক রহমানকেই প্রমাণ করতে হবে বিএনপি একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বাহক। বাংলাদেশ সংকটের চক্রে আবদ্ধ, এই সংকটচক্র ভাঙতে হলে এবার দরকার সাহসী, সংযত ও দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তারেক রহমানের কাছে তাই মানুষের প্রত্যাশাও স্পষ্ট: শুধু নেতৃত্ব ও ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র ও রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন। এই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারলেই তারেক রহমান প্রকৃত অর্থেই হয়ে উঠবেন সাধারণ মানুষের আস্থার যোগ্য, জনতার নেতা।
কাজী জেসিন, সাংবাদিক ও উপস্থাপক