মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১১ অপরাহ্ন

আমলাতন্ত্রে মন্থর সচিবালয়, মন্ত্রী-এমপিদের তাগাদায়ও নড়ছে না ফাইল

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার

সরকারের নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র সচিবালয়ে যেন মন্থর হয়ে আছে কাজের গতি। প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও সিদ্ধান্তের প্রস্তুতি থাকার পরও গুরুত্বপূর্ণ অনেক ফাইল দিনের পর দিন, কোথাও মাসের পর মাস পড়ে থাকছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার টেবিলে। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বারবার তাগাদা ও মৌখিক নির্দেশের পরও অনেক ক্ষেত্রে ফাইলের গতি বাড়ছে না। ফলে সরকারি দপ্তরের স্বাভাবিক কার্যক্রম থেকে শুরু করে উন্নয়ন প্রকল্প—সবখানেই দেখা দিয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের মধ্যেও।

সম্প্রতি সচিবালয়ের একাধিক মন্ত্রণালয় ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। কর্মকর্তাদের একাংশের নীরব অসহযোগিতা, সিদ্ধান্ত নিতে অনীহা এবং ফাইল ছাড়তে অযথা সময়ক্ষেপণের অভিযোগও উঠেছে। এতে সরকারের কর্মকাণ্ডে তৈরি হচ্ছে ‘কচ্ছপগতি’। এমন অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মানসিকতা পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কর্মশালার কাঠামোগত পরিবর্তনের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

অতি সম্প্রতি ধর্ম মন্ত্রণালয়ে এমন একটি ঘটনায় মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে বিষয়টি সামনে আসে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক কর্মকর্তাকে কয়েক মাস আগে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে সংযুক্তিতে পদায়ন করা হলেও তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে পারেননি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব যোগদানের ক্লিয়ারেন্স দিতে রাজি না হওয়ায় বিষয়টি ঝুলে ছিল। পরে বিষয়টি ধর্মমন্ত্রীর নজরে এলে তিনি তার একান্ত সচিবকে (পিএস) বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের সচিবকেও ডেকে জরুরি ভিত্তিতে বিষয়টি সমাধানের নির্দেশ দেন।

সরেজমিন দেখা যায়, গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনে বিভিন্ন কাজের জন্য একজন প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরে এসেছিলেন কয়েকজন ব্যক্তি। ওই মন্ত্রণালয়ের অধীন অপর একটি দপ্তরের শীর্ষ দুজন কর্মকর্তা এসে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছিলেন। এমন সময় বলা হয়, ফাইলটি এখনো মন্ত্রীর দপ্তরে যায়নি। বিষয়টি জানার পর প্রতিমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ফোন করে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চান। সম্ভবত সচিব বিষয়টি নিয়ে কিছু বলতে চাচ্ছিলেন এবং ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন, তবে সেই ব্যাখ্যা প্রতিমন্ত্রীর মনঃপূত হয়নি। একপর্যায়ে তিনি সচিবকে বলেন, কাজ হবে কি হবে না সেটি দ্রুত পরিষ্কার করে বলবেন। অযথা কালক্ষেপণ এবং সেবাপ্রার্থীকে হয়রানি করবেন না। এতে সরকারের কাজে গতি কমে যায়। যদি আপনারা ইচ্ছা করে এসব করেন, তাহলে সরকার বিব্রত হয় এবং কাজের গতি মন্থর হয়ে যায়। খবরদার এ রকম করা যাবে না—বলে ফোন রেখে দেন প্রতিমন্ত্রী।

শুধু এই ঘটনাই নয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে ফাইল আটকে থাকার নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, অনেক ফাইলের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত থাকলেও তা পরবর্তী ধাপে পাঠাতে দিনের পর দিন সময় নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশের পরও ফাইল সচল না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাদের টেলিফোন করে কর্মকর্তাদের তাগাদা দিতে হচ্ছে।

ছয় মাসেও শেষ হয়নি কাজ: সচিবালয়ে আসা জনপ্রতিনিধিদের অভিজ্ঞতায়ও ফুটে উঠেছে দীর্ঘসূত্রতার চিত্র। খুলনার একটি আসনের প্রভাবশালী একজন সংসদ সদস্য জানান, তার এলাকার একটি জরুরি উন্নয়নকাজের নিষ্পত্তির জন্য তিনি টানা ছয় মাস ধরে সচিবালয়ে যাতায়াত করছেন। সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে তদবির ও প্রয়োজনীয় যোগাযোগের পরও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং কর্মকর্তাদের টালবাহানায় কাজটি শেষ হয়নি।

চাঁদপুরের একটি আসনের এক সংসদ সদস্য বলেন, বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে তিনি নিয়মিত সচিবালয়ে যান। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নির্দেশ দেওয়ার পরও বাস্তবে নিচের স্তরে গিয়ে ফাইল আটকে থাকে। এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরতে থাকে নথি। আমলারা যেন রাজনীতিবিদদের হয়রানির অপেক্ষায় থাকেন, যা অনাকাঙ্ক্ষিত। ময়মনসিংহের একটি আসনের একজন সংসদ সদস্যও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় থেকে দ্রুত সিদ্ধান্তের নির্দেশ দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসে সেই গতি আর থাকে না। ফলে একটি ছোট সিদ্ধান্ত নিতেও দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে। এতে নির্বাচনি এলাকার মানুষের কাছে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির মুখে পড়তে হচ্ছে।

জবাবদিহির ঘাটতিই বড় সমস্যা: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এমন দীর্ঘসূত্রতা কমবে না। ফাইল নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকলেও তা যথাযথভাবে অনুসরণ না করলে প্রশাসনের কাজের গতি বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত ও উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে একটি ফাইলের বিলম্ব পরবর্তী একাধিক ধাপের কাজকে পিছিয়ে দিতে পারে।

তাদের মতে, আমলাতন্ত্রের কাজের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন। কিন্তু দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা, সিদ্ধান্ত নিতে অনীহা কিংবা অপ্রয়োজনীয় পর্যায়ে ফাইল আটকে রাখার সংস্কৃতি প্রশাসনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও নাগরিক সেবায়।

সচিবালয়ের সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশাসনে এখন দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা জরুরি। কোন ফাইল কোন পর্যায়ে কত দিন পড়ে থাকছে, কেন আটকে আছে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কেন তা নিষ্পত্তি করছেন না—এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘসূত্রতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মুসলেহ উদ্দিন আহমেদ কালবেলাকে বলেন, ‘যে অভিযোগ উঠেছে তার সমাধান আপাতদৃষ্টিতে খুবই কঠিন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাসে সচিবালয়ের কাজের বিষয়ে জেনে মনে হচ্ছে, এটা বদলানোর একমাত্র উপায় হলো আমলাদের মাঝে মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের ট্রেনিং শিডিউলে পরিবর্তন ও মডিউল উন্নত করতে হবে।’

‘আমরা বিপিএটিসি, বিসিএস প্রশাসন একাডেমি, ট্রেনিং একাডেমি এবং আরেকটা নতুন হচ্ছে- জাতীয় উন্নয়ন প্রশাসন একাডেমি (নাডা) ওইখানে যদি আমরা ট্রেনিং মডিউলগুলা ডেভেলপ করতে পারি ও এই নর্মসগুলো ঢোকাতে পারি, তাহলে আমার মনে হয় যদি এটার ইফেক্ট পড়বে। তা না হলে এক রেজিম যাবে আরেক রেজিম আসবে, কেউ কেউ চেষ্টা করবে যে এই রেজিমকে বিপদে ফেলতে, আর কেউ চেষ্টা করবে তাদের কাছের হতে।’

তিনি আরও বলেন, এটার আরেকটা সমাধান আছে। সেটা হলো আমরা যদি আমাদের সংসদকে শক্তিশালী করতে পারি। এই জাতীয় যত কেস সংসদে আলোচনা করে উদাহরণ হিসেবে যদি শাস্তি দেওয়া যায়, তাহলে মনে হয় মানুষের অনুভূতি ফিরে আসবে। ফলে আমাদের যারা অফিসিয়াল তারাও বিষয়টি বুঝতে পারবেন।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা অনেকেই শুধু আমলাতন্ত্রকে সমানে দোষ দিই, গালাগাল করি। এটা ঠিক না। কারণ আমলাতন্ত্রের এই অবস্থার জন্য কারা দায়ী? যারা আমলাদের এই শীর্ষ পদে বসিয়েছেন। বাছাই তো রাজনীতিবিদরা করেন। তারা যদি ভালো চয়েস না করেন, ভালো, দক্ষ ও যোগ্য আমলা না বসান এর জন্য দায় কাকে দেবেন? রাজনৈতিক আনুকূল্যে আমি যাদের বসাচ্ছি তারা তো অদক্ষ। কারণ যারা সত্যিকার দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং সৎ ও নিরপেক্ষ তারা তো তদবির করবেন না। তাদের তো চাওয়ার কিছু নেই। সুতরাং তাদের না নিয়ে নিজের পছন্দমতো লোক নিচ্ছেন।’

‘আর জনগণ কিছু আমলাকে দেখে সব আমলাতন্ত্রকে খারাপ বলছে। কারণ খারাপগুলো সিনে (দৃশ্যে) আসতেছে। তাছাড়া রাজনৈতিক আনুকূল্য পেয়ে ভালো আমলাদের সিনে আনছে না। তাদের তো কাজ করতে দিচ্ছেন না। ফলে সরকার যতদিন পর্যন্ত দলীয়করণের ঊর্ধ্বে না উঠতে পারবে, ততদিন সমাধান হবে না।’

মন্ত্রীর কথা সচিবের না শোনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বর্তমান নীতিনির্ধারকদের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাটা কম। আর এটা তো রাতারাতি হয় না, সময় লাগে। রাজনৈতিক বিবেচনা বাদ দিয়ে দক্ষ-নিরপেক্ষ আমলাদের যথাস্থানে বসালে তারা জনস্বার্থে কাজ করবেন। এমনকি মন্ত্রী যদি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে যান তখন মন্ত্রীকে বলবেন যে স্যার এটা নিলে এই অবস্থা হবে। এখানে শুধু মেরিট না যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা এবং স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা বিবেচনায় নিয়ে পদায়ন করতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতিবাজদের বাদ দিতে হবে।’

সরকারি দপ্তরগুলোতে সহজে ফাইল নড়ে না—এমন অভিযোগ বহু পুরোনো এমনটি স্বীকার করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। কিছুদিন আগে তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জানতে চাইলে গতকাল তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘আপনার অবজারভেশনটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। কেননা, আমি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে থাকার সময়ই এ ধরনের অভিযোগ পেয়েছি এবং দেখেছিও। সে সময় আমি নিজে চেষ্টা করে ইনিশিয়েটিভ নিয়ে কিছু কাজও করছিলাম। যাই হোক বিষয়টি এখন তাহলে সরকারের নজরে আনতে হবে।’

সচিবালয়ে কাজের গতি বাড়ানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটার জন্য মনে হয় সচিবদের সেভাবে ইনস্ট্রাকশন দিতে হবে। যদিও এ বিষয়ে সরকারের ইনস্ট্রাকশন আছেই। সচিবালয়ের নির্দেশিকা আছে। রুলস অব বিজনেস আছে। কে কীভাবে কতদিন ফাইল রাখতে পারবেন বিধান আছে। এগুলো প্রতিপালন না করলে সরকারি আদেশ অমান্য করার অপরাধ বলে গণ্য হবে। সুতরাং সরকার এগুলোকে খুব শক্ত বা কঠিনভাবেই দেখবে। কারণ এটা তো একটা নীতিমালা বা নীতি-বিধানের লঙ্ঘন।’

জনপ্রশাসন সচিব আরও বলেন, আমার বিশ্বাস, সচিবরা অনেক অভিজ্ঞ। তারা তাদের জুরিসডিকশন তার টাইম অনুসারে ফাইলে সই করবেন। আমার মনে হয়, এটাই সরকারের চাওয়া। আমরা সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলে নীতিমালা মেনে সবাই একসঙ্গে দেশের জন্য কাজ করতে চাই। কোনো কঠিন কথা বলতে চাই না। দরকার হলে সচিবদের ডেকে আবারও একটা মিটিং করা যেতে পারে। কাজের গতি সাধনে নিশ্চয়ই আমরা এগুলো বিবেচনায় রাখব।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ