বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৬:১২ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
বর্তমান সরকারের গতি-প্রকৃতি ও জনপ্রত্যাশা শিক্ষার্থী বিক্ষোভে দিল্লির ১৬ মেট্রো স্টেশন বন্ধ আগামীকালই পদত্যাগ করছেন রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ প্রসঙ্গে যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চট্টগ্রাম বোর্ডের স্থগিত এইচএসসি পরীক্ষা শুরু ২৭ জুলাই আগামীর বাংলাদেশে যেন কোনো গ্রামবাসী চিকিৎসার অভাবে প্রাণ না হারায়: ডা. জুবাইদা বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে ধর্ষণ, চট্টগ্রাম এনসিপির শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার জিয়াউর রহমান হত্যা মামলা : মোজাফফরকে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ, জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি হবে ট্রিলিয়ন ডলারের: প্রধানমন্ত্রী আটঘর-কুড়িয়ানা পেয়ারা বাগান ভ্রমণে ৮ নির্দেশনা

বাংলাদেশের ঋণ প্রস্তাবে নতুন শর্তে আইএমএফ

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) স্থগিত ঋণ সচল করা এবং নতুন তহবিল পেতে চায় সরকার। তবে এই অর্থায়নের বিপরীতে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংস্কার এবং জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাকে প্রধান শর্ত হিসেবে জুড়ে দিচ্ছে আইএমএফ। সংস্থাটির ফিসকাল অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্টের প্রতিনিধি দল বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতের অগ্রগতি ও করনীতি পর্যালোচনা করছে, যার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে ভবিষ্যৎ ঋণ কর্মসূচির ভাগ্য। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচিতে জলবায়ু সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠবে।

জানা গেছে, আইএমএফের সঙ্গে পূর্ববর্তী ঋণ কর্মসূচির আওতায় যেসব সংস্কার কার্যক্রম অসম্পূর্ণ রয়েছে, সেগুলো নতুন কর্মসূচির অধীনে অগ্রাধিকার পেতে পারে। ফলে এ সফর শুধু জলবায়ু নীতিমালার মূল্যায়নেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং অর্থনৈতিক সংস্কারের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাও নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

জানা গেছে, এমন এক সময়ে আইএমএফের ৬ সদস্যের টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স (টিএ) মিশনের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে রয়েছে, যখন দেশের জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং নতুন আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সম্ভাবনা সমান্তরালভাবে চলছে। ১৯ জুলাই থেকে শুরু হয়ে ৩০ জুলাই পর্যন্ত এই সফরের মূল লক্ষ্য বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গৃহীত নীতিমালা, আর্থিক কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার পূর্ণ মূল্যায়ন করা। একই সঙ্গে এই মূল্যায়নের ফলাফল সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনায়ও গুরুত্ব পাবে।

আইএমএফের এই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সংস্থাটির ফিসকাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের জলবায়ু নীতি বিভাগের সিনিয়র ইকোনমিস্ট চল সুফাচালাসাই। এই দলটির সফরের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে

‘ক্লাইমেট পলিসি ডায়াগনস্টিক’ (সিপিডি), যার মাধ্যমে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার নীতিমালা, অর্থায়ন কাঠামো এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বিস্তারিতভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে। পাশাপাশি প্রতিনিধি দল দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করবে এবং সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবে।

রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটির আওতায় বাংলাদেশের ঋণ কর্মসূচিও এই সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। এ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ এক বিলিয়ন এসডিআর বা স্পেশাল ড্রয়িং রাইটস, অর্থাৎ প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ সুবিধা পেয়েছে। এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ অর্থ ইতোমধ্যে ছাড় হয়েছে, তবে অবশিষ্ট অংশ স্থগিত রয়েছে। এখন সেই কর্মসূচি পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই ঋণ সুবিধা পেয়েছিল।

বাংলাদেশ-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে আইএমএফ উল্লেখ করেছিল, এই রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি বর্ধিত ঋণ সুবিধা এবং বর্ধিত তহবিল সুবিধার পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার যে পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করছে, সেগুলোকে এই তহবিলের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়ন সংগ্রহেও এই কর্মসূচি ভূমিকা রাখবে।

বর্তমান সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক ঝুঁকির মুখোমুখি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় এবং বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, জনজীবন এবং অর্থনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে। অথচ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম। তারপরও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় সরকারকে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।

এদিকে অর্থ বিভাগ সম্প্রতি ‘পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট রিফর্ম স্ট্র্যাটেজি ২০২৫-২০৩০’ চালু করেছে। এই কৌশলপত্রে প্রথমবারের মতো জলবায়ু-স্মার্ট সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল বাজেটিং অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৫টি মন্ত্রণালয়ের জন্য জলবায়ু-সংক্রান্ত ব্যয় বাবদ প্রায় ৪২ হাজার ২০৬ দশমিক ৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ১০ দশমিক ০৯ শতাংশ।

জানা গেছে, সফরের প্রথম দিন থেকেই আইএমএফ প্রতিনিধি দল অর্থনৈতিক বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করে। প্রথম দিন অর্থ সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদারের সঙ্গে একটি ‘মিশন উদ্বোধনী সভা’ অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে আইএমএফের ক্লাইমেট পলিসি ডায়াগনস্টিকের উদ্দেশ্য, কাজের পরিধি এবং পরবর্তী কার্যপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

একই দিনে অর্থ বিভাগের ম্যাক্রো ইকোনমিক উইং এবং বাজেট উইংয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে জলবায়ু ও দুর্যোগ-সংক্রান্ত কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। আলোচনায় উঠে আসে ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ’ এবং ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর ডিজাস্টার রিস্ক ফাইন্যান্সিং’-এর বর্তমান অবস্থা। পাশাপাশি দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মধ্যে জলবায়ু ঝুঁকি কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, সে বিষয়েও বিস্তারিত মূল্যায়ন করা হয়।

অন্যদিকে রাজস্ব নীতির ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে আইএমএফ। অর্থ বিভাগের পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে বৈঠকে বিদ্যুৎ, জীবাশ্ম জ্বালানি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সম্পর্কিত করনীতি নিয়ে আলোচনা হবে। একই দিনে বিকালে বিদ্যুৎ বিভাগ এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে বৈঠকে বিদ্যুৎ খাতের নীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অগ্রগতি, সক্ষমতা চার্জ এবং বিদ্যুৎ শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনা করবে প্রতিনিধি দল।

সফরে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে ‘এনডিসি ৩.০’ এবং ‘ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান’-এর বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জলবায়ু অর্থায়নের দুটি গুরুত্বপূর্ণ তহবিল বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড এবং বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ রেজিলিয়েন্স ফান্ডের বর্তমান অবস্থাও মূল্যায়ন করবে আইএমএফ।

উল্লেখ্য, এনডিসি ৩.০ হলো ২০৩৫ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর জন্য বাংলাদেশের তৃতীয় জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ২০ দশমিক ৩১ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্পূর্ণ কর্মপরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে আনুমানিক ১১৬ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, যার মধ্যে রয়েছে নিঃশর্ত লক্ষ্য পূরণে প্রায় ২৫.৯৫ বিলিয়ন ডলার।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ডেল্টা ও উপকূলীয় ব্যবস্থাপনা, সেচনীতি এবং ভূ-পৃষ্ঠ ও ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হবে। এসব বিষয় জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আইএমএফের এই টিএ মিশন কেবল একটি নিয়মিত মূল্যায়ন কার্যক্রম নয়; বরং বাংলাদেশের জলবায়ু নীতি, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক অর্থায়নের রূপরেখা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। এ সফরের মূল্যায়ন ও সুপারিশ নতুন ঋণ কর্মসূচির অগ্রাধিকার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। তাই এই প্রভাব মোকাবিলায় আমাদের সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ