চীনে ১৮ মাসেরও বেশি সময় ধরে আটক রয়েছেন ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক বিস্ফোরণ শনাক্তকরণে বিশেষজ্ঞ এক মার্কিন বিজ্ঞানী। তার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ এনেছে বেইজিং।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতা, মানবাধিকারকর্মী এবং তার পরিবারের দাবি, বিজ্ঞানী ইউলিন চেনকে অন্যায়ভাবে আটক রাখা হয়েছে এবং এখনও তার বিচার শুরু হয়নি।
মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড মার্কি মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেন, ভূকম্পবিজ্ঞানী (সিসমোলজিস্ট) ইউলিন চেনকে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে অন্যায়ভাবে আটক করে রেখেছে চীন।
চেনের পরিবারের পক্ষে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা গ্লোবাল রিচ জানিয়েছে, গত মে মাসে বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চেনের আটক থাকার বিষয়টি উত্থাপন করেন এবং তার মুক্তি দাবি করেন।
সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, বোস্টনে বসবাসকারী এবং কলেজপড়ুয়া এক সন্তানের বাবা ইউলিন চেন বর্তমানে চীনে ‘অন্যায়ভাবে আটক’ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃত একমাত্র মার্কিন নাগরিক।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা
বিশ্লেষকদের মতে, ইউলিন চেনের ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের পর ওয়াশিংটন ও বেইজিং সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে চলতি বছরের শেষ দিকে শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র সফরেরও আলোচনা চলছে।
এর কয়েক সপ্তাহ আগেই চীন আরেক মার্কিন গবেষক মিন জিনকে গ্রেফতারের কথা নিশ্চিত করে। বেইজিংয়ের দাবি, তিনি গুপ্তচরবৃত্তি এবং চীনের জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করার সন্দেহে আটক হয়েছেন।
পারমাণবিক গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা
গ্লোবাল রিচের দাবি, চেনের আটক হওয়ার পেছনে চীনের সাম্প্রতিক পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ২০২০ সালে চীনের কথিত একটি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষার অভিযোগের সঙ্গে বিষয়টির সম্পর্ক থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও বেইজিং এমন কোনও পরীক্ষার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই কমপ্রিহেনসিভ নিউক্লিয়ার-টেস্ট-ব্যান ট্রিটি (সিটিবিটি)-তে স্বাক্ষর করেছে, তবে এখনও তা অনুসমর্থন করেনি। এই আন্তর্জাতিক চুক্তির উদ্দেশ্য যেকোনও ধরনের পারমাণবিক বিস্ফোরণ নিষিদ্ধ করা।
ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষা শনাক্তে বিশেষজ্ঞ
ইউলিন চেনের গবেষণার মূল বিষয় হলো ভূকম্পীয় তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক বিস্ফোরণ শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের পদ্ধতি উন্নত করা। উত্তর কোরিয়ার ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষার ওপরও তিনি দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন।
তার গবেষণায় অর্থায়ন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর এবং মার্কিন বিমানবাহিনীর গবেষণা ল্যাবরেটরি।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে তিনি একটি প্রযুক্তিগত গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যেখানে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের, এমনকি চীনের ভূকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোর তথ্য ব্যবহার করে পারমাণবিক বিস্ফোরণ শনাক্তকরণ ও বিস্ফোরণের শক্তি নির্ধারণের পদ্ধতি উন্নত করার বিষয় তুলে ধরা হয়।
২০২৪ সালে প্রকাশিত তার আরেকটি গবেষণাও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর ও বিমানবাহিনীর গবেষণা ল্যাবরেটরির অর্থায়নে সম্পন্ন হয়। গ্লোবাল রিচের ভাষ্য, গবেষণাটি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষা শনাক্তকরণে চেনের বিশেষজ্ঞ দক্ষতার আরও প্রমাণ বহন করে।
বিমানবন্দর থেকেই আটক
গ্লোবাল রিচের প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা কিয়ারান র্যামসির ভাষ্য অনুযায়ী, বেইজিংয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করে ফেরার সময় বিমানবন্দর থেকেই ইউলিন চেনকে আটক করা হয়।
র্যামসি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর চীনের বিরুদ্ধে পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। একই সময়ে চীন এমন একজন মার্কিন বিশেষজ্ঞকে আটক রেখেছে, যিনি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষা শনাক্ত করার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম দক্ষ বিজ্ঞানী।
তার অভিযোগ, চীন বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে ‘জিম্মি কূটনীতি’ ব্যবহার করছে এবং ইউলিন চেন সেই নীতির শিকার হয়েছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের তৎপরতা
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে চেনের বিষয়টি উত্থাপন করেছে এবং তার অবিলম্বে মুক্তি দাবি করেছে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বরাবরই বিদেশে আটক থাকা প্রতিটি মার্কিন নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে আনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
চীনের প্রতিক্রিয়া
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইউলিন চেনকে ‘অন্যায়ভাবে আটক’ রাখার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, বিচারিক কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী মামলাটি পরিচালনা করছে।
চেনের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১ মে আনুষ্ঠানিকভাবে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ গঠন করা হলেও এখনও তার বিচার শুরু হয়নি।
পরিবারের উদ্বেগ
চেনের স্ত্রী ইউফাং রং জানিয়েছেন, ৬০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে তিনি স্বামীর সঙ্গে কথা বলতে পারেননি। এতে তিনি তার স্বাস্থ্যের বিষয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
তার ভাষায়, “ইউলিন কখনওই যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কোনও নিরাপত্তা ছাড়পত্রধারী ছিলেন না। তাকে গুপ্তচরবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত করা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং তার প্রকাশ্য ও আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।”
তিনি আরও বলেন, তার স্বামী সবসময় চীনা বিজ্ঞানীদের সঙ্গে স্বচ্ছভাবে যৌথ গবেষণা পরিচালনা করেছেন এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা বাড়াতেই কাজ করেছেন।
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউফাং রং জানান, মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা কয়েকবার তার স্বামীর সঙ্গে দেখা করলেও প্রতিবারই চীনা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ফলে তিনি স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারেননি।
তিনি আরও জানান, চীনা একজন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হলেও ইউলিন চেনকে আটকের ১৩ মাসেরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো ওই আইনজীবী তার সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি পান।
চেনের স্ত্রী দাবি করেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষার ভূকম্পীয় তথ্য নিয়ে তার গবেষণার বিষয়ে চীনা কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে শতাধিকবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন